বিশ্বজুড়ে যখন চলচ্চিত্রের নির্মাণশৈলী এবং প্রযুক্তির আমূল পরিবর্তন ঘটছে, তখন আমাদের দেশের চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রধান কেন্দ্র বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন বা বিএফডিসি এখনো সেই সেকেলে অবকাঠামো আর পুরোনো ধ্যানধারণার বেড়াজালে আটকে আছে। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সব ক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যাপক উৎকর্ষ ঘটলেও সিনেমা নির্মাণের এই আঁতুড়ঘরে এখনো আধুনিকতার ছোঁয়া লাগেনি। বিশ্ব যখন উন্নত প্রযুক্তির সহায়তায় দ্রুত সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন বিএফডিসি তার পুরোনো অবকাঠামো, সেকেলে ব্যবস্থাপনা এবং চরম প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার মধ্যে স্থবির হয়ে আছে।
প্রতিষ্ঠানটির সংগ্রহে এখনো ২০১৫ সালের সাইলেন্ট ক্যামেরা, ২সি/৩সি ক্যামেরা ও অ্যারি ৪৩৫ ক্যামেরার মতো আদিম প্রযুক্তিনির্ভর যন্ত্রপাতিই বেশি। বর্তমান যুগের উচ্চমানের সিনেমা নির্মাণের জন্য এই যন্ত্রপাতিগুলো একেবারেই অপ্রাসঙ্গিক। ফলে চলচ্চিত্র নির্মাতারা প্রয়োজনীয় আধুনিক ক্যামেরা, লেন্স ও অন্যান্য অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতির জন্য সম্পূর্ণভাবে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। শুধু তাই নয়, পোস্ট-প্রোডাকশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্য অনেক নির্মাতা এখন দেশের বাইরে গিয়ে কারিগরি সহায়তা নিচ্ছেন, যা দেশের জন্য যেমন অর্থনৈতিক ক্ষতি, তেমনি মেধাসত্ত্বের অপচয়। অন্যদিকে, বিএফডিসির নিজস্ব শুটিং ফ্লোর, ক্যামেরা, ডাবিং থিয়েটার ও এডিটিং প্যানেলের অনেক সুবিধাই বর্তমানে অব্যবহৃত অথবা অত্যন্ত সীমিত ব্যবহারের মধ্যে পড়ে আছে। এর ফলে একদিকে যেমন চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে, অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানটি বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছে।
২০২৫ সালের লক্ষ্যমাত্রা হিসেবে বিএফডিসি ডিজিটাল ব্যবসায়িক সেবা, উন্নত চলচ্চিত্র আর্কাইভ, সাউন্ড রেকর্ডিং স্টুডিওর সংস্কার এবং কিছু অবকাঠামোগত উন্নয়ন কার্যক্রম চালু করার কথা বললেও, চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্টদের মতে এগুলো আন্তর্জাতিক মানের ধারেকাছেও নেই। তাদের দাবি, এফডিসির সংকট শুধু প্রযুক্তিগত নয়; বরং এর গভীরে রয়েছে অব্যবস্থাপনা, সেবাপদ্ধতির ত্রুটি, অতিরিক্ত ব্যয়, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব এবং শিল্পবান্ধব পরিবেশের অনুপস্থিতি।
বিএফডিসির বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুমা তানি এক বিস্ফোরক তথ্যে জানান, পূর্ববর্তী স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এফডিসির আধুনিকায়নের জন্য ৩০০ কোটি টাকার একটি বিশাল প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, সেই বরাদ্দকৃত অর্থ আধুনিকায়নের কাজে ব্যয় না করে এক শ্রেণির মানুষ আত্মসাৎ করেছে। যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে কারিগরি ও প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের ওপর এবং এফডিসি প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়েছে। তবে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, বর্তমান সরকারের আমলেও আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং বিশ্বমানের সব প্রযুক্তি নিয়ে আসার চেষ্টা চলছে। সর্বাধুনিক প্রযুক্তির ক্যামেরা, লেন্স ও এডিটিং মেশিন আনার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে, যা সম্পন্ন হলে সিনেমাশিল্প পুনরায় ঘুরে দাঁড়াবে এবং এফডিসি বিশ্বমানের হয়ে উঠবে।
প্রযুক্তির পাশাপাশি অবকাঠামোগত সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে মাসুমা তানি বলেন, সংস্কার এখন অত্যন্ত জরুরি। বর্ষার সময় বিএফডিসির বেশ কয়েকটি শুটিং ফ্লোর ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। ফ্লোরের ছাদ দিয়ে পানি পড়ার কারণে এই সময়ে কেউ সেখানে শুটিং করতে চায় না। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সাথে কথা বলা হলেও এখন পর্যন্ত প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। তিনি আরও যোগ করেন, শুধু যন্ত্রপাতির উৎকর্ষ সাধন করলেই হবে না, সেই প্রযুক্তি চালানোর জন্য দক্ষ জনবলের অভাব রয়েছে। এই ঘাটতি পূরণে দক্ষ জনবল গড়ে তোলার জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও করা হবে।
নির্মাতা রায়হান রাফি বর্তমান পরিস্থিতির সমালোচনা করে বলেন, সারা বিশ্বের চলচ্চিত্রশিল্প এখন পুরোপুরি প্রযুক্তিনির্ভর। আধুনিক ক্যামেরা, সাউন্ড সিস্টেম, ভিএফএক্স (VFX) এবং ভার্চুয়াল প্রোডাকশনের মতো ক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন পরিবর্তন আসছে। কিন্তু আমাদের বিএফডিসি সেই গতিতে এগোতে পারেনি। শুধু ভবন বা অবকাঠামো সংস্কার করলেই হবে না, প্রযুক্তির আধুনিকীকরণ, দক্ষ জনবল তৈরি, নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক মানের পোস্ট-প্রোডাকশন সুবিধা নিশ্চিত করার পাশাপাশি একটি দূরদর্শী দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এখন সময়ের দাবি।
একই সুরে কথা বলেছেন নির্মাতা মেজবাউর রহমান সুমন। তিনি মনে করেন, আধুনিকায়ন মানে শুধু দামি যন্ত্রপাতির সংগ্রহ নয়, বরং সেই প্রযুক্তি সঠিকভাবে পরিচালনা বা অপারেট করার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবল নিশ্চিত করা। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে আধুনিক যন্ত্রপাতি ও দক্ষ জনবলের দাবি জানিয়ে এলেও এফডিসি কর্তৃপক্ষ তা আমলে নিচ্ছে না। সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য এফডিসি কর্তৃপক্ষকে এখন আরও আন্তরিকভাবে এগিয়ে আসতে হবে।











