কোনো দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং শক্তি পরিমাপ করার জন্য বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয় মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি (Gross Domestic Product)। একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে একটি দেশের অভ্যন্তরে উৎপাদিত সকল পণ্য ও সেবার বাজারমূল্যের সমষ্টিই হলো জিডিপি। সাধারণ অর্থে, মানুষ ডলারের হিসাবে কী পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে পণ্য ও সেবা কিনছে, বিনিয়োগের পরিমাণ কত, সরকারি ব্যয় এবং রপ্তানির মোট মূল্য—এই সবকিছুই জিডিপির মাধ্যমে পরিমাপ করা হয়। বিশ্ব অর্থনীতির এই প্রতিযোগিতায় দীর্ঘ সময় ধরে অপ্রতিদ্বন্দ্বী শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ২০২৬ অর্থবছরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ৩২.৩৮ ট্রিলিয়ন ডলারের বিশাল অর্থনীতি নিয়ে তালিকার শীর্ষে অবস্থান করছে। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা চীনের অর্থনীতির আকার ২০.৮৫ ট্রিলিয়ন ডলার। তৃতীয় স্থানে রয়েছে জার্মানি, যার জিডিপি ৫.৪৫ ট্রিলিয়ন ডলার। এক সময়ের অর্থনৈতিক পরাশক্তি জাপান বর্তমানে চতুর্থ অবস্থানে নেমে এসেছে, যার বর্তমান জিডিপি ৪.৩৮ ট্রিলিয়ন ডলার। পঞ্চম স্থানে রয়েছে যুক্তরাজ্য (৪.২৬ ট্রিলিয়ন ডলার) এবং ষষ্ঠ স্থানে রয়েছে ভারত (৪.১৫ ট্রিলিয়ন ডলার)।

বর্তমান এই পরিস্থিতির সাথে ২০ বছর আগের তুলনা করলে দেখা যায় এক বিস্ময়কর চিত্র। ২০০৬ অর্থবছরে বিশ্ব অর্থনীতির দ্বিতীয় বৃহত্তম শক্তিতে পরিণত হয়েছিল জাপান। তৎকালীন সময়ে দেশটির জিডিপি ছিল ৪.৫৩ ট্রিলিয়ন ডলার। অত্যন্ত লক্ষ্যণীয় যে, দীর্ঘ দুই দশক অতিবাহিত হওয়ার পরও জাপানের জিডিপির অংকের তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসেনি। অন্যদিকে, একই সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জিডিপি ছিল ১৩.৮১ ট্রিলিয়ন ডলার, যা বর্তমানে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩২.৩৮ ট্রিলিয়ন ডলারে।

বিশ্ব অর্থনীতিতে এক সময় দ্বিতীয় শীর্ষ অবস্থানে থাকা জাপানের এই পতন এবং বর্তমানে চতুর্থ স্থানে নেমে আসার পেছনে বেশ কিছু জটিল কারণ কাজ করেছে। অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক মন্দা, স্থবিরতা এবং তীব্র জনসংখ্যাগত সংকট জাপানের এই অবনতির প্রধান কারণ। ২০১০ সালে চীনের কাছে দ্বিতীয় স্থান হারানোর পর জাপান দীর্ঘ সময় তৃতীয় স্থানে অবস্থান করলেও, ২০২৩ সালের শেষ দিকে জার্মানি এবং পরবর্তী সময়ে ভারতের দ্রুত অর্থনৈতিক উত্থানের ফলে জাপান বর্তমানে চতুর্থ অবস্থানে চলে গেছে।

সিঙ্গাপুরভিত্তিক সংবাদমাধ্যম 'দ্য স্ট্রেইটস টাইমস'-এর এক প্রতিবেদনে বিস্তারিত জানানো হয়েছে যে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মার্কিন ডলারের বিপরীতে জাপানি মুদ্রা ইয়েনের মান প্রায় ১৮ থেকে ২০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। আন্তর্জাতিকভাবে বিভিন্ন দেশের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি মার্কিন ডলারের মাপে হিসাব করা হয়। ফলে ইয়েনের মান ব্যাপকহারে কমে যাওয়ায় ডলারের অঙ্কে জাপানের অর্থনীতির আকার ছোট প্রদর্শিত হয়েছে, যা তাদের বৈশ্বিক তালিকায় পিছিয়ে দিয়েছে। মূলত এই মুদ্রার অবমূল্যায়ন এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক স্থবিরতাই জাপানকে বর্তমান সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

সূত্র: দ্য স্ট্রেইটস টাইমস