আরিফুল হক আরিফ

কামরুজ্জামান সিকদারের স্বপ্ন: গ্রাম থেকে বিশ্বমঞ্চে নেতৃত্ব দেবে গোপালগঞ্জের ছেলেরা

​একটি জাতির ভবিষ্যৎ কেবল নীতি নির্ধারণের টেবিলে তৈরি হয় না; তার বড় একটি অংশ তৈরি হয় মাঠে, তারুণ্যের ঘামে, গল্পে এবং সংগ্রামে। যে সমাজ তার যুবসমাজকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে পারে, সেই সমাজই ভবিষ্যতের ভিত শক্ত করতে পারে। আর যে সমাজ তার তরুণদের মাদক, অপরাধ, হতাশা ও সামাজিক অবক্ষয়ের দিকে হারিয়ে যেতে দেয়, তার মূল্য দিতে হয় পুরো প্রজন্মকে।

​এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে গোপালগঞ্জের ক্রীড়াঙ্গনে ভিন্নধর্মী একটি উদ্যোগ নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে জে কে পরিবার। জে কে পলিমার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং মনোয়ারা জালালউদ্দিন ফাউন্ডেশনের প্রেসিডেন্ট কামরুজ্জামান সিকদার কামালের উদ্যোগ ও পৃষ্ঠপোষকতায় ২০২৩ সালে যাত্রা শুরু করে 'জে কে ফাইটার্স'।

​তবে এটি কেবল একটি ক্রীড়া দল বা সংগঠনের নাম নয়। সংশ্লিষ্টদের কাছে এটি তরুণদের মাঠমুখী করা, তাদের মধ্যে শৃঙ্খলা ও নেতৃত্বের গুণ তৈরি করা এবং মাদক ও অপরাধ থেকে দূরে রাখার একটি সামাজিক প্রয়াস।

​মাঠে খেলা, জীবনে শৃঙ্খলা

জে কে ফাইটার্সের কার্যক্রমের অন্যতম লক্ষ্য হলো গ্রাম পর্যায়ে থেকে তরুণদের খেলাধুলার সঙ্গে সম্পৃক্ত করা। কারণ একটি তরুণ যখন মাঠে থাকে, তখন সে শুধু একটি খেলা শেখে না; সে শেখে নিয়ম মেনে চলা, পরিশ্রম করা, প্রতিপক্ষকে সম্মান করা, দলগতভাবে কাজ করা এবং পরাজয় থেকে শিক্ষা নিয়ে আবার ঘুরে দাঁড়ানো।

​কামরুজ্জামান সিকদার কামালের বিশ্বাস, যুবসমাজকে সঠিক পথে রাখতে হলে তাদের সামনে ইতিবাচক বিকল্প তৈরি করতে হবে। বই, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও খেলাধুলার সঙ্গে তরুণদের যুক্ত করা গেলে মাদক, কিশোর অপরাধ ও নানা সামাজিক অনাচারের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। তিনি মনে করেন, ‘যুবসমাজকে বাঁচানো মানে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশকে বাঁচানো।’

​মাদকের বিরুদ্ধে মাঠকে হাতিয়ার

বর্তমান সময়ে মাদকাসক্তি ও কিশোর অপরাধ নিয়ে পরিবার ও সমাজে উদ্বেগ রয়েছে। এর বিরুদ্ধে শুধু আইন প্রয়োগ করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না; প্রয়োজন প্রতিরোধমূলক সামাজিক উদ্যোগ।

​সেই জায়গায় খেলাধুলাকে একটি কার্যকর মাধ্যম হিসেবে দেখছেন জে কে পরিবারের কর্ণধাররা।

​কামরুজ্জামান সিকদার কামাল বলেন, “সমাজ আমাদের সবার। আমরা যদি আমাদের তরুণদের মাঠে রাখতে পারি, বইয়ের সঙ্গে রাখতে পারি, ভালো কাজের সঙ্গে রাখতে পারি, তাহলে তারা নিজেদের ভবিষ্যৎ যেমন গড়বে, তেমনি সমাজকেও এগিয়ে নেবে। তার তারুণ্য অনুযায়ী যুবসমাজের পাশে দাঁড়ানো আমাদের সবার দায়িত্ব।”

​তার এই বক্তব্যের মূল বার্তা— তরুণদের শুধু সমস্যার অংশ হিসেবে দেখলে হবে না; তাদের সম্ভাবনার জায়গাটিও দেখতে হবে।

​খেলোয়াড়দের চোখে পৃষ্ঠপোষকতার গুরুত্ব

জে কে পলিমার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের পৃষ্ঠপোষকতায় ক্রীড়া কার্যক্রমে অংশ নেওয়া খেলোয়াড়দের সঙ্গে কথা বললে উঠে আসে পৃষ্ঠপোষকতার গুরুত্বের কথা।

​একজন খেলোয়াড় বলেন, “আমাদের মতো গ্রামের ছেলেদের জন্য নিয়মিত খেলার সুযোগ পাওয়া অনেক বড় বিষয়। কেউ পাশে দাঁড়ালে আত্মবিশ্বাস বাড়ে। আমরা আরও ভালো করার চেষ্টা করি।”

​আরেক খেলোয়াড় বলেন, “খেলাধুলার মাধ্যমে আমরা অনেক কিছু শিখছি। শুধু মাঠের খেলা নয়, সময়ের মূল্য, দলবদ্ধভাবে কাজ করা এবং নিয়ম মেনে চলার শিক্ষাও পাচ্ছি।”

​খেলোয়াড়দের এসব বক্তব্য থেকে স্পষ্ট— একজন পৃষ্ঠপোষক যখন সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়, তখন শুধু একটি দলকে এগিয়ে নেয় না, বরং তরুণদের স্বপ্ন দেখার সাহসও দেয়।

​অভিভাবকদের প্রত্যাশা

অভিভাবকরাও এমন উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, সন্তানদের ভালো পরিবেশে ব্যস্ত রাখা গেলে তারা বিপথে যাওয়ার ঝুঁকি থেকে দূরে থাকে।

​একজন অভিভাবক বলেন, “সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে— এটা নিয়ে বাবা-মায়ের সবসময় চিন্তা থাকে। খেলাধুলায় ব্যস্ত থাকলে তাদের সময়টা ভালো কাজে ব্যয় হয়। তাই এ ধরনের উদ্যোগ আরও বাড়ানো দরকার।”

​আরেক অভিভাবক বলেন, “শুধু সরকারের ওপর দায়িত্ব দিয়ে বসে থাকলে হবে না। সমাজের বিত্তবান ও সক্ষম ব্যক্তিদেরও এগিয়ে আসতে হবে। একটি তরুণকে সঠিক পথে রাখতে পারা মানে একটি পরিবারকে নিরাপদ রাখা।”

​ক্রীড়া সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা

স্থানীয় ক্রীড়া সংশ্লিষ্টদের মতে, গোপালগঞ্জে প্রতিভার অভাব নেই; অভাব রয়েছে অনেক ক্ষেত্রে সুযোগ ও ধারাবাহিক পৃষ্ঠপোষকতার।

​একজন ক্রীড়া সংগঠকের ভাষায়, “একটি টুর্নামেন্ট হয়তো কয়েক দিনের। কিন্তু সেই টুর্নামেন্ট যে তরুণটি মাঠে আসে, তার জীবনে তৈরি হওয়া আত্মবিশ্বাস অনেক বছর স্থায়ী হতে পারে। তাই ক্রীড়ায় পৃষ্ঠপোষকতা আসলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর বিনিয়োগ।”

​তাদের মতে, জে কে পরিবারের মতো প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিরা যদি দীর্ঘমেয়াদে তরুণদের পাশে থাকে, তাহলে গোপালগঞ্জে ক্রীড়াঙ্গনে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে।

​গ্রাম থেকে বিশ্বমঞ্চে

জে কে পরিবারের স্বপ্ন অবশ্য শুধু স্থানীয় পর্যায়ে খেলোয়াড় তৈরি করা নয়। তাদের প্রত্যাশা, গ্রাম পর্যায় থেকে প্রতিভা খুঁজে বের করে সঠিক প্রশিক্ষণ, সহযোগিতা ও পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে একদিন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তাদের প্রতিষ্ঠিত করা।

​কামরুজ্জামান সিকদার কামাল বিশ্বাস করেন, আজ যে কিশোর গ্রামের মাঠে সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যে খেলছে, আগামী দিনে সেই তরুণই দেশের জার্সি গায়ে বিশ্বমঞ্চে দাঁড়াতে পারে।

​আজকের সেই ছোট্ট মাঠই হতে পারে আগামী দিনের বড় স্বপ্নের সূতিকাগার।

​জে কে পলিমার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কামরুজ্জামান সিকদারের প্রত্যাশা— গোপালগঞ্জের কোনো প্রত্যন্ত গ্রামের মাঠ থেকে উঠে আসা একজন তরুণ একদিন বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। তার হাত ধরে বিশ্বমঞ্চে উড়বে লাল-সবুজের পতাকা।

​এই প্রত্যাশায় গ্রাম পর্যায় থেকে ক্রীড়া প্রতিভা বিকাশে কাজ করে যাচ্ছে জে কে পরিবার। তাদের লক্ষ্য শুধু খেলোয়াড় তৈরি নয়; বরং সুস্থবান, শৃঙ্খলাবদ্ধ, মাদকমুক্ত ও দেশপ্রেমিক একটি প্রজন্ম তৈরি করা।

​পৃষ্ঠপোষকতার আহ্বান

এই উদ্যোগকে আরও বিস্তৃত করতে সমাজের সামর্থ্যবান মানুষ, ব্যবসায়ী, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, সাবেক খেলোয়াড়, ক্রীড়া সংগঠক ও প্রবাসীদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানাচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।

​কারণ একটি ফুটবল, একটি জার্সি, একটি মাঠ, একজন ট্রেইনার কিংবা একটি টুর্নামেন্ট— কখনো কখনো একজন তরুণের জীবনের গতিপথ বদলে দিতে পারে।

​একটি দলকে সহযোগিতা করা মানে শুধু একটি ম্যাচ জেতার সুযোগ তৈরি করা নয়; বরং একজন তরুণকে স্বপ্ন দেখার সুযোগ দেওয়া।

​এটা শুধু জে কে পরিবারের গল্প নয়— এটি শুধু একটি ক্রীড়া সংগঠনের গল্প নয়। এটি একটি সামাজিক দায়িত্বশীলতার প্রশ্নও— আমরা আমাদের নতুন প্রজন্মের জন্য কী করছি?

​মাদকমুক্ত সমাজ চাইলে তরুণদের ইতিবাচক বিকল্প দিতে হবে। কিশোর অপরাধ কমাতে চাইলে তাদের সময়, প্রতিভা ও শক্তিকে ভালো কাজে যুক্ত করতে হবে। সমাজকে অপরাধ মুক্ত করতে হলে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ক্রীড়া সংগঠন ও সমাজের দায়িত্বশীল মানুষদের একসাথে কাজ করতে হবে।

​কামরুজ্জামান সিকদার কামালের উদ্যোগ সেই সম্মিলিত দায়িত্ববোধেরই একটি উদাহরণ হতে পারে।

​একজন মানুষ একা সমাজ বদলে দিতে পারেন না। কিন্তু একজন মানুষ যদি উদ্যোগ নেন এবং অন্যরা সেই উদ্যোগের পাশে দাঁড়ান, তাহলে ছোট একটি উদ্যোগই একসময় বড় সামাজিক আন্দোলনে পরিণত হতে পারে।

​জে কে পলিমার সেই স্বপ্নের একটি মঞ্চ।

​আজ প্রয়োজন এই মঞ্চকে আরও শক্তিশালী করা। প্রয়োজন আরও বেশি তরুণকে মাঠে নিয়ে আসা। প্রয়োজন গ্রাম থেকে প্রতিভা তুলে আনা। প্রয়োজন তাদের স্বপ্ন দেখানো— একদিন তারাই বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা বিশ্বমঞ্চে ওড়াবে।

​মাদক নয়— মাঠ হোক তরুণদের ঠিকানা। অপরাধ নয়— স্বপ্ন হোক তাদের পরিচয়। আর গ্রাম থেকে উঠে আসা প্রতিটি প্রতিভা একদিন বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করুক— এই প্রত্যাশাতেই কাজ করে যাচ্ছে জে কে পলিমার পরিবার।