ইসলামি জীবনদর্শনে অলসতা এবং জীবিকা অন্বেষণে উদাসীন থাকা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ইবাদতের দোহাই দিয়ে কিংবা আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুলের নামে হাত গুটিয়ে বসে থাকা একজন মুমিনের জন্য বৈধ নয়। বাস্তব সত্যটি হলো, আকাশ থেকে কোনোদিন স্বর্ণ বা রৌপ্য বর্ষিত হয় না; বরং জীবনধারণের জন্য কঠোর পরিশ্রম ও প্রচেষ্টাই একমাত্র পথ।

যে মুসলমান ব্যক্তি শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ এবং সামান্য অর্থ উপার্জনের সক্ষমতা রাখেন, যার মাধ্যমে তিনি নিজের ও পরিবারের মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ করতে পারেন, তার জন্য অন্যের দান-সদকার ওপর নির্ভরশীল হওয়া ইসলামে নিষিদ্ধ। এ প্রসঙ্গে রাসুলুল্লাহ (সা.) অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলেছেন, ‘কোনো ধনী ব্যক্তি কিংবা সুস্থ-সবল ব্যক্তির জন্য জাকাত গ্রহণ করা বৈধ নয়।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ১৬৩৪)।

রাসুলুল্লাহ (সা.) যেসব বিষয়কে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছেন এবং হারাম ঘোষণা করেছেন, তার মধ্যে অন্যতম হলো ভিক্ষাবৃত্তি। মানুষের কাছে হাত পাতা কেবল অর্থনৈতিক নির্ভরতা নয়, বরং এটি একজন ব্যক্তির আত্মসম্মান, সামাজিক মর্যাদা এবং ব্যক্তিত্বকে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। নবীজি (সা.) সতর্ক করে বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি বিনা প্রয়োজনে মানুষের কাছে চায়, সে যেন জ্বলন্ত অঙ্গার আহরণ করে।’ (সহিহ ইবনে খুজাইমা, হাদিস: ২৪৪৬)।

অন্য একটি হাদিসে এই অপরাধের পরকালীন পরিণতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি নিজের সম্পদ বাড়ানোর উদ্দেশ্যে অপরের কাছে ভিক্ষা চায়, কিয়ামতের দিন তার চেহারায় ক্ষতচিহ্ন থাকবে এবং তাকে জাহান্নামের উত্তপ্ত পাথর খেতে হবে। অতএব, যার ইচ্ছা হোক সে এই কাজ কমিয়ে দিক এবং যার ইচ্ছা হোক সে তা পুরোপুরি পরিহার করুক।’ (তিরমিজি, হাদিস: ৬৫৩)।

তবে ইসলাম বাস্তববাদী ধর্ম। বিশেষ প্রয়োজনে বা চরম অপারগ অবস্থায় সাহায্য চাওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। কেউ যদি নিরুপায় হয়ে রাষ্ট্র বা কোনো ব্যক্তির কাছে সাহায্য প্রার্থনা করেন, তবে তা নিষিদ্ধ নয়। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘ভিক্ষাবৃত্তি হচ্ছে মুখমণ্ডল ক্ষতবিক্ষতকারী। মানুষ এর দ্বারা স্বীয় মুখমণ্ডল ক্ষতবিক্ষত করে। কাজেই যার ইচ্ছা ভিক্ষাবৃত্তি করে স্বীয় মুখকে ক্ষতবিক্ষত রাখুক, আর যে ইচ্ছা তা পরিহার করুক। তবে রাষ্ট্রপ্রধানের কাছে চাওয়া কিংবা চরম নিরুপায় হয়ে কিছু চাওয়ার বিষয়টি ভিন্ন।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ১৬৩৯)।

সাহায্য প্রার্থনা করার ক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহ (সা.) নির্দিষ্ট তিনটি বিশেষ পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করেছেন। কবিসাহ বিন মুখারিক আল হিলালি (রা.)-এর একটি ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে নবীজি (সা.) স্পষ্ট করেন যে, তিন ধরনের ব্যক্তি ছাড়া কারো জন্য হাত পাতা বা সাহায্য চাওয়া হালাল নয়:
১. যে ব্যক্তি কোনো কল্যাণকর কাজে লিপ্ত হয়ে অথবা অন্যের ঋণের জামিন হয়ে নিজে ঋণী হয়ে পড়েছেন। যতক্ষণ না সেই ঋণ পরিশোধ হচ্ছে, ততক্ষণ তার জন্য সাহায্য চাওয়া বৈধ। তবে ঋণ পরিশোধের পর তাকে এই অভ্যাস ত্যাগ করতে হবে।
২. যে ব্যক্তি কোনো আকস্মিক প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে পড়ে তার সমস্ত সঞ্চয় ও সম্পদ হারিয়েছেন। তার জন্য সাহায্য চাওয়া হালাল, যতক্ষণ না তিনি তার নিত্যপ্রয়োজনীয় চাহিদা পূরণে সক্ষম হন।
৩. যে ব্যক্তি চরম অভাবগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন এবং তার গোত্রের তিনজন বুদ্ধিমান ও ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তি সাক্ষ্য দেন যে, ওই ব্যক্তি সত্যিই অভাবী। সেক্ষেত্রে জীবিকা নির্বাহের ন্যূনতম সম্পদ লাভ করা পর্যন্ত তার জন্য সাহায্য প্রার্থনা করা বৈধ।

রাসুলুল্লাহ (সা.) স্পষ্টভাবে সতর্ক করে বলেছেন, এই তিন প্রকার লোক ছাড়া যারা সাহায্য চেয়ে বেড়ায়, তারা প্রকৃতপক্ষে হারাম খাদ্য গ্রহণ করছে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১০৪৪)।

মানুষের কর্মবিমুখতার পেছনে একটি বড় কারণ হলো নির্দিষ্ট কিছু পেশাকে ছোট করে দেখা। মহানবী (সা.) এমন সংকীর্ণ মানসিকতার কঠোর নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি সাহাবিদের শিক্ষা দিয়েছেন যে, যে কাজ হালাল, সেই কাজই সম্মানের। প্রকৃত অসম্মান হলো অন্যের ওপর নির্ভরশীল হওয়া। নবীজি (সা.) এর গুরুত্ব বোঝাতে বলেন, ‘যদি তোমাদের কেউ রশি নিয়ে নিজের পিঠে কাঠের বোঝা বয়ে আনে এবং তা বিক্রি করে, ফলে আল্লাহ তাকে অন্যের কাছে হাত পাতা থেকে রক্ষা করেন, তবে তা মানুষের কাছে চাওয়ার চেয়ে অনেক উত্তম—চাই মানুষ তাকে কিছু দিক বা না দিক।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৪৭১)।

পরিশেষে, একজন মুসলমানের প্রধান দায়িত্ব হলো কর্মমুখী হওয়া এবং পরনির্ভরশীল জীবন থেকে বেরিয়ে এসে স্বাবলম্বী হওয়া। ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় হালাল উপার্জনের মাধ্যমেই প্রকৃত সম্মান ও মানসিক শান্তি লাভ করা সম্ভব। আল্লাহ আমাদের সবাইকে সঠিক পথে চলার তাওফিক দান করুন। আমিন।

(লেখকের ব্যক্তিগত ওয়েবসাইট থেকে মো. আবদুল মজিদ মোল্লার ভাষান্তর)