দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে বন্ধ থাকার পর মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য পুনরায় উন্মুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এই ইতিবাচক পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। তবে শ্রমবাজার উন্মুক্ত হওয়ার আনন্দের পাশাপাশি মালয়েশিয়া কর্তৃক ২৫টি বাংলাদেশি রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকা প্রকাশের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে দলটি। এনসিপির দাবি, অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়ে নতুন করে কোনো সিন্ডিকেট গড়ে ওঠার সুযোগ কোনোভাবেই দেওয়া যাবে না।
এনসিপির মুখপাত্র এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও ডায়াস্পোরা বিষয়ক উপ-কমিটির প্রধান আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোকপাত করেন। তিনি জানান, মালয়েশিয়ার বিদেশি কর্মী নিয়োগ প্ল্যাটফর্ম এফডব্লিউসিএমএস (FWCMS) সম্প্রতি ২৫টি বাংলাদেশি রিক্রুটিং এজেন্সির একটি তালিকা প্রকাশ করেছে। তবে অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় হলো, কোন প্রক্রিয়া, মানদণ্ড কিংবা নির্দিষ্ট কোন ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে এই স্বল্পসংখ্যক এজেন্সি নির্বাচন করা হয়েছে, তা এখনো পর্যন্ত স্পষ্ট করা হয়নি। বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয় যে, এর আগে বাংলাদেশ সরকার মালয়েশিয়ার নির্ধারিত যাবতীয় শর্ত পূরণকারী মোট ৪২৩টি রিক্রুটিং এজেন্সির একটি তালিকা দেশটির কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠিয়েছিল। সেই দীর্ঘ তালিকা থেকে মাত্র ২৫টি এজেন্সিকে চূড়ান্তভাবে নির্বাচনের পেছনে প্রকৃত কারণ ও ভিত্তি বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে জনসম্মুখে পরিষ্কার করা জরুরি বলে মনে করে এনসিপি।
জাতীয় নাগরিক পার্টি মনে করিয়ে দিয়েছে যে, অতীতে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মী প্রেরণের ক্ষেত্রে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ব্যাপক অনিয়ম ও অশুভ কারসাজির ইতিহাস রয়েছে। বিশেষ করে দালাল চক্র ও প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কর্মীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অসংখ্য অভিযোগ সামনে এসেছে। সরকারিভাবে নির্ধারিত অভিবাসন ব্যয় ছিল মাত্র ৭৯ হাজার টাকা, কিন্তু বাস্তবে একজন কর্মীর কাছ থেকে প্রায় সাড়ে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এর ফলে বিদেশে গিয়ে ভাগ্য বদলানোর আশায় অনেক সাধারণ মানুষ তাদের ভিটেমাটি বা জমি-জমা বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন। অনেকে সহায়-সম্বল শেষ করে কিংবা উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে বিপুল অর্থের বোঝা কাঁধে নিয়ে বিদেশে গিয়েছেন, যা তাদের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে।
এনসিপির আশঙ্কা, যদি নতুন করে সীমিতসংখ্যক এজেন্সিকে কেন্দ্র করে পুনরায় একই ধরনের একচেটিয়া ব্যবস্থা তৈরি হয়, তবে এর সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হবেন সাধারণ কর্মপ্রত্যাশীরা। বিদেশগামী কর্মীদের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে অসাধু চক্র যেন আবারও অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের সুযোগ না পায়, সেজন্য নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা, সুস্থ প্রতিযোগিতা এবং কঠোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে দলটি।
আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া তার বিবৃতিতে বলেন, “মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় উন্মুক্ত হওয়া বাংলাদেশের হাজার হাজার কর্মপ্রত্যাশী মানুষের জন্য একটি বিশাল সুযোগ। আমরা কোনোভাবেই চাই না যে, অতীতের সেই কুখ্যাত সিন্ডিকেট ভেঙে নতুন কোনো নামে বা নতুন রূপে কোনো সিন্ডিকেট তৈরি হোক। একজন বাংলাদেশি কর্মী বিদেশে যাওয়ার জন্য যখন তার জমি বিক্রি করেন বা ঋণ নেন, তখন সেই কষ্টার্জিত অর্থ যেন কোনো সিন্ডিকেটের পকেটে না যায়—সরকারকে সেই দৃঢ় নিশ্চয়তা দিতে হবে।”
এনসিপি আরও মনে করে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক প্রভাব এবং ক্ষমতাসীনদের ঘনিষ্ঠতার ভিত্তিতে রিক্রুটিং এজেন্সি বাছাই এবং সিন্ডিকেট গড়ে ওঠার যে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে, সেগুলোর যথাযথ ও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। অনিয়ম এবং অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি এই একই চক্র যেন নতুন কোনো কাঠামোতে ফিরে আসতে না পারে, সেটি নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব।
একই সঙ্গে ২০২৪ সালে যাবতীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেও মালয়েশিয়ায় যেতে না পারা কর্মীদের দুর্দশার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে এনসিপি জানায়, তাদের বিষয়টি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সমাধান করতে হবে। বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের মাধ্যমে কর্মী নিয়োগের সঠিক সংখ্যা, স্বচ্ছ পদ্ধতি, সহনীয় অভিবাসন ব্যয় এবং অন্যান্য শর্তাবলী চূড়ান্ত করে তা দ্রুত জনসম্মুখে প্রকাশের আহ্বান জানানো হয়েছে।
পরিশেষে এনসিপি গুরুত্ব দিয়ে বলেছে, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার কোনো নির্দিষ্ট কয়েকটি এজেন্সির একচেটিয়া ব্যবসার ক্ষেত্র হতে পারে না। যোগ্য ও বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সির জন্য ন্যায্য সুযোগ, কর্মীদের জন্য সাশ্রয়ী অভিবাসন ব্যয় এবং পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়ায় পূর্ণ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশের কর্মীদের রক্ত জল করা কষ্টার্জিত অর্থ যেন কোনোভাবেই নতুন কোনো সিন্ডিকেটের মুনাফার উৎস না হয়, সেদিকে সর্বোচ্চ নজর দেওয়ার দাবি জানিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি।















