বর্তমান সময়ে দ্বীনি জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্রে হাদিসের গুরুত্ব অপরিসীম হলেও, অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, হাদিস বর্ণনার ক্ষেত্রে অবহেলা ও অসতর্কতা এক ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের যুগে কোনো কথা হাদিসের নামে সামনে এলেই তা যাচাই-বাছাই না করে গ্রহণ করার প্রবণতা বেড়ে গেছে। যথাযথ তাহকিক বা যাচাই ছাড়াই এসব বর্ণনা ছড়িয়ে দেওয়ার ফলে সমাজে বিভিন্ন প্রকার মুনকার, ভিত্তিহীন এবং জাল বর্ণনা ব্যাপকভাবে প্রচলিত হয়ে পড়ছে। মনে রাখা প্রয়োজন, পবিত্র কোরআনের পর হাদিস হলো ইসলামের দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎস এবং ওহিরই অংশ। তাই হাদিসের বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা এবং কঠোর যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে তা গ্রহণ ও বর্ণনা করা প্রতিটি মুমিনের জন্য আবশ্যক। এই গুরুতর বিষয়ে নিম্নোক্ত দিকগুলো গভীরভাবে অনুধাবন করা প্রয়োজন—
১. সঠিকভাবে হাদিস বর্ণনাকারীর জন্য নবীজির দোয়া ও শর্ত:
হাদিস বর্ণনার ক্ষেত্রে আমানতদারিতার গুরুত্ব বোঝাতে আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রা.)-এর একটি বর্ণনা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি বলেন, আমি মহানবী (সা.)-কে এই কথা বলতে শুনেছি যে, ‘আল্লাহ তাআলা ওই ব্যক্তিকে সজীব রাখুন, যে ব্যক্তি আমার থেকে কোনো হাদিস শুনেছে, এরপর তা সঠিকভাবে অনুধাবন করেছে, সংরক্ষণ করেছে এবং যথাযথভাবে অন্যের কাছে পৌঁছে দিয়েছে।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৬৫৮)। ইমাম মুসলিম (রহ.) এই বর্ণনার ব্যাখ্যায় বলেন, মহানবী (সা.) তাঁর হাদিস শ্রবণকারী ও প্রচারকারীর জন্য যখন দোয়া করেছেন, তখন সেখানে একটি বিশেষ শর্তারোপ করেছেন; আর তা হলো—বর্ণনাকারীকে হাদিসটি যথাযথভাবে হেফাজত করতে হবে এবং যেভাবে শুনেছে ঠিক সেভাবেই পৌঁছে দিতে হবে। সুতরাং, যে ব্যক্তি নিজস্ব ধারণাপ্রসূত বা অনুমানভিত্তিক বর্ণনা প্রদান করবে, সে রাসুল (সা.)-এর নির্ধারিত শর্তের পরিপন্থী হবে এবং রাসুল (সা.)-এর ওই বিশেষ দোয়ার বরকত থেকে বঞ্চিত হবে। (কিতাবুত তাময়িজ, পৃষ্ঠা : ৫৮-৫৯)।
২. কেবল নির্ভরযোগ্য হাদিস বর্ণনার বাধ্যবাধকতা:
ইসলামি শরিয়তে অনুমাননির্ভর হাদিস বর্ণনা করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কেবল তখনই কোনো হাদিস বর্ণনা করা জায়েজ হবে, যখন নিশ্চিতভাবে জানা যাবে যে সেটি নির্ভরযোগ্য কিতাবে বিশুদ্ধ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। এ প্রসঙ্গে রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘আমার পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে যা পৌঁছেছে তা অন্যকে পৌঁছে দাও, যদিও তা একটি মাত্র আয়াত হয়। এবং বনি ইসরাঈল থেকে বর্ণনা করতে কোনো অসুবিধা নেই। তবে যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে আমার নামে মিথ্যা কথা বলবে, সে যেন জাহান্নামকে তার স্থায়ী ঠিকানা বানিয়ে নেয়।’ (বুখারি, হাদিস : ৩৪৬১)। ইমাম ইবনে হিব্বান (রহ.) বলেন, মহানবী (সা.) উম্মতকে তাঁর কথা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার আদেশ দিয়েছেন এবং একইসাথে মিথ্যাবাদীর জন্য জাহান্নাম অবধারিত করেছেন। এর দ্বারা এটি প্রমাণিত হয় যে, তিনি কেবল সেই বিষয়গুলোই পৌঁছানোর আদেশ দিয়েছেন যা তাঁর থেকে প্রকৃতপক্ষে প্রমাণিত এবং বিশুদ্ধ। (কিতাবুল মাজরুহিন, ভূমিকা : ১/১৫)।
৩. জাল হাদিস বর্ণনা করার ভয়াবহ পরিণতি:
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নামে মিথ্যা কথা বলা বা জাল হাদিস প্রচার করা ইসলামে অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ এবং এটি কবিরা গুনাহর অন্তর্ভুক্ত। রাসুলুল্লাহ (সা.) কঠোর সতর্কবাণী দিয়ে বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমার ব্যাপারে এমন কথা বলবে, যা আমি বলিনি, সে যেন তার ঠিকানা জাহান্নামে বানিয়ে নেয়।’ (বুখারি, হাদিস : ১০৯)। এই সতর্কবাণীটি প্রমাণ করে যে, অজ্ঞতাবশত বা সওয়াবের আশায় কোনো জাল হাদিস প্রচার করাও কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
৪. হাদিস বর্ণনায় সাহাবায়ে কেরামের exemplary সতর্কতা:
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সরাসরি সাহচর্য পাওয়া সাহাবায়ে কেরাম হাদিস বর্ণনার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্ক ও আমানতদার ছিলেন। তাঁদের এই কঠোর সতর্কতা হাদিসের কিতাবসমূহে স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে। আবদুল্লাহ বিন জুবাইর (রা.) একবার তাঁর পিতা জুবাইর (রা.)-কে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘আমি আপনাকে রাসুলুল্লাহ (সা.) থেকে হাদিস বর্ণনা করতে দেখি না, যেমন অন্য অনেক সাহাবি বর্ণনা করেন?’ এর উত্তরে জুবাইর (রা.) বলেন, ‘আমি কখনো নবীজির সঙ্গ ত্যাগ করিনি। কিন্তু আমি তাঁকে স্পষ্টভাবে বলতে শুনেছি যে, যে ব্যক্তি আমার ওপর মিথ্যা আরোপ করবে, সে যেন তার ঠিকানা জাহান্নামে বানিয়ে নেয়।’ (বুখারি, হাদিস : ১০৭)। সাহাবায়ে কেরামের এই ভীতি ও সতর্কতা আমাদের জন্য এক বড় শিক্ষা যে, হাদিস বর্ণনায় সামান্যতম ভুল বা সন্দেহ থাকলেও তা এড়িয়ে চলাই শ্রেয়।
৫. যাচাই-বাছাই ছাড়া বর্ণনা করা মিথ্যার শামিল:
যেকোনো সংবাদ বা তথ্যের সত্যতা যাচাই করা কোরআনি নির্দেশ। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘এবং তুমি এমন জিনিসের পেছনে পোড়ো না, যার ব্যাপারে তোমার নিশ্চিত জ্ঞান নেই। জেনে রেখো, কান, চোখ ও অন্তর—এসব সম্পর্কে তোমাদের জিজ্ঞেস করা হবে।’ (সুরা বনি ইসরাঈল, আয়াত : ৩৬)। রাসুলুল্লাহ (সা.)-ও বলেছেন, ‘কোনো ব্যক্তি মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে যা-ই শুনে তা-ই বর্ণনা করে দেয়।’ (মুকাদ্দিমা সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৫)। উল্লিখিত আয়াত ও হাদিস থেকে স্পষ্ট হয় যে, কোনো কথা শোনা মাত্রই তা প্রচার করা যাবে না, এমনকি তা জাগতিক বিষয় হলেও। বর্ণনা করার আগে অবশ্যই যাচাই করতে হবে যে তথ্যটি সঠিক কি না এবং তা বর্ণনাযোগ্য কি না। যাচাই-বাছাই ছাড়া কথা বললে মানুষ মিথ্যাবাদী ও গুনাহগার সাব্যস্ত হয়। সাধারণ বিষয়ের ক্ষেত্রে যদি এমন কঠোর নিয়ম থাকে, তবে নবীজির হাদিসের ক্ষেত্রে সতর্কতা কতটুকু বেশি হওয়া উচিত তা সহজেই অনুমেয়। রাসুল (সা.)-এর হাদিস অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে তাহকিক করে বর্ণনা করতে হবে, অন্যথায় বর্ণনাকারী বড় অপরাধী হিসেবে গণ্য হবে। অসতর্কতার কারণে হাদিসের নামে মুনকার ও ভিত্তিহীন বিষয় ছড়িয়ে পড়লে তা গোটা উম্মতের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হবে।
৬. লোকমুখে প্রচলিত বর্ণনার মোহ ও বিপদ:
একটি দুঃখজনক বাস্তব সত্য হলো, আমাদের সমাজে প্রচুর পরিমাণে ‘মুনকার’, ‘ওয়াহি’ ও ভিত্তিহীন বর্ণনা প্রসিদ্ধ হয়ে গেছে। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে সহিহ হাদিস থাকা সত্ত্বেও মানুষ জাল হাদিস প্রচার করতে বেশি আগ্রহী হয়। এর প্রধান কারণ হলো, আমরা হাদিস বলাকে সহজ মনে করি, কিন্তু তার তাহকিক বা যাচাই-বাছাইকে গুরুত্ব দিই না। এটি হাদিস বর্ণনার মৌলিক নীতিমালার পরিপন্থী। অনেকে মনে করেন, কোনো কথা লোকমুখে প্রসিদ্ধ হয়ে গেলে তা প্রমাণিত হয়ে যায়। কিন্তু বাস্তব সত্য হলো, প্রসিদ্ধ হওয়া কখনোই প্রমাণিত হওয়ার সমার্থক নয়। একটি হাদিস অত্যন্ত জনপ্রিয় বা প্রসিদ্ধ হয়েও দুর্বল কিংবা ভিত্তিহীন হতে পারে। এমনকি এমন অনেক বর্ণনা প্রচলিত আছে যার কোনো সনদ বা সূত্রই নেই। সুতরাং, জনপ্রিয়তার মোহে না পড়ে প্রতিটি বর্ণনার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।
৭. ইসরাঈলি বর্ণনার ক্ষেত্রে সতর্কতা:
ইহুদি ও নাসারাদের থেকে বর্ণিত কাহিনী বা বর্ণনাগুলোকে ‘ইসরাঈলি বর্ণনা’ বলা হয়। এগুলোর কিছু বাইবেল বা তালমুদ থেকে, কিছু পূর্ববর্তী ব্যাখ্যাগ্রন্থ থেকে এবং কিছু তাদের মৌখিক রেওয়ায়েত থেকে এসেছে। ইসরাঈলি বর্ণনার ক্ষেত্রেও শরিয়তের মূলনীতি হলো—যাচাই-বাছাই করে বর্ণনা করা। যদি কোরআন, সহিহ হাদিস বা অন্য কোনো নির্ভরযোগ্য দলিল দ্বারা কোনো ইসরাঈলি বর্ণনার অসারতা প্রমাণিত হয়, তবে তা পরিহার করা বাধ্যতামূলক। একইভাবে, যা নির্ভরযোগ্যভাবে প্রমাণিত নয়, তা বলা থেকে বিরত থাকতে হবে। বিশেষ করে আকিদা (বিশ্বাস) এবং বিধি-বিধানের বিষয়ে ইসরাঈলি বর্ণনা কোনোভাবেই উল্লেখ করা যাবে না। কিন্তু বর্তমানে আমাদের সমাজে এ বিষয়ে চরম শিথিলতা দেখা যায়। অনেকে যাচাই-বাছাই ছাড়াই সত্য-মিথ্যা সব ধরনের ইসরাঈলি রেওয়ায়েত বর্ণনা করছেন, ফলে সমাজে অনেক উদ্ভট ও কোরআন-হাদিস বিরোধী কথা প্রসিদ্ধ হয়ে গেছে। অনেকে এগুলোকে সত্য এমনকি হাদিস হিসেবেই বিশ্বাস করেন। তাই ইসরাঈলিয়াতের ক্ষেত্রে পূর্ণ সচেতনতা প্রয়োজন। (আল-ইসরাঈলিয়্যাত ওয়াল মাওজুআত ফি কুতুবিত তাফসির : ৮, প্রচলিত জাল হাদিস : ১/১৬৫-১৭২)।
৮. দুর্বল হাদিসের সঠিক ব্যবহার ও সতর্কতা:
কিছু নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষে আমলের ফজিলত সম্বলিত দুর্বল (জইফ) হাদিস বর্ণনা করা জায়েজ। তবে শর্ত হলো, তা যেন ‘মুনকার’, ‘মাতরুহ’ বা অত্যধিক দুর্বল না হয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দুর্বল হাদিসকে দুর্বল হিসেবেই বর্ণনা করতে হবে; একে কখনোই সহিহ বা হাসান হাদিসের মতো উপস্থাপন করা যাবে না। কিন্তু বর্তমান সময়ে এই শর্তগুলোর প্রতি চরম অবহেলার কারণে দুর্বল হাদিস বর্ণনায় ব্যাপক বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে।
পরিশেষে বলা যায়, সর্বপ্রকার হাদিসের ব্যাপারে আমাদের পূর্ণ সচেতন ও সতর্ক থাকতে হবে। কোনো হাদিস বর্ণনা করার আগে অবশ্যই তাহকিক করে জানতে হবে যে সেটি বর্ণনাযোগ্য ও আমলযোগ্য কি না। যদি উলামায়ে কেরামের মধ্যে ওই হাদিসটি নিয়ে মতভেদ থাকে, তবে নির্ভরযোগ্য মতানুসারে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এই জটিল প্রক্রিয়ার সবচেয়ে নিরাপদ পথ হলো হাদিসশাস্ত্রে বিশেষজ্ঞ ও পারদর্শী আলেমদের শরণাপন্ন হওয়া এবং তাঁদের নির্দেশনায় দ্বীনি জ্ঞান প্রচার করা।










