ফেসবুকে পরিচয়, তারপর প্রেম। আর সেই প্রেমের পরিণতিতে বছর দুয়েক আগে বিয়ের পিঁড়িতে বসেন মাত্র ১১ বছরের এক কিশোরী অনামিকা আক্তার জুঁই এবং ২০ বছরের যুবক শাকিল ওরফে শাকিব মিয়া। অল্প বয়সেই কোলজুড়ে আসে এক পুত্রসন্তান। কিন্তু সুখের সেই সংসার খুব দ্রুতই তিক্ততায় রূপ নেয়। অভিযোগ উঠেছে, স্বামী ও শাশুড়ি মিলে জুঁইয়ের কোল থেকে তার সাত মাসের সন্তানকে কেড়ে নেন এবং তাকে ঘর থেকে বের করে দেন। অবশেষে দীর্ঘ লড়াই ও আদালতের শরণাপন্ন হওয়ার পর ১৩ বছর বয়সী এই কিশোরী মা তার সন্তানকে ফিরে পেয়েছেন।

গত মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) ঢাকার চিফ লিগ্যাল এইডের বিচারক মো. সায়েম খান এক ঐতিহাসিক ও মানবিক আদেশে শিশুটিকে তার জন্মদাত্রী মায়ের কাছে রাখার নির্দেশ দেন। এই আদেশের ফলে দীর্ঘ আড়াই মাস পর তার সন্তানকে পুনরায় কোলে ফিরে পেয়েছেন জুঁই। পুরো ঘটনার সূত্রপাত হয় গত ১ জুলাই, যখন জুঁই লিগ্যাল এইডে শাকিল এবং তার মা আছমার বিরুদ্ধে একটি অভিযোগ দায়ের করেন। সেখানে তিনি উল্লেখ করেন যে, তাকে জোরপূর্বক বাসা থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে এবং তার সাত মাসের সন্তানকে আটকে রাখা হয়েছে। জুঁই আদালতের কাছে তার সন্তানকে উদ্ধারের আকুল প্রার্থনা জানান।

আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, গত ১৬ জুলাই শাকিল ও তার মাকে লিগ্যাল এইডে হাজির হওয়ার কথা ছিল। তবে ওইদিন তারা কেউই উপস্থিত হননি। বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে বিচারক সায়েম খান শিশুটিকে উদ্ধার করার জন্য চকবাজার থানা পুলিশকে বিশেষ নির্দেশ প্রদান করেন। পুলিশের তৎপরতায় গত সোমবার শিশুটিকে উদ্ধার করা হয়। এরপর মঙ্গলবার শাকিল, তার মা আছমা এবং উদ্ধারকৃত শিশুটিকে লিগ্যাল এইডে হাজির করা হয়। সেখানে উপস্থিত ছিলেন কিশোরী মা জুঁই এবং উভয় পক্ষের আইনজীবীরা।

শুনানি চলাকালীন এক আবেগঘন মুহূর্ত তৈরি হয়। বিচারক সায়েম খান প্রথমে শিশুটির বাবা শাকিলকে পাশে বসান এবং এরপর জুঁইকে সামনে ডেকে আনেন। সেই সময় জুঁইয়ের কোলে ছিল তার সাত মাসের সন্তান। বিচারক যখন জুঁইকে জিজ্ঞেস করেন, ‘তোমার বাবু?’ তখন জুঁই আবেগপ্লুত কণ্ঠে উত্তর দেন, ‘হ্যাঁ, আমার ছেলে।’ ছেলেকে ফিরে পেয়ে তিনি কতটা খুশি, তা জানতে চাইলে জুঁই বলেন, ‘আমি অনেক খুশি।’

বিচারক এই ঘটনার ভয়াবহতা এবং জুঁইয়ের বয়স দেখে বিস্ময় প্রকাশ করেন। তিনি সবার উদ্দেশ্যে বলেন, ‘জুঁই প্রথম যেদিন এখানে আসে, আমি বিশ্বাসই করতে পারিনি যে তার একটি সন্তান আছে। বিষয়টি বিশ্বাস করার মতো নয়, কারণ সে নিজেও এখনো একটি শিশু।’ এরপর বিচারক শাকিলের বয়স জানতে চাইলে তিনি জানান যে, তার বয়স এখন ২২ বছর। এত ছোট একটি মেয়েকে কীভাবে বিয়ে করলেন, তা জানতে চাইলে শাকিল দাবি করেন, ‘যখন তাকে নিয়ে গিয়েছি, তখন সে প্রাপ্তবয়স্ক ছিল। তার এক মামাতো বোন আছে যে তার চেয়ে এক বছর ছোট, কিন্তু জুঁইকে তার চেয়ে তিন গুণ বড় দেখায়।’ বিচারক যখন জানতে চান যে জুঁইকে জোর করে আটকে রাখা হয়েছিল কি না, শাকিল তা অস্বীকার করেন।

শুনানির এক পর্যায়ে জুঁইয়ের আইনজীবী মৃনাল কান্তি মিত্র আদালতকে জানান যে, তারা পারিবারিক আদালতে গার্ডিয়ানশিপের মামলাও দায়ের করেছেন। অন্যদিকে, শাকিলের আইনজীবী খন্দকার মো. শাহজাহান ইসলাম যুক্তি দেখান যে, মা তার বাচ্চাকে ফেলে চলে গেছেন, তাই বাচ্চাকে মায়ের কাছে দেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে এবং এটি সাংঘর্ষিক হয়ে দাঁড়াতে পারে। তবে মানবিক দিক বিবেচনা করে বিচারক মো. সায়েম খান সাফ জানিয়ে দেন, ‘যেহেতু বাচ্চাটাকে উদ্ধার করে নিয়ে আসা হয়েছে, তাই তাকে মায়ের কাছেই থাকুক। এখানে মানবিক দিকটি দেখতে হবে।’

লিগ্যাল এইড অফিসে কর্মরত (জেল অর্ডার) মো. লুৎফর রহমান জানান, বাচ্চাকে মায়ের কাছে রাখার আদেশ দিয়ে আগামী মঙ্গলবার শুনানির পরবর্তী তারিখ ধার্য করা হয়েছে। শুনানি শেষে জুঁই যখন নিশ্চিত হতে চান যে তার সন্তান তার কাছেই থাকবে কি না, বিচারক তাকে আশ্বস্ত করে বলেন, ‘হ্যাঁ, তোমার কাছেই থাকবে।’

জুঁইয়ের পারিবারিক জীবন ছিল অত্যন্ত সাধারণ। তিনি জুয়েল খান ও লিমা আক্তারের একমাত্র কন্যা। বাবা জুয়েল খান অটোরিক্সা চালিয়ে সংসার চালান। মা লিমা আক্তার জীবিকার তাগিদে দুই বছর আগে সৌদি আরব গিয়েছিলেন। মেয়েকে নিয়ে জুয়েল খান ঢাকার হাজারীবাগ এলাকায় বসবাস করতেন। সৌদি আরবে থাকাকালীন লিমা তার মেয়ের বিয়ের প্রস্তাব শুনতে পান এবং মাত্র ১৪ দিন আগে দেশে ফিরেছেন। মঙ্গলবার তিনি এবং তার স্বামী জুয়েল খানও লিগ্যাল এইড অফিসে উপস্থিত ছিলেন।

মা লিমা আক্তার অভিযোগ করে বলেন, ‘আমার মেয়ে পড়াশোনা করত। এই ছেলেটি তাকে ফুসলিয়ে অনেক দিন ধরে আটকে রেখেছিল। আমি শুরু থেকেই জানতাম এই ছেলের কাছে মেয়ে দেব না। আমার মেয়ের বিয়ের বয়স হয়নি, তার বয়স মাত্র ১৩ বছর।’ বাবা জুয়েল খান আরও বলেন, ‘আমি শাকিলকে বলেছিলাম মেয়ে মেট্রিক পরীক্ষা দিলে বিয়ের কথা বলব। কিন্তু সে আমার মেয়েকে ফুসলিয়ে নিয়ে যায়। এক সপ্তাহ তাকে আটকে রাখে। মান-সম্মানের কথা চিন্তা করে আমি তখন কিছু বলিনি। পরে সে আবার মেয়েকে ভাগিয়ে নিয়ে বিয়ে করে। কোথায় বিয়ে করেছে তাও আমি জানি না। উল্টো আমাকে হুমকি-ধমকি দিয়েছে।’

পাল্টা যুক্তিতে শাকিল দাবি করেন, ফেসবুকে পরিচয়ের পর জুঁই নিজেই তাকে অনুরোধ করেছিল তাকে নিয়ে যেতে, এমনকি না নিলে মরে যাওয়ার হুমকি দিয়েছিল। শাকিল আরও বলেন, তার মা জুঁইকে মেনে নিয়েছিলেন এবং তাকে নামাজ পড়ার কথা বলতেন, কিন্তু জুঁইয়ের সাথে তার মায়ের বনিবনা হয়নি। শাকিলের দাবি, জুঁইয়ের বাবা তাকে বরিশালে নিয়ে আটকে রেখেছিলেন এবং তিন মাস আগে বাবার স্ট্রোকের কথা বলে জুঁই সন্তানকে রেখে বাসা থেকে বেরিয়ে যান, এরপর আর কোনো খোঁজ নেননি।

তবে জুঁইয়ের আইনজীবী মৃনাল কান্তি মিত্র এই দাবিগুলো প্রত্যাখ্যান করে জানান, শুটিং স্পট দেখানোর কথা বলে মেয়েটিকে প্রলোভন দেখিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেখানে তাকে আটকে রেখে শারীরিক নির্যাতন করা হয় এবং ব্ল্যাংক স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নিয়ে বিয়ে হয়েছে বলে দাবি করা হয়। গত ১ জানুয়ারি জুঁই সন্তান জন্ম দেন, কিন্তু মে মাসে তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয় এবং সন্তানকে আটকে রাখা হয়। নিরুপায় হয়ে তারা লিগ্যাল এইডের শরণাপন্ন হন। শেষ পর্যন্ত আদালতের সার্চ ওয়ারেন্টের মাধ্যমে শিশুটিকে উদ্ধার করে মায়ের কোলে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।