পবিত্র কোরআনের এক অমূল্য নির্দেশনায় আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, ‘হে ঈমানদাররা! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো। প্রত্যেক ব্যক্তি যেন ভেবে দেখে, সে আগামী দিনের (আখিরাতের) জন্য কী অগ্রিম পাঠিয়েছে। আর আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয়ই তোমরা যা করো, আল্লাহ সে সম্পর্কে সম্যক অবগত।’ (সুরা আল-হাশর, আয়াত: ১৮)। এই আয়াতটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, পার্থিব জীবনের চাকচিক্য সাময়িক, কিন্তু পরকালের জীবন চিরস্থায়ী। তাই প্রতিটি মুমিনের উচিত তাঁর জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে পরকালের পাথেয় হিসেবে গড়ে তোলা।

আসলে প্রতিটি মানুষ এবং জিনের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও মৌলিক প্রকল্প হলো মহান আল্লাহর ইবাদত। কারণ, আল্লাহ তাআলা আমাদের সৃষ্টিই করেছেন একমাত্র তাঁরই উপাসনা করার জন্য। পবিত্র কোরআনে তিনি স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন, ‘আমি জিন ও মানুষকে শুধু আমার ইবাদতের জন্যই সৃষ্টি করেছি।’ (সুরা আয-যারিয়াত, আয়াত: ৫৬)। প্রথিতযশা তাফসিরবিদদের মতে, এই ইবাদতের মূল কথা হলো একমাত্র আল্লাহর তাওহিদ প্রতিষ্ঠা করা এবং তাঁর একত্ববাদের ওপর অবিচল থাকা। যে ব্যক্তি আল্লাহর অশেষ অনুগ্রহে এই মহান লক্ষ্যটিকে নিজের জীবনে বাস্তবায়ন করতে পারে, সে দুনিয়ার অশান্তির মাঝেও নিরাপত্তা খুঁজে পায় এবং আখিরাতে লাভ করে চিরমুক্তি। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই যারা বলে, ‘আমাদের রব আল্লাহ, তারপর তারা তার ওপর অবিচল থাকে—তাদের কোনো ভয় থাকবে না এবং তারা দুঃখিতও হবে না। তারাই জান্নাতের অধিবাসী; তারা সেখানে চিরকাল থাকবে। এটি তাদের কর্মের প্রতিদান।’ (সুরা আহকাফ, আয়াত: ১৩-১৪)।

আল্লাহর ইবাদতের পাশাপাশি আমাদের জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায় নিজের জন্য, পরিবার, সমাজ এবং সামগ্রিক মানবতার জন্য রেখে যাওয়া সৎকর্মের প্রকল্প। আমরা এই পৃথিবীতে কী রেখে যাচ্ছি, তা-ই হবে কিয়ামতের দিন আমাদের গর্বের কথা। এমন সব উত্তম কাজ, যার মাধ্যমে আমরা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশা করি এবং বিচার দিবসে গর্বের সাথে আল্লাহর সামনে উপস্থাপন করতে পারি।

এই মুহূর্তে আমাদের উচিত নিজেদের অন্তরে কিছু আন্তরিক প্রশ্ন উত্থাপন করা: আমি কি আমার পরকালের জন্য কোনো নেক আমল সঞ্চয় করেছি? আমি কি প্রতিনিয়ত আল্লাহকে স্মরণ করি এবং তাঁর দেওয়া অগণিত নিয়ামতের জন্য যথাযথ শোকর আদায় করেছি? সকাল ও সন্ধ্যার দোয়া এবং জিকিরের মাধ্যমে আমি কি নিজেকে দুনিয়ার যাবতীয় অনিষ্ট থেকে সুরক্ষিত রেখেছি? আমার কথা কি সর্বদা সত্যের সাথে সংগতিপূর্ণ এবং আমি কি আমার দেওয়া অঙ্গীকারগুলো যথাযথভাবে রক্ষা করেছি? নফসের প্রবৃত্তি ও কুপ্রবৃত্তির বিরুদ্ধে লড়াই করে আমি কি আল্লাহর আনুগত্য করতে পেরেছি? আমার সালাতে কি যথাযথ খুশু-খুজু বা বিনয় ও একাগ্রতা রয়েছে? আমি কি কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য একনিষ্ঠভাবে সদকা ও দান-সদকা করেছি?

জীবনকে আরও সুন্দর করতে আমি কি উত্তম চরিত্রের অধিকারী হওয়ার চেষ্টা করেছি? আমার পিতা-মাতার প্রতি আমার ব্যবহার কি যথেষ্ট সম্মানজনক ও সদ্ব্যবহারপূর্ণ? জীবনসঙ্গীর হক আদায় এবং সন্তানদের দ্বীনি ও নৈতিক শিক্ষায় লালন-পালনের ক্ষেত্রে আমি কতটা সফল হয়েছি? সমাজের সামগ্রিক কল্যাণে আমার অবদান কতটুকু? আমি কি এমন কোনো ভালো কাজের বীজ বপন করেছি, যার ফল আমার মৃত্যুর পরও মানুষ ভোগ করবে এবং যা আমার জন্য সদকায়ে জারিয়া হয়ে থাকবে? আমি কি মানুষের গোপন কথা রক্ষা করে তাদের সম্মান রক্ষা করেছি? সম্পর্ক ও ভালোবাসার পবিত্র মর্যাদা কি আমি বজায় রেখেছি? আমার ভাইয়ের সাথে কি আমি সর্বদা হাসিমুখে সাক্ষাৎ করি? মুসলিম উম্মাহর সার্বিক কল্যাণের জন্য কি আমি অন্তরে দোয়া করি?

আল্লাহ তাআলা যা নিষিদ্ধ করেছেন, তেমন কথা ও কাজ থেকে নিজেকে দূরে রাখার চেষ্টা কি আমি করেছি? আমি কি প্রতিনিয়ত নিজের গুনাহের জন্য তওবা এবং আল্লাহর কাছে ইস্তিগফার করছি? মনে রাখতে হবে, এই সমস্ত নেককাজ আসলে আমাদের নিজেদেরই উপকারের জন্য। এগুলোর প্রতিদান আমরা কিয়ামতের দিন সরাসরি দেখতে পাব। তাই আজই ভাবুন, আপনার আধ্যাত্মিক অবস্থান কোথায়? পরকালের পাথেয় সংগ্রহের এই দীর্ঘ যাত্রায় আপনার অগ্রগতি কতটুকু?