কাফরুল থানা যুবদলের সদস্য সচিব হাফিজুল ইসলাম বাবুকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য প্রথম যে পরিকল্পনা করা হয়েছিল, তা কোনো এক কারণে সফল হয়নি। তবে পরাজয় মেনে না নিয়ে এবং প্রতিহিংসার তাড়নায় কয়েক দিনের ব্যবধানে নতুন করে পেশাদার ভাড়াটে খুনি এনে দ্বিতীয়বার একটি ‘কিলিং মিশন’ পরিচালনা করা হয়। ভাগ্যের পরিহাসে সেই দ্বিতীয় দফার পরিকল্পনাতে মূল লক্ষ্যবস্তু বেঁচে গেলেও, রক্তক্ষয়ী সংঘাতের শিকার হন যুবদল কর্মী ইউসুফ আলী। তার গুলিতে প্রাণ হারান তিনি এবং আহত হন আরও দুই পথচারী। কাফরুলে ভাড়াটে কিলারদের গুলিতে যুবদল কর্মী ইউসুফ নিহত হওয়ার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রাথমিক তদন্তে এই চাঞ্চল্যকর সব তথ্য সামনে এসেছে।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট উচ্চপরয়ের সূত্রগুলো থেকে জানা গেছে যে, গত ৬ জুলাই একটি গ্যারেজে হাফিজুল ইসলাম বাবুকে হত্যার চূড়ান্ত ছক সাজানো হয়েছিল। তবে সেদিন পরিস্থিতি অনুকূলে না থাকায় হামলাকারীরা তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে ব্যর্থ হয়। কিন্তু তারা দমে যাননি; বরং আরও নিখুঁতভাবে দ্বিতীয়বার হামলার প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন।

সূত্রগুলোর দাবি অনুযায়ী, গত ২৩ জুলাই মাগুরা ও ঝিনাইদহ জেলা থেকে চারজন পেশাদার শুটারকে বিশেষ পরিকল্পনার মাধ্যমে ঢাকায় আনা হয়। তাদের অত্যন্ত গোপনে মিরপুর-১০ এলাকার একটি আবাসিক হোটেলে রাখা হয়। সেখানেই হামলার সঠিক স্থান, সময় এবং কৌশল চূড়ান্ত করা হয়। তদন্তে আরও উঠে এসেছে যে, এই পুরো ষড়যন্ত্রের নেপথ্যে ছিলেন কাফরুল থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক হাফিজুর রহমান হাফিজ। তার পক্ষ থেকেই শুটারদের হাতে তিনটি আগ্নেয়াস্ত্র পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল।

পরদিন ২৪ জুলাই সন্ধ্যা থেকে শুটাররা লক্ষ্যবস্তু হাফিজুল ইসলাম বাবুর গতিবিধি নিবিড়ভাবে অনুসরণ করতে শুরু করেন। একপর্যায়ে মিরপুর-১৩ এলাকার ওপেক্স গার্মেন্টসের সামনে তাদের অবস্থান সন্দেহজনক মনে হলে স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি তাদের পরিচয় জানতে এগিয়ে যান। ঠিক সেই মুহূর্তে যুবদল কর্মী ইউসুফ আলী সন্দেহভাজন একজনকে জাপটে ধরলে, ওই হামলাকারী দ্রুত কোমর থেকে পিস্তল বের করে খুব কাছ থেকে গুলি চালায়। এতে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান ইউসুফ। হামলাকারীরা পালিয়ে যাওয়ার সময় এলোপাথাড়ি গুলি ছুড়ে সবজি বিক্রেতা নালাম সরদার ও পথচারী মনির হোসেনকে আহত করে।

ঘটনার পরপরই স্থানীয় বাসিন্দারা অস্ত্রসহ চঞ্চল মোল্লাকে ধরে পুলিশের হাতে সোপর্দ করেন। পরবর্তীতে ডিবি এবং থানা পুলিশের পৃথক ও বিশেষ অভিযানে জিহাদ, জিয়াউল হক মোল্লা জিয়া, মাসুম বিল্লাহ এবং সহযোগী হিসেবে নাহিদ হাসান ওরফে মেহেদী হাসান ও মো. শাফিন ছৈয়ালকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে চঞ্চল বর্তমানে রিমান্ডে রয়েছেন।

গোয়েন্দা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, এই হত্যাকাণ্ডের মূলে ছিল চরম আধিপত্য লড়াই। ভবন নির্মাণকাজ, ফুটপাতকেন্দ্রিক চাঁদাবাজির অর্থ বণ্টন এবং স্থানীয় এলাকায় প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে হাফিজুর রহমান হাফিজ ও হাফিজুল ইসলাম বাবুর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে তীব্র বিরোধ চলছিল। তদন্তকারীদের মতে, এখানে রাজনৈতিক আদর্শের চেয়ে স্থানীয় অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং ক্ষমতার দ্বন্দ্বই বেশি প্রকট হয়ে উঠেছে।

তদন্তে আরও একটি চমকপ্রদ তথ্য পাওয়া গেছে। শুটাররা যখন হোটেলে ওঠেন, তখন তারা চাকরিপ্রার্থীর পরিচয় দিয়ে তিনটি জাতীয় পরিচয়পত্র জমা দিয়েছিলেন। তবে পরে হোটেল কর্তৃপক্ষের সন্দেহ হয় যে, পরিচয়পত্রগুলো ভুয়া হতে পারে। এই বিষয়ে ডিবি পুলিশ হোটেলের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে বিস্তারিত বিশ্লেষণ করছে।

তদন্ত কর্মকর্তাদের মতে, প্রধান অভিযুক্ত হাফিজুর রহমান হাফিজ এখনো পলাতক। তাকে গ্রেপ্তার করতে পারলে এই হত্যাকাণ্ডে অন্য কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তির সম্পৃক্ততা ছিল কি না, তা স্পষ্টভাবে জানা যাবে। এই ঘটনায় হত্যা এবং অস্ত্র আইনে পৃথক দুটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। হত্যা মামলার তদন্তভার দেওয়া হয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশকে এবং অস্ত্র আইনের মামলাটি তদন্ত করছে কাফরুল থানা পুলিশ। কাফরুল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, মামলার তদন্ত দ্রুত গতিতে চলছে এবং বাকি আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।