নওগাঁর আত্রাই উপজেলার ২ নম্বর ভোঁপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের সরকারি সম্পদ হিসেবে সংরক্ষিত জানালাগুলো যথাযথ অনুমোদনের প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নাজিমুদ্দিনের বিরুদ্ধে। মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) দুপুর ২টার দিকে এই চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি ঘটে। অভিযোগ উঠেছে, দুটি ভ্যানগাড়ির মাধ্যমে পরিষদের জানালাগুলো চেয়ারম্যানের নিজ বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। এই দৃশ্য স্থানীয় জনতাক নজরে এলে তারা তাৎক্ষণিকভাবে ভ্যান দুটি আটক করেন। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে উত্তেজিত জনতা চেয়ারম্যান নাজিমুদ্দিনকে ইউনিয়ন পরিষদ প্রাঙ্গণেই অবরুদ্ধ করে রাখেন।
প্রত্যক্ষদর্শী স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ইউনিয়ন পরিষদ ভবনের বেশ কয়েকটি জানালা অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে ভ্যানগাড়িতে করে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছিল। বিষয়টি জানাজানি হতেই মুহূর্তের মধ্যে শত শত মানুষ সেখানে জড়ো হন এবং ভ্যান দুটির গতি রোধ করে জানালাগুলো উদ্ধার করেন। এসময় চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে সরকারি সম্পদ আত্মসাতের অভিযোগ উঠলে এলাকায় তীব্র উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। উত্তেজিত জনতা চেয়ারম্যানকে মুক্তি দিতে অস্বীকার করে তাকে পরিষদ প্রাঙ্গণে অবরুদ্ধ করে রাখেন।
ঘটনার খবর দ্রুত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামানের কাছে পৌঁছায়। তবে তিনি ছুটিতে থাকায় সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কর্মকর্তাদের বিষয়টি অবহিত করেন এবং দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার নির্দেশ দেন। পরবর্তীতে ভূমি কর্মকর্তা মো. আতিকুর রহমান আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সাথে নিয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছান। তিনি পরিস্থিতি পর্যালোচনার চেষ্টা করলেও জনমনে ক্ষোভ ছিল চরম। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে পুলিশ সদস্যরা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে চেয়ারম্যান নাজিমুদ্দিনকে জনগণের হাত থেকে উদ্ধার করেন এবং একটি পিকআপ ভ্যানে করে তাকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেন।
এই ঘটনা নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মো. হামিদুল হক বাবু এবং সাধারণ সম্পাদক মো. আলমগীর হোসেন। তারা স্পষ্টভাবে বলেন, ইউনিয়ন পরিষদের সরকারি সম্পদ কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। সরকারি সম্পদ অপসারণ, হস্তান্তর কিংবা নিলাম করার ক্ষেত্রে নির্ধারিত বিধি-বিধান মেনে চলা এবং যথাযথ কর্তৃপক্ষের পূর্ব অনুমোদন থাকা বাধ্যতামূলক। তাদের দাবি, কোনো ধরনের আইনি অনুমোদন ছাড়াই পরিষদের জানালা সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা কেবল একটি অনিয়ম নয়, বরং এটি সরকারি সম্পদ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে একটি গুরুতর অপরাধ এবং প্রশ্নবিদ্ধ পদক্ষেপ।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত সাধারণ মানুষের ক্ষোভ ছিল আরও প্রবল। তারা অভিযোগ করেন, দিনের আলোতে সরকারি সম্পদ সরিয়ে নেওয়ার মতো দুঃসাহস দেখানো হয়েছে এবং স্থানীয়রা তা হাতেনাতে ধরেছেন। তা সত্ত্বেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, যা জনমনে গভীর অসন্তোষ তৈরি করেছে। স্থানীয়দের প্রশ্ন, সাধারণ মানুষ ছোট কোনো অপরাধ করলে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়, কিন্তু একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি সরকারি সম্পদ আত্মসাতের অভিযোগের মুখে পড়লে কেন তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হলো না? তারা ক্ষোভের সাথে বলেন, ‘আইন সবার জন্য সমান হওয়া উচিত। সরকারি সম্পদ সরানোর সময় হাতেনাতে আটক করার পরও উপস্থিত ম্যাজিস্ট্রেট ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে বিচার না করে প্রটোকল দিয়ে তাকে সরিয়ে নিয়ে গেলেন।’
এই পুরো বিষয়ে ভূমি কর্মকর্তা মো. আতিকুর রহমান জানান, সরকারি সম্পদ অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার সময় স্থানীয় জনগণ মালামালগুলো জব্দ করেছিলেন, যা পরবর্তীতে প্রশাসন উদ্ধার করে সরকারি হেফাজতে নিয়েছে। তিনি আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়ে জানান, চেয়ারম্যান নাজিমুদ্দিন নিজেই নিজের অপরাধ স্বীকার করেছেন।
বর্তমানে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ ও উত্তেজনা বিরাজ করছে। তারা দাবি জানিয়েছেন, ইউনিয়ন পরিষদের সরকারি সম্পদ কীভাবে, কার নির্দেশে, কোন প্রক্রিয়ায় এবং কোথায় নেওয়া হচ্ছিল—তা একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটির মাধ্যমে স্পষ্ট করতে হবে। একই সঙ্গে সরকারি সম্পদ সরানোর ঘটনায় কোনো অনিয়ম বা বিধি লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা। স্থানীয় জনতা আরও ঘোষণা দিয়েছেন যে, ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত চেয়ারম্যান নাজিমুদ্দিনকে ইউনিয়ন পরিষদে পুনরায় দায়িত্ব পালন করতে দেওয়া হবে না। এই পরিস্থিতির ফলে ইউনিয়ন পরিষদের স্বাভাবিক প্রশাসনিক কার্যক্রম বর্তমানে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।















