ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া পৌর শহরের ব্যস্ত সড়ক বাজার এলাকা। চারদিকে মানুষের ভিড়, যানবাহনের কোলাহল আর কেনাবেচার ব্যস্ততা। এই কর্মচঞ্চল পরিবেশের মধ্যেই রাস্তার পাশে ফুটপাতে বসে সবজি বীজ বিক্রি করেন মো. আবুল হোসেন। বয়স এখন আশির কোঠায়। সময়ের সাথে সাথে শরীর নুয়ে পড়েছে, দৃষ্টিশক্তিও এখন আগের মতো প্রখর নেই। দূরের লেখাগুলো ঝাপসা হয়ে আসে, চোখে এখন এক ধরণের আবছা অন্ধকার। তবুও জীবনের এই অপরাহ্নে অটুট রয়ে গেছে তার একটি অভ্যাস—প্রতিদিন ছাপা পত্রিকা পড়ার নেশা।

সড়ক বাজারের সেই পরিচিত ফুটপাতে যখন আবুল হোসেন সবজি বীজের পুঁটলি সাজিয়ে বসেন, তখন তার পাশে থাকে একটি জাতীয় দৈনিক। দৃষ্টিশক্তির সীমাবদ্ধতার কারণে তিনি পত্রিকাটিকে চোখের একদম কাছে টেনে ধরেন। অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে প্রতিটি কলাম পড়া তার প্রতিদিনের রুটিন। দীর্ঘ প্রায় চার দশক ধরে এই অভ্যাসটি তিনি লালন করে আসছেন। বয়সের ভারে শরীর ক্লান্ত হলেও পত্রিকার প্রতি তার অনুরাগ বিন্দুমাত্র কমেনি। প্রতিদিন নিয়ম করে একটি জাতীয় দৈনিক কিনে পড়া তার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই অদম্য আগ্রহের কারণেই স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে তিনি এখন ‘পত্রিকাপ্রেমী আবুল হোসেন’ নামেই বেশি পরিচিত।

আখাউড়া পৌর শহরের রাধানগর এলাকার বাসিন্দা আবুল হোসেনের পরিবারে স্ত্রী, তিন মেয়ে ও এক ছেলে। সন্তানরা বর্তমানে আলাদাভাবে বসবাস করায় তিনি এখন স্ত্রীকে নিয়ে একটি ভাড়া বাসায় থাকেন। জীবিকার তাগিদে তাকে প্রতিদিন সড়ক বাজারের ফুটপাতে সময় কাটাতে হয়, যেখানে তিনি বিভিন্ন জাতের সবজি বীজ বিক্রি করেন। তবে তার এই জ্ঞানতৃষ্ণা বা পত্রিকা পড়ার প্রতি ভালোবাসার জন্ম অনেক আগে, তার শৈশবে। ছোটবেলা থেকেই খবরের কাগজের প্রতি ছিল তার তীব্র আকর্ষণ, কিন্তু তৎকালীন আর্থিক অনটনের কারণে নিজের জন্য পত্রিকা কেনার সামর্থ্য ছিল না তার। ফলে বাজারের লাইব্রেরি কিংবা বইয়ের দোকানে বসে অন্যের ফেলে যাওয়া বা প্রদর্শিত পত্রিকা পড়ে সময় কাটাতেন তিনি। পরবর্তীতে যখন উপার্জনের পথ খুলে যায়, তখন নিজের টাকা দিয়ে পত্রিকা কেনা শুরু করেন। সেই থেকে টানা প্রায় ৪০ বছর ধরে ছাপা পত্রিকার সাথে তার এই নিবিড় সম্পর্ক।

নিজের এই দীর্ঘদিনের অভ্যাস সম্পর্কে আবুল হোসেন বলেন, “ছোটবেলা থেকেই পত্রিকা পড়ার প্রতি আমার প্রচণ্ড আগ্রহ ছিল। তবে তখন সামর্থ্য ছিল না বলে লাইব্রেরি বা বইয়ের দোকানে গিয়ে খবর পড়তাম। যখন থেকে উপার্জন শুরু করলাম, তখন থেকেই নিজের টাকা দিয়ে পত্রিকা কিনে পড়ার সুযোগ পাই। প্রায় চার দশক ধরে এই অভ্যাসটি ধরে রেখেছি।” দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়ার বিষয়ে তিনি কিছুটা আক্ষেপ করলেও তার পড়ার আগ্রহে কোনো বাধা আসেনি। তিনি জানান, “কয়েক বছর আগে থেকে চোখের সমস্যা শুরু হয়েছে। এখন দূরের লেখা স্পষ্ট দেখি না, তাই পত্রিকা চোখের একদম কাছে এনে পড়তে হয়। তবে এভাবে পড়তে আমার কোনো অসুবিধা হয় না, বরং পড়ার তৃপ্তিটা আগের মতোই থাকে।”

প্রতিদিনের সংবাদপত্রের কোন বিষয়গুলো তাকে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করে, তা জানতে চাইলে আবুল হোসেন জানান, তিনি প্রথমে রাজনৈতিক খবরাখবর পড়েন। এরপর জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদের পাতায় চোখ বুলিয়ে নেন। সবশেষে খেলাধুলা এবং গ্রামবাংলার বিভিন্ন প্রান্তের খবরগুলো পড়েন তিনি। তার মতে, পত্রিকা পড়ার মাধ্যমেই দেশের বর্তমান পরিস্থিতি এবং সমসাময়িক নানা বিষয়ে স্বচ্ছ ধারণা পাওয়া যায়। তিনি আরও বলেন, “ঝড়-বৃষ্টি যাই হোক, আমার পত্রিকা কেনা কখনোই বন্ধ হয় না। প্রতিদিন একটি করে জাতীয় পত্রিকা কিনি। পত্রিকা না পড়লে দিনটি যেন পূর্ণ হয় না। অনেক সময় বাজারের মানুষ আমার কাছে এসে বিভিন্ন খবর জানতে চায়, তখন আমি তাদের সঠিক তথ্য দিয়ে সাহায্য করতে পারি।”

আবুল হোসেনের জীবনের গল্পটি কেবল পত্রিকা পড়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এসএসসি পাস করার পর তিনি একটি কোম্পানিতে দীর্ঘ ৩০ বছর কর্মরত ছিলেন। সেখান থেকে অবসরে যাওয়ার পর তিনি এক ধরণের শূন্যতা অনুভব করেন এবং বেকার হয়ে পড়েন। জীবনযুদ্ধের তাগিদেই পরবর্তীতে তিনি ফুটপাতে সবজি বীজ বিক্রির কাজ শুরু করেন। তিনি বলেন, “এখন বয়স হয়েছে, আগের মতো ব্যবসা করার ক্ষমতা নেই। অনেক সময় শুধু বসে থাকতে হয়। সেই অবসর সময়েই পত্রিকা পড়া আমার কাছে সবচেয়ে বড় বিনোদন এবং শিক্ষার মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি এখন আমার অভ্যাসের চেয়েও বেশি কিছু।”

স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা জানান, আবুল হোসেনের এই ব্যক্তিত্ব এলাকার সবার কাছে এক বিস্ময়। প্রতিদিন সকালে পত্রিকা হাতে না পাওয়া পর্যন্ত তিনি যেন অস্থির হয়ে থাকেন। খোলা আকাশের নিচে ফুটপাতে বসে ব্যবসা করার পাশাপাশি এই বয়সেও তার এমন জ্ঞানতৃষ্ণা স্থানীয়দের গভীরভাবে আকৃষ্ট করে। স্থানীয় পত্রিকার হকার মো. শাহআলম জানান, “আমি দীর্ঘকাল ধরে এখানে পত্রিকা বিক্রি করছি, কিন্তু আবুল হোসেনের মতো এমন নিয়মিত এবংনিষ্ঠাবান পাঠক খুব কম দেখেছি। আমাকে দেখামাত্রই তিনি পত্রিকা নেওয়ার জন্য এগিয়ে আসেন।”

সড়ক বাজারের আরেক ব্যবসায়ী মো. মনির হোসেন বলেন, “আমার আগে নিয়মিত পত্রিকা পড়ার অভ্যাস ছিল না। কিন্তু আবুল হোসেনকে প্রতিদিন এভাবে পত্রিকা পড়তে দেখে আমি অনুপ্রাণিত হয়েছি। তার কাছ থেকে পত্রিকা নিয়ে পড়তে পড়তে এখন আমারও অভ্যাস হয়ে গেছে। এখন পত্রিকা না পড়লে আমারও ভালো লাগে না।”

জীবনের নানা প্রতিকূলতা, বয়সের ভার কিংবা চোখের দুর্বলতা—কোনোটিই আবুল হোসেনের জানার আগ্রহকে স্তিমিত করতে পারেনি। ফুটপাতের ছোট ব্যবসার ফাঁকে প্রতিদিন তিনি খুঁজে নেন পৃথিবীর খবরাখবর। তার কাছে ছাপা পত্রিকা কেবল সংবাদ জানার মাধ্যম নয়, বরং দীর্ঘ জীবনের এক প্রিয় ও বিশ্বস্ত সঙ্গী।