দেশের স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোতে দীর্ঘকাল ধরে চলে আসা প্রকট জনবল সংকট নিরসনে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন এবং সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় উন্নত চিকিৎসা সেবা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য সামনে রেখে প্রায় এক লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের বড় ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অধীনে পরিচালিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ১৩ থেকে ১৬তম গ্রেডের শূন্য পদগুলোতে জরুরি ভিত্তিতে এই জনবল নিয়োগ দেওয়া হবে।

নিয়োগপ্রক্রিয়া দ্রুত গতিতে এগিয়ে নিতে এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. জালাল উদ্দিন মোহাম্মদ রুমীর সই করা একটি দাপ্তরিক চিঠির মাধ্যমে এই নির্দেশনা জারি করা হয়। উক্ত চিঠিটি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আওতাধীন সকল পরিচালক, সিভিল সার্জন, হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক এবং সংশ্লিষ্ট উপপরিচালক ও সহকারী পরিচালকদের কাছে পাঠানো হয়েছে, যাতে মাঠ পর্যায়ে নিয়োগ কার্যক্রম দ্রুত বাস্তবায়িত হয়।

প্রশাসনিক চিঠিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগে অনুষ্ঠিত মাসিক সমন্বয় সভার সিদ্ধান্ত এবং বর্তমান সরকারের নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে স্বাস্থ্য খাতের এই বিশাল জনবল ঘাটতি পূরণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ নির্দেশনার আলোকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই নিয়োগ কার্যক্রম সম্পন্ন করার জন্য সংশ্লিষ্ট সকল স্তরের কর্মকর্তাদের অনুরোধ জানানো হয়েছে।

স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়োগ প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও দ্রুত করতে চিঠিতে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। নির্দেশনাগুলো নিম্নরূপ—

প্রথমত, নন-মেডিকেল কর্মচারী নিয়োগ বিধিমালা-২০১৮ অনুযায়ী পদোন্নতির মাধ্যমে কিংবা সরাসরি নিয়োগের মাধ্যমে ১৩ থেকে ১৬তম গ্রেডের সকল শূন্য পদে জরুরি ভিত্তিতে জনবল নিয়োগের উদ্যোগ নিতে হবে।

দ্বিতীয়ত, বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের আগে (অর্থাৎ ১০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ পর্যন্ত) যেসব স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে শূন্য পদে জনবল নিয়োগের জন্য ইতিমধ্যে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে এবং আবেদন গ্রহণ করা হয়েছে, কিন্তু বিভিন্ন কারণে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি, সেসব ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। ওই প্রতিষ্ঠানগুলো বর্তমানের আরও শূন্য পদের ছাড়পত্র গ্রহণ করে নতুন বিজ্ঞপ্তি জারি করবেন এবং পূর্বের আবেদনের সঙ্গে সমন্বয় করে দ্রুত নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করবেন।

তৃতীয়ত, বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের আগের সময়সীমার মধ্যে (১০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ পর্যন্ত) যেসব স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ সংক্রান্ত কোনো আইনি জটিলতা বা প্রশাসনিক বাধা (যেমন মামলা বা দাপ্তরিক জটিলতা) রয়েছে, সেগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করার কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে, যাতে যোগ্য প্রার্থীরা নিয়োগ পান।

চতুর্থত, নন-মেডিকেল কর্মচারী নিয়োগ বিধিমালা-১৯৮৫ অনুযায়ী বিভাগীয় কার্যালয়সহ সিভিল সার্জনের নিয়ন্ত্রণাধীন বিভিন্ন স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে ১৩তম গ্রেডের প্রধান সহকারী পদ রয়েছে। তবে ২০১৮ সালের বিধিমালা অনুযায়ী এই পদগুলো ১৪তম গ্রেডে অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় পদোন্নতির ক্ষেত্রে কিছু জটিলতা তৈরি হয়েছে। এই সমস্যা সমাধানে ১৪তম গ্রেডে কর্মরত প্রধান সহকারী, উচ্চমান সহকারী বা সমমান পদধারীদের ১৩তম গ্রেডের শূন্য পদগুলোতে নিজ বেতনে অথবা চলতি দায়িত্বে পদায়নের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এবং কাজের অগ্রগতি তদারকি করতে চিঠিতে আরও বলা হয়েছে যে, প্রতিটি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের নিয়োগসংক্রান্ত সর্বশেষ তথ্যাদি একটি নির্ধারিত ছকে প্রতি মাসের ৫ তারিখের মধ্যে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রশাসন শাখায় পাঠাতে হবে। তথ্যের দ্রুত আদান-প্রদানের জন্য হার্ডকপির পাশাপাশি ই-মেইলের (hrm@ld.dghs.gov.bd) মাধ্যমে এই প্রতিবেদন পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সরকারের এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে স্বাস্থ্য খাতের সেবার মান যেমন বাড়বে, তেমনি মাঠ পর্যায়ে স্বাস্থ্যকর্মীদের দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান ঘটবে বলে আশা করা হচ্ছে।