মানবসভ্যতার ক্রমবিকাশের ইতিহাসে মানুষের নানাবিধ প্রয়োজন মেটাতে যুগে যুগে বিভিন্ন আইন, মতবাদ ও শাসনব্যবস্থার উদ্ভব হয়েছে। তবে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, মানুষের তৈরি প্রতিটি ব্যবস্থার মধ্যেই কোনো না কোনো সীমাবদ্ধতা, ব্যক্তিগত স্বার্থ, পক্ষপাতিত্ব এবং সময়ের সাথে পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা বিদ্যমান। এর মূল কারণ হলো, মানুষ সীমিত জ্ঞানের অধিকারী এবং তার চিন্তা ও সিদ্ধান্ত অনেক সময় আবেগ ও পরিবেশ দ্বারা প্রভাবিত হয়। পক্ষান্তরে, মহান আল্লাহর অবহীত বিধান ‘আল-কোরআন’ এমন এক পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, যা সরাসরি স্রষ্টার পক্ষ থেকে মানবজাতির হেদায়েতের জন্য নাজিল হয়েছে। ফলে এতে বিদ্যমান রয়েছে নিখুঁত পূর্ণতা, ভারসাম্য, চরম ন্যায়বিচার এবং সর্বযুগের জন্য প্রযোজ্য কার্যকর সমাধান। এই অনন্য বৈশিষ্ট্যের কারণেই কোরআনের বা ইসলামের আইন কেবল প্রাচীন বা মধ্যযুগীয় কোনো ধর্মীয় বিধান হিসেবে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি সর্বকালের জন্য সবচেয়ে আধুনিক, বাস্তবমুখী এবং মানবকল্যাণমূলক একটি আইনব্যবস্থা।
মহান আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে এই কিতাবটিকে মানবজাতির জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান হিসেবে ঘোষণা করেছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বিনকে পূর্ণ করলাম এবং তোমাদের ওপর আমার নিয়ামত সম্পূর্ণ করলাম এবং তোমাদের জন্য দ্বিন হিসেবে পছন্দ করলাম ইসলামকে।’ (সুরা আল-মায়িদা, আয়াত: ৩)। এই অমোঘ আয়াতটি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, ইসলামের বিধান কোনোভাবেই অসম্পূর্ণ বা অচল নয়; বরং এটি মানবজীবনের প্রতিটি স্তরের জন্য একটি চূড়ান্ত ও পূর্ণাঙ্গ নির্দেশনা। আধুনিক বিশ্বে মানুষ আজ যে ন্যায়বিচার, মানবাধিকার, অর্থনৈতিক ভারসাম্য, পারিবারিক স্থিতি এবং সামাজিক শান্তির জন্য নিরন্তর সংগ্রাম করছে, কোরআন দেড় হাজার বছর আগেই সেইসব বিষয়ের মৌলিক ও অকাট্য নীতিমালা নির্ধারণ করে দিয়েছে।
কোরআনের আইনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এটি মানুষের সহজাত প্রকৃতি ও মনস্তত্ত্বের সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ। বর্তমান আধুনিক সভ্যতা যখন পারিবারিক কাঠামোর চরম সংকট, নৈতিক অবক্ষয় এবং মানসিক অস্থিরতায় বিপর্যস্ত, তখন কোরআন ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজজীবনে সঠিক ভারসাম্যের শিক্ষা প্রদান করে। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ইনসাফ, সদাচার ও নিকটাত্মীয়দের দান করার আদেশ দেন এবং তিনি অশ্লীলতা, মন্দ কাজ ও সীমা লঙ্ঘন থেকে নিষেধ করেন। তিনি তোমাদেরকে উপদেশ দেন, যাতে তোমরা উপদেশ গ্রহণ করো।’ (সুরা আন-নাহল, আয়াত: ৯০)। এই একটি আয়াতেই মহান আল্লাহ ইসলামী সভ্যতার মৌলিক সাংবিধানিক নীতিগুলোর রূপরেখা বলে দিয়েছেন। এতে ন্যায়বিচার, মানবিকতা এবং সামাজিক ভারসাম্যের এমন এক সর্বজনীন শিক্ষা রয়েছে, যা কেবল মুসলিমদের জন্য নয়, বরং সমগ্র মানবজাতির জন্য সর্বকালের প্রযোজ্য। বর্তমান যুগের আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থাগুলো যে আদর্শিক লক্ষ্য অর্জনের আকাঙ্ক্ষা করে, তার মূল ভিত্তি এই আয়াতেই নিহিত রয়েছে।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও কোরআনের বিধান অত্যন্ত আধুনিক এবং মানবকল্যাণমুখী। বর্তমান বিশ্বের সুদভিত্তিক অর্থনীতি বৈশ্বিক বৈষম্যকে চরম পর্যায়ে নিয়ে গেছে, অনেক দেশ ও মানুষকে ঋণের অন্তহীন বোঝা ও আর্থিক অস্থিরতার মুখে ঠেলে দিয়েছে। অথচ কোরআন সুদকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করে ন্যায্য বণ্টন এবং মানবিক অর্থনীতির শিক্ষা দিয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।’ (সুরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ২৭৫)। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ইসলামী ব্যাংকিং এবং সুদমুক্ত অর্থব্যবস্থা একটি শক্তিশালী বিকল্প অর্থনৈতিক মডেল হিসেবে গুরুত্ব পাচ্ছে, যা কোরআনের আইনের আধুনিকতা ও কার্যকারিতার এক বাস্তব প্রমাণ। বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, গত এক দশকে ইসলামী অর্থনীতি শিল্প অত্যন্ত দ্রুত গতিতে সম্প্রসারিত হয়েছে এবং প্রতি বছর এর প্রবৃদ্ধির হার ১০-১২ শতাংশের কাছাকাছি ছিল, যা প্রমাণ করে যে মানুষ এখন ন্যায়সংগত অর্থনৈতিক ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকছে।
মানবাধিকারের ক্ষেত্রে কোরআন যে দিকনির্দেশনা দিয়েছে, তা সত্যিই যুগান্তকারী। জাতি, বর্ণ, ভাষা বা গোত্রের ভিত্তিতে শ্রেষ্ঠত্বের যে সংকীর্ণ ধারণা, ইসলাম তাকে সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করেছে। আল্লাহ বলেন, ‘হে মানুষ, আমি তোমাদের এক নারী ও এক পুরুষ থেকে সৃষ্টি করেছি আর তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা পরস্পর পরিচিত হতে পার। তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সেই অধিক মর্যাদাসম্পন্ন, যে তোমাদের মধ্যে অধিক তাকওয়াসম্পন্ন। নিশ্চয়ই আল্লাহ তো সর্বজ্ঞ, সম্যক অবহিত।’ (সুরা আল-হুজুরাত, আয়াত: ১৩)। সাম্যের এই বৈপ্লবিক ঘোষণা আধুনিক মানবাধিকার সনদের বহু আগে কোরআনে প্রদান করা হয়েছে। বিদায় হজের ঐতিহাসিক ভাষণে মহানবী (সা.) এই সাম্যের কথাটি আরও স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করে বলেছেন, ‘হে লোক সকল! শোনো, তোমাদের প্রতিপালক এক, তোমাদের পিতা এক। শোনো, আরবির ওপর অনারবির এবং অনারবির ওপর আরবির, কৃষ্ণকায়ের ওপর শ্বেতকায়ের এবং শ্বেতকায়ের ওপর কৃষ্ণকায়ের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা নেই। শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা আছে তো শুধু তাকওয়ার কারণেই।’ (মুসনাদে আহমাদ: ২৩৪৮৯, শুআবুল ঈমান, বাইহাকি: ৫১৩৭)।
কোরআনের আইন কেবল আধ্যাত্মিক সাধনার বিষয় নয়; বরং এটি একটি অত্যন্ত বাস্তবসম্মত ও কার্যকর জীবনব্যবস্থা। এতে ব্যক্তিগত ইবাদত থেকে শুরু করে রাষ্ট্রনীতি, বিচারব্যবস্থা, যুদ্ধনীতি, নারী অধিকার, উত্তরাধিকার আইন, ব্যবসা-বাণিজ্য, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং সামাজিক সম্পর্কের মতো প্রতিটি বিষয়ে বিস্তারিত নির্দেশনা রয়েছে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ ঘোষণা করেছেন, ‘আমি এ কিতাবে কোনো কিছুই অবহেলা করিনি।’ (সুরা আল-আনআম, আয়াত: ৩৮)। প্রথিতযশা তাফসিরবিদদের মতে, এই আয়াতে উল্লিখিত ‘কিতাব’-এর এক অর্থ হলো লওহে মাহফুজ এবং অন্য অর্থ হলো পবিত্র কোরআন, যেখানে দ্বিনের প্রতিটি সূক্ষ্ম বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছে। অতএব, যারা তাদের জীবন পরিচালনায় এই ঐশী পথের অনুসরণ করবে, তারাই প্রকৃত শান্তি ও সঠিক দিশা খুঁজে পাবে। পবিত্র কোরআনে আরও ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই এ কোরআন এমন একটি পথ দেখায়, যা সবচেয়ে সরল এবং যে মুমিনরা নেক আমল করে তাদেরকে সুসংবাদ দেয় যে তাদের জন্য রয়েছে মহাপুরস্কার।’ (সুরা বনি ইসরাঈল, আয়াত: ৯)।
মানব রচিত আইনের ঘনঘন পরিবর্তন, সামাজিক অস্থিরতা এবং নৈতিক সংকট এই সত্যটিই প্রমাণ করে যে, মানুষের তৈরি আইন চূড়ান্ত সমাধান দিতে সক্ষম নয়। কিন্তু কোরআনের মূলনীতি অপরিবর্তনীয় হলেও এর প্রয়োগের ক্ষেত্রে রয়েছে যুগোপযোগী বিস্তৃতি এবং ‘ইজতিহাদ’-এর সুযোগ। এ কারণেই ইসলাম চৌদ্দশ বছর আগের ধর্ম হয়েও আজকের আধুনিক বিশ্বে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক এবং আগামীতেও থাকবে। আগামী হাজার বছর পরও যদি পৃথিবী টিকে থাকে, কোরআনের আইন তখনো সর্বাধুনিক হিসেবে গণ্য হবে। এ জন্যই মহানবী (সা.) তাঁর সর্বযুগের উম্মতদের উদ্দেশ্যে বলে গেছেন, ‘আমি তোমাদের কাছে দুটি বস্তু ছেড়ে যাচ্ছি। তোমরা যতক্ষণ ওটাকে ধরে থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত পথভ্রষ্ট হবে না। ওটা হলো আল্লাহর কিতাব এবং তাঁর নবীর সুন্নত।’ (মুয়াত্তা মালিক, হাদিস: ১৬০২)।
পরিশেষে বলা যায়, কোরআনের আইন কোনো সেকেলে বা অচল ব্যবস্থা নয়; বরং এটি এমন এক চিরন্তন ও সর্বাধুনিক জীবনবিধান, যা মানুষের ইহকাল ও পরকাল—উভয় জীবনের পরম কল্যাণ নিশ্চিত করে। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি এবং মানবসভ্যতা যতই উন্নত হোক না কেন, মানুষের মৌলিক প্রকৃতি, ন্যায়বিচারের প্রয়োজনীয়তা এবং নৈতিকতার ভিত্তি কখনো পরিবর্তিত হয় না। আর কোরআনের আইন সেই চিরন্তন মানবিক সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত। তাই কোরআনের বিধানই প্রকৃত অর্থে সর্বকালের সর্বাধুনিক, সর্বজনীন ও কল্যাণময় আইন। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে পবিত্র কোরআন ও হাদিসকে আঁকড়ে ধরার এবং সেই অনুযায়ী জীবন গড়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।











