ভারতীয় চলচ্চিত্র জগতের এক অত্যন্ত শক্তিশালী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব প্রদীপ রাওয়াতের প্রয়াণে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে বিনোদন অঙ্গনে। আমির খান অভিনীত ব্লকবাস্টার ছবি ‘গজনি’-র সেই রক্ত হিম করা এবং আইকনিক খলনায়ক চরিত্রে অভিনয় করে তিনি দর্শক মনে চিরস্থায়ী আসন করে নিয়েছিলেন। দীর্ঘদিন রক্তের ক্যানসারের সঙ্গে কঠিন লড়াই করার পর মুম্বাইয়ের একটি হাসপাতালে ৭৪ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই প্রবীণ অভিনেতা। গত এক মাসেরও বেশি সময় ধরে তিনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। তার এই আকস্মিক প্রয়াণে ভারতীয় চলচ্চিত্র ও সংস্কৃতি অঙ্গনে শোকের ঢেউ বয়ে গেছে। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী ও এক পুত্রসন্তানসহ অগণিত গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।

অভিনেতার প্রয়াণের খবরটি ভারতের বিশিষ্ট সংবাদমাধ্যম ‘মিড-ডে’-কে নিশ্চিত করেছেন তার ব্যবস্থাপক সিদ্ধার্থ তিওয়ারি। অত্যন্ত আবেগঘন কণ্ঠে তিনি জানান, প্রায় পাঁচ বছর আগে প্রদীপ রাওয়াত একবার ক্যানসার জয় করেছিলেন, যা ছিল এক দৃষ্টান্ত। তবে সম্প্রতি এই মরণব্যাধিটি ফের নতুন করে তার শরীরে আঘাত হানে। গত এক মাস ধরে তিনি হাসপাতালে নিবিড় চিকিৎসাধীন ছিলেন এবং তার রক্তের প্লেটলেট সংখ্যা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক পর্যায়ে নেমে গিয়েছিল। অভিজ্ঞ চিকিৎসকদের সব প্রচেষ্টা ও সর্বোচ্চ চেষ্টা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত তাকে মৃত্যুর কাছে হার মানতে হয়। ৫ আগস্ট তার শেষকৃত্য সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে।

প্রদীপ রাওয়াতের অভিনয় জীবনের যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৮৫ সালে। প্রয়াত মুকুল আনন্দ পরিচালিত এবং রাজ বাব্বর ও ডিম্পল কাপাডিয়া অভিনীত ‘এতবার’ সিনেমার মাধ্যমে তিনি বড় পর্দায় আত্মপ্রকাশ করেছিলেন। তবে চলচ্চিত্রে পা রাখার খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ১৯৮৮ সালে বিআর চোপড়ার কালজয়ী ধারাবাহিক ‘মহাভারত’-এ অশ্বত্থামার চরিত্রে অভিনয় করে তিনি ঘরে ঘরে পরিচিতি লাভ করেন। তার সেই গম্ভীর কণ্ঠ এবং শক্তিশালী উপস্থিতি দর্শকদের মুগ্ধ করেছিল। নব্বইয়ের দশকে টেলিভিশন এবং চলচ্চিত্রের জগতে সমান গতিতে কাজ করে গেছেন এই অভিনেতা। এই সময়ে অমিতাভ বচ্চন অভিনীত ‘অগ্নিপথ’ (১৯৯০), ব্যাপক জনপ্রিয় টিভি ধারাবাহিক ‘চন্দ্রকান্তা’ (১৯৯৪), ‘কয়লা’ (১৯৯৭) এবং ‘সরফরোশ’ (১৯৯৯)-এর মতো স্মরণীয় সব প্রজেক্টে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী ভূমিকায় অভিনয় করেন তিনি।

দুই হাজারের দশকে এসে তিনি টেলিভিশনের কাজের পরিমাণ কিছুটা কমিয়ে দিলেও হিন্দি ও বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষার চলচ্চিত্রে নিজের শক্তিশালী অবস্থান অটুট রেখেছিলেন। ২০০১ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত অল-টাইম ব্লকব্লাস্টার ‘লাগান’ সিনেমায় ভুবন রূপী আমির খানের দলে থাকা অলরাউন্ডার ক্রিকেটার ‘দেবা সিং সোধি’-র চরিত্রটি তাকে নতুন করে খ্যাতি এনে দেয়। এর ঠিক সাত বছর পর ২০০৮ সালে এ আর মুরুগাদোসের ব্লকবাস্টার রিভেঞ্জ থ্রিলার ‘গজনি’-তে আমির খানের মুখোমুখি সেই নৃশংস ও রক্ত হিম করা খলনায়ক ‘গজনি ধর্মাত্মা’ চরিত্রে অভিনয় করে তিনি ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে নিজের নাম খোদাই করে নেন। উল্লেখ্য, এই হিন্দি রিমেকের আগে ২০০৫ সালে সূর্য অভিনীত মূল তামিল ‘গজনি’ সিনেমাতেও তিনি একই খলনায়ক চরিত্রে অভিনয় করে ব্যাপক সাড়া ফেলেছিলেন।

জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি অভিনয়ের প্রতি তার অনুরাগ ধরে রেখেছিলেন। সর্বশেষ ২০২৫ সালে ভিকি কৌশল অভিনীত ‘ছাভা’ সিনেমায় অভিনয় করেছিলেন এই গুণী শিল্পী। আর চলতি বছরেই মুক্তিপ্রাপ্ত তেলেগু কমেডি ড্রামা ‘গায়াপাড্ডা সিমহাম’ এবং নেপালি চলচ্চিত্র ‘আ বাটা আমা’-তে শেষবারের মতো দেখা গিয়েছিল এই অভিনেতাকে। বহু দশকজুড়ে ছড়িয়ে থাকা তার বহুমুখী অভিনয় শৈলী এবং ভারতীয় চলচ্চিত্রজগতে তার অসামান্য অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। তার প্রয়াণে বিনোদন জগত এক দক্ষ ও নিবেদিতপ্রাণ শিল্পীকে হারাল।