সাবেক মন্ত্রী দীপু মনির স্বামীর শেষ বিদায় জানানোর এক করুণ দৃশ্য ফুটে উঠেছে রাজধানীর রাস্তায়। স্বামীর শেষকৃত্যে অংশ নিতে ১২ ঘণ্টার বিশেষ প্যারোলে মুক্তি পাওয়া আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক মন্ত্রী দীপু মনিকে প্রিজন ভ্যানে করে গুলশানের আজাদ মসজিদে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এক হৃদয়স্পর্শী কাকতালীয় বিষয় হলো, তার কয়েক মিনিট আগেই একটি ফ্রিজার ভ্যানে করে তার স্বামী তৌফীক নাওয়াজের মরদেহও একই পথে রওয়ানা হয়। বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) বেলা সোয়া ১২টার পর রাজধানীর রাস্তায় এই দৃশ্যটি পরিলক্ষিত হয়।

স্বামীর শেষ বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতায় অংশ নেওয়ার জন্য সকাল ৬টা ১৫ মিনিটে কঠোর পুলিশি পাহারায় মুন্সীগঞ্জ কারাগার থেকে প্রিজন ভ্যানে করে দীপু মনিকে ঢাকায় আনা হয়। সকাল সোয়া ৮টার দিকে তিনি কলাবাগানের নিজ বাসায় পৌঁছান। তার কিছুক্ষণ পরেই তৌফীক নাওয়াজের মরদেহ ওই বাসায় আনা হয় এবং বাড়ির নিচের গ্যারেজে ফ্রিজার ভ্যানে রাখা হয়। মরদেহের পাশেই ফ্লোরে কাপড় পেতে স্থানীয় বশির উদ্দিন রোড মসজিদের মুয়াজ্জিনসহ পাঁচজন কোরআন তেলাওয়াত করেন। পুরো সময়জুড়ে পুলিশ বাড়িটি ঘিরে সতর্ক অবস্থানে ছিল এবং বাড়িতে প্রবেশকারী প্রতিটি ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছিল।

এই শোকের মুহূর্তে দীপু মনিকে সান্ত্বনা দিতে চাঁদপুর আওয়ামী লীগের জাকিয়া সুলতানা শেফালীসহ আরও কয়েকজন কর্মী তার সঙ্গে দেখা করেন। জাকিয়া সুলতানা জানান, দীপু মনি মানসিকভাবে অত্যন্ত ভেঙে পড়েছেন। তিনি বলেন, ‘উনি ভালো নেই। এই কঠিন সময়ে তার মানসিক অবস্থা কেমন হতে পারে, তা সহজেই বোঝা যায়।’ এছাড়া চাঁদপুর থেকে আসা দীপু মনির এক আত্মীয় নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হয়ে জানান, দীপু মনি প্রচণ্ড বিপর্যস্ত এবং শোকাতুর অবস্থায় আছেন, এমনকি তিনি কিছু খেতেও চাইছেন না।

পারিবারিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, দুপুরে তৌফীক নাওয়াজের মরদেহ গুলশানের আজাদ মসজিদে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে বাদ জোহর জানাজা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। এরপর বনানী কবরস্থানে তাকে দাফন করা হবে। এই পুরো প্রক্রিয়ার নিরাপত্তা ও আইনি বিষয়ে কলাবাগান থানার ওসি মো. ফজলে আশিক জানান, জানাজার সময় দীপু মনি প্রিজন ভ্যানেই অবস্থান করবেন। তবে সময় অনুকূলে থাকলে দাফনের সময় তিনি কবরস্থানে থাকতে পারবেন, অন্যথায় তাকে দ্রুত কারাগারে ফিরিয়ে নেওয়া হবে। আজ সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত তিনি প্যারোলে মুক্তি পেয়েছেন।

উল্লেখ্য, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে বর্তমানে মুন্সীগঞ্জ কারাগারে আটক রয়েছেন সাবেক মন্ত্রী দীপু মনি। তার স্বামী ও সুপ্রিম কোর্টের প্রথিতযশা আইনজীবী তৌফীক নাওয়াজ গত মঙ্গলবার রাতে ঢাকার কন্টিনেন্টাল হাসপাতালে (সাবেক ইউনাইটেড হাসপাতাল) মৃত্যুবরণ করেন। ৭৬ বছর বয়সী তৌফীক নাওয়াজ দীর্ঘ সময় ধরে কিডনি ও লিভারের জটিল সমস্যায় ভুগছিলেন। পেশায় আইনজীবী হলেও তিনি ধ্রুপদী সংগীতের চর্চায় অত্যন্ত আগ্রহী ছিলেন। ২০১৯ সালে তিনি একবার স্ট্রোক করেছিলেন। সর্বশেষ গত ২৭ মে হুইল চেয়ারে করে কারাবন্দি স্ত্রীকে দেখতে স্বজনরা তাকে আদালতে নিয়ে গিয়েছিলেন। তৌফীক নাওয়াজের বন্ধু ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এমকে রহমান তাকে একজন অত্যন্ত সজ্জন মানুষ হিসেবে বর্ণনা করেছেন এবং জানান যে, ২০২০ সাল থেকেই তিনি বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত ছিলেন। দম্পতির এক ছেলে বর্তমানে চীনে অবস্থান করছেন এবং তাদের মেয়ে ঢাকায় থাকেন।