ইসলামের মৌলিক শিক্ষা হলো অন্যায়ের সামনে মাথা নত না করা এবং সত্যের পক্ষে অবিচল থাকা। একজন মুমিনের জন্য জুলুমের প্রতিবাদ করা এবং আর্তমানবতাকে সৎ পথের আহ্বান জানানো কেবল একটি দায়িত্ব নয়, বরং এটি ইবাদতের অংশ। তবে এই পথচলায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় পরিপূর্ণ ইখলাসের সঙ্গে কাজ করা। সত্য প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে নেমে মুমিনকে সবসময় সতর্ক থাকতে হয় যেন সে কোনোভাবেই নির্ধারিত সীমা লঙ্ঘন না করে। সত্যের পক্ষে থাকার অর্থ এই নয় যে, কাউকে অন্যায়ভাবে আঘাত করা, মিথ্যা অপবাদ দেওয়া, অহেতুক ব্যক্তিগত আক্রমণ চালানো বা অশ্লীলতার চর্চা করা যাবে। ইসলামের শিক্ষা এসব কুরুচিপূর্ণ আচরণের সম্পূর্ণ বিরোধী। বর্তমান সময়ে অনেকে মনে করেন, ‘আমি সত্য বলছি, তাই আমার যা ইচ্ছা বলতে পারি।’ কিন্তু পবিত্র কোরআনের শিক্ষা এই সংকীর্ণ ধারণাকে সমর্থন করে না।
ন্যায়বিচার এবং সত্য সাক্ষ্যের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা অত্যন্ত কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন। পবিত্র কোরআনের সূরা মায়িদার ৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহর জন্য ন্যায়ের সঙ্গে সাক্ষ্যদানকারী হিসেবে সদা দণ্ডায়মান হও। কোনো কওমের প্রতি শত্রুতা যেন তোমাদের কোনোভাবে প্ররোচিত না করে যে তোমরা ইনসাফ করবে না। তোমরা ইনসাফ করো, তা তাকওয়ার নিকটতর এবং আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয়ই তোমরা যা করো, আল্লাহ সে বিষয়ে সবিশেষ অবহিত।’ এই আয়াতের মর্মার্থ অত্যন্ত গভীর। এখানে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, সত্য অবশ্যই বলতে হবে এবং ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়াতে হবে; তবে কারো প্রতি ব্যক্তিগত শত্রুতার বশবর্তী হয়ে তার ওপর বেইনসাফ করা বা সীমা লঙ্ঘন করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। সত্য প্রকাশের ক্ষেত্রে মুমিনের ভাষা হতে হবে কল্যাণকামিতার, সহানুভূতি ও শিষ্টাচারের।
ইতিহাসের পাতায় আমরা দেখতে পাই, মহান আল্লাহ মুসা (আ.) ও হারুন (আ.)-কে পাঠিয়েছিলেন তৎকালীন পৃথিবীর সবচেয়ে উদ্ধত ও অহংকারী শাসক ফেরাউনের কাছে। ফেরাউন ছিল ইতিহাসের অন্যতম নিকৃষ্ট মানুষ, যার নিষ্ঠুরতার কথা সর্বজনবিদিত। কিন্তু তার মতো কুখ্যাত ব্যক্তির সামনে সত্য বলার জন্য আল্লাহ তাঁর নবীদের যে নির্দেশ দিয়েছিলেন, তা ছিল বিস্ময়কর। সূরা ত্ব-হার ৪৪ নম্বর আয়াতে আল্লাহ নির্দেশ দেন, ‘তোমরা তার সঙ্গে নরম কথা বলবে। হয়তো বা সে উপদেশ গ্রহণ করবে অথবা ভয় করবে।’ এখানে একটি বিশেষ শিক্ষা নিহিত—যাকে সংশোধন করতে হবে, সে যত বড় অপরাধী বা অহংকারীই হোক না কেন, সত্য কথা বলার সময় শিষ্টাচার বজায় রাখা আবশ্যক। নরম কথা এবং সুন্দর আচরণ অনেক সময় কঠোর শব্দের চেয়ে বেশি কার্যকর হয় এবং মানুষকে সত্যের কাছাকাছি নিয়ে আসে।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনচরিত আমাদের জন্য এক অনন্য আদর্শ। মক্কার কাফিররা তাঁকে প্রতিনিয়ত অপমান করেছে, শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করেছে, এমনকি তাঁকে মিথ্যাবাদী ও জাদুকর বলে আখ্যায়িত করেছে। কিন্তু নবীজি (সা.) কখনো তাদের ঘায়েল করার জন্য ভিত্তিহীন অভিযোগ আনেননি, কোনো অসত্য প্রচার করেননি এবং সত্য কথাগুলো বলার সময়ও কুরুচিপূর্ণ ভাষা ব্যবহার করেননি। বরং আল্লাহ তাঁকে নির্দেশ দিয়েছিলেন, ‘তুমি তোমার রবের পথে হিকমত ও সুন্দর উপদেশের মাধ্যমে আহবান করো এবং সুন্দরতম পন্থায় তাদের সঙ্গে বিতর্ক করো। নিশ্চয়ই একমাত্র তোমার রবই জানেন কে তাঁর পথ থেকে ভ্রষ্ট হয়েছে এবং হেদায়েতপ্রাপ্তদের তিনি খুব ভালো করেই জানেন।’ (সূরা নাহল, আয়াত: ১২৫)। এই শিক্ষা আমাদের শেখায় যে, সত্যের পথে লড়াই করতে গিয়ে প্রতিপক্ষের সঙ্গে বিতর্ক করতে হলেও সেখানে শিষ্টাচার ও শালীনতা বজায় রাখা মুমিনের অনিবার্য বৈশিষ্ট্য।
বাস্তবে জিহাদ ফরজ হওয়ার মতো বিশেষ পরিস্থিতি না হলে, প্রতিপক্ষের প্রতি সর্বোত্তম ও ন্যায়সংগত আচরণ করাই ইসলামের বিধান। অনুমাননির্ভর কথা দিয়ে কাউকে আঘাত করা বা কারো সম্মানহানি করা মারাত্মক গুনাহ। এ বিষয়ে সতর্ক করে আল্লাহ তাআলা সূরা হুজুরাতের ১২ নম্বর আয়াতে বলেছেন, ‘হে মুমিনগণ, তোমরা অধিক অনুমান থেকে দূরে থাকো। নিশ্চয়ই কোনো কোনো অনুমান তো পাপ। আর তোমরা গোপন বিষয় অনুসন্ধান কোরো না এবং একে অপরের গিবত কোরো না। তোমাদের মধ্যে কি কেউ তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে পছন্দ করবে? তোমরা তো তা অপছন্দই করে থাকো। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ অধিক তাওবা কবুলকারী, অসীম দয়ালু।’
পরিশেষে বলা যায়, সত্যের পক্ষে লড়াই করতে গিয়ে এমন কোনো অনৈসলামিক পন্থা অবলম্বন করা যাবে না, যা একজন সত্যের সৈনিককে জালিমের কাতারে দাঁড় করিয়ে দেয়। সত্য বলার সাহস মুমিনের অলংকার, কিন্তু সেই সাহস যদি শিষ্টাচার, ইনসাফ ও কল্যাণকামিতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তবে তা মানুষকে সত্যের কাছাকাছি নয়, বরং সত্য থেকে আরও দূরে ঠেলে দিতে পারে। তাই একজন মুমিনের উচিত সর্বাবস্থায় মহান আল্লাহকে হাজির-নাজির রেখে প্রতিটি কাজ করা এবং সত্য ও ন্যায়ের পথে সর্বোচ্চ শালীনতা বজায় রাখা।











