দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচন উপলক্ষ্যে জাতীয় সংসদের অধিবেশন কক্ষে এক বিশেষ পরিবেশের মধ্য দিয়ে ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) দুপুর দুইটায় জাতীয় সংসদ ভবনের নির্ধারিত অধিবেশন কক্ষে এই গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন শুরু হয়। এই ঐতিহাসিক ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ, ভারপ্রাপ্ত স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তাঁদের পাশাপাশি বিএনপির মনোনীত রাষ্ট্রপতি প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানও তাদের মূল্যবান ভোট প্রদান করেছেন। রাষ্ট্রপতি পদের দ্বিতীয় প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী হিসেবে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের অলি আহমদ লড়াই করছেন।
মোট ৩৪৯ জন সংসদ সদস্য এই নির্বাচনে ভোটার হিসেবে অংশগ্রহণ করেন। পুরো নির্বাচনী প্রক্রিয়ার তত্ত্বাবধানে এবং নির্বাচনী কর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন। দুপুর দুইটায় শুরু হওয়া এই ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্নভাবে চলে। ভোটগ্রহণ শুরু হওয়ার আগে প্রধান নির্বাচন কমিশনার একটি বিশেষ বৈঠকের আয়োজন করেন, যেখানে তিনি সংসদ সদস্যদের সামনে ভোটদানের বিস্তারিত নিয়মাবলি ও বিধিমালা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেন। এই বিশেষ বৈঠকে বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং মন্ত্রিসভার উচ্চপদস্থ সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। সিইসি তাঁর বক্তব্যে রাষ্ট্রপতি পদের দুই প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী এবং তাঁদের প্রস্তাবক ও সমর্থকদের নাম আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেন। এরপর ব্যালট পেপার গ্রহণ থেকে শুরু করে তা যথাযথভাবে ব্যালট বাক্সে জমা দেওয়ার সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি তিনি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন।
যেহেতু সংসদের নিয়মিত অধিবেশন চলমান ছিল না, তাই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের এই বিশেষ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সংসদ সদস্যদের নিয়ে বিশেষ বৈঠকের আহ্বান জানানো হয়েছিল। নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী, সংসদ সদস্যরা তাঁদের নিজ নিজ আসনে বসে ভোট প্রদান করেন। ভোটদানের প্রক্রিয়াটি ছিল অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট; প্রথমে ব্যালট পেপারের মুড়ি অংশে সদস্যকে তাঁর পূর্ণ নাম লিখে স্বাক্ষর করতে হয় এবং এরপর মূল ব্যালটে পছন্দের প্রার্থীর নামের পাশে নির্ধারিত স্থানে পুনরায় পূর্ণ নাম লিখে স্বাক্ষর করতে হয়। সবশেষে যথাযথভাবে ভাঁজ করে ব্যালট পেপারটি নির্ধারিত ব্যালট বাক্সে জমা দিতে হয়।
নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বিশেষ দিক ছিল যে, রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনরত স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ এবং ভারপ্রাপ্ত স্পিকার কায়সার কামালও সংসদ সদস্য হিসেবে ভোটার ছিলেন। তাঁদের জন্য সংসদ কক্ষে পৃথক ও বিশেষ আসনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। অন্যদিকে, বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সংসদ সদস্য হওয়ায় ভোট দেওয়ার সুযোগ পেলেও, তিনি যদি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন, তবে দায়িত্ব গ্রহণের দিন তাঁর সংসদীয় আসনটি শূন্য হবে। তবে জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের প্রার্থী অলি আহমদ সংসদ সদস্য না হওয়ায় এই নির্বাচনে তাঁর ভোট দেওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এই নির্বাচনটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ১৯৯১ সালে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের পর ওই বছর প্রথমবারের মতো রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। তবে তার পরবর্তী দীর্ঘ সময়ে সাতজন রাষ্ট্রপতি কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়াই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন। গত তিন দশক ধরে জাতীয় সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের মনোনীত প্রার্থীরাই এককভাবে এই সর্বোচ্চ পদে আসীন হয়ে আসছিলেন। কিন্তু এবার জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট আলাদা প্রার্থী ঘোষণা করায় দীর্ঘদিনের সেই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার সংস্কৃতি ভেঙে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতার এক নতুন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।
‘রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন, ১৯৯১’ এবং সংবিধানের ৫০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী এই পুরো নির্বাচন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার নির্বাচনী কর্তা হিসেবে সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি তদারকি করেছেন। সংবিধান অনুযায়ী, বিজয়ী রাষ্ট্রপতি ৫ বছরের মেয়াদে দায়িত্ব পালন করবেন। ভোট গণনা শেষে সর্বোচ্চ ভোটপ্রাপ্ত প্রার্থীকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিজয়ী ঘোষণা করা হবে।









