জুলাই আন্দোলনে আহত এক ব্যক্তিকে সরকারি সুবিধার চেক দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে অর্থ দাবি, শারীরিক নির্যাতন এবং হত্যাচেষ্টার অভিযোগে ‘জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন’-এর ১৪ জন কর্মকর্তা ও কর্মচারীর বিরুদ্ধে আদালতে মামলা দায়ের করা হয়েছে। ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত এই মামলাটি গ্রহণ করে বিস্তারিত তদন্তের দায়িত্ব দিয়েছেন পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (সিআইডি)।
মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মাহবুব আলমের আদালতে জুলাইযোদ্ধা গিয়াস উদ্দিন এই অভিযোগপত্র দাখিল করেন। বাদীপক্ষের আইনজীবী মো. ইয়াসিন মিয়া বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, আদালত মামলাটি গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করেছেন এবং আগামী ৫ অক্টোবরের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন সিআইডিকে।
মামলার প্রধান আসামি হিসেবে অভিযুক্ত করা হয়েছে জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের সাইদুর রহমান শহীদ (২৪) এবং ফাউন্ডেশনের জ্যেষ্ঠ ভেরিফিকেশন অফিসার ইফতেখার হোসেনকে (৩০)। এছাড়া মামলার অন্যান্য আসামির তালিকায় রয়েছেন মেহেদী হাসান প্রিন্স, সাগর, আফজালুর রহমান সায়েম, হারুন অর রশিদ, মো. কামরুল হোসেন, আলিফ, জাহিদ, মোমেনুজ্জামান দিপু, সাজ্জাদ মোস্তফা, সাবরিনা আফরোজ শ্রাবন্তী, ফাতেমা আফরিন পায়েল ও ইয়াসিন মোস্তফা। পাশাপাশি আরও ২০ থেকে ২৫ জন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে।
আবেদনের বিবরণ অনুযায়ী, জুলাই আন্দোলনের আহতদের জন্য নির্ধারিত সরকারি সুবিধার চেক গ্রহণ করতে জুলাই স্মৃতি ফাউন্ডেশনে গিয়েছিলেন বাদী গিয়াস উদ্দিন। সেখানে প্রত্যাশিত সহায়তা না পেয়ে তিনি বাংলামোটরস্থ এনসিপি অফিসে যান এবং ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক সারজিস আলম, আন্দোলনের নেতা হাসনাত আবদুল্লাহ, তাসনিম জারা ও স্নিগ্ধকে বিষয়টি বিস্তারিত জানান। তারা তাকে আশ্বস্ত করেন যে, ফাউন্ডেশনে যোগাযোগ করলে দ্রুত চেক প্রদান করা হবে। তবে পরবর্তীতে ফাউন্ডেশনের সংশ্লিষ্টরা নানা অজুহাতে তাকে কালক্ষেপণ করান এবং বারবার পরে আসার কথা বলেন।
অভিযোগে বলা হয়েছে, গত বছরের ৩ মে চেক গ্রহণের উদ্দেশ্যে পুনরায় ফাউন্ডেশনে গেলে আসামিরা তাকে এক অনাকাঙ্ক্ষিত প্রস্তাব দেয়। তারা জানায়, চেকের মোট ৩ লাখ টাকার ৫০ শতাংশ অর্থাৎ দেড় লাখ টাকা আগে প্রদান করলে তবেই ব্যাংক থেকে ক্যাশ করে ওই চেকটি তাকে দেওয়া হবে। গিয়াস উদ্দিন এই অনৈতিক চাঁদা দিতে সরাসরি অস্বীকৃতি জানান। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে আসামিরা তাকে কৌশলে একটি গোপন কক্ষে নিয়ে যায়।
সেই কক্ষে প্রিন্স ও সাগরের সহায়তায় তাকে ধরে রাখা হয় এবং সাইদুর রহমান শহীদ ও সায়েম তাকে নির্মমভাবে কিল-ঘুষি ও লাথি মেরে নির্যাতন করতে থাকে। নির্যাতনের এক পর্যায়ে তাকে দেয়ালে ধাক্কা দিলে পাশে থাকা রডের সাথে তার মাথা আঘাতপ্রাপ্ত হয়, যার ফলে তিনি সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়েন। কিছুক্ষণ পর যখন তার জ্ঞান ফেরে, তিনি দেখতে পান তার শরীর থেকে রক্ত ঝরছে। তিনি চিৎকার করে সাহায্য চাইলেও শাহিদ, সায়েম ও কামরুল তাকে আরও মারধর করে জোরপূর্বক কক্ষ থেকে বের করে দেওয়ার চেষ্টা করেন। পরবর্তীতে হারুন ও কামরুল তাকে ফাউন্ডেশনের লিফটের সামনে ফেলে রেখে চলে যান।
গুরুতর আহত অবস্থায় গিয়াস উদ্দিনের ছেলে তাকে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান এবং সেখানে তার প্রাথমিক চিকিৎসা করানো হয়। এরপর তিনি ন্যায়বিচারের আশায় রমনা থানায় মামলা করতে যান, কিন্তু থানা কর্তৃপক্ষ মামলাটি গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানায় এবং দীর্ঘ সময় কালক্ষেপণ করে। শেষ পর্যন্ত পুলিশ তাকে আদালতের মাধ্যমে মামলা দায়ের করার পরামর্শ দেয়।
বাদী গিয়াস উদ্দিন জানান, ঘটনার পর তিনি দীর্ঘ সময় চিকিৎসাধীন ছিলেন। রমনা থানায় অভিযোগ জানাতে গিয়েও পুলিশি অসহযোগিতার মুখে পড়ে তিনি শেষ পর্যন্ত আদালতের শরণাপন্ন হন। মামলার অভিযোগে দণ্ডবিধির ৩২০, ৩২৩, ৩২৪, ৩২৫, ৩২৬, ৩০৭, ৩৭৯, ৩৮৫, ৫০৬ (২) ও ১০৯ ধারায় আইনি প্রতিকার চাওয়া হয়েছে।















