মানুষের মনে যুগ যুগ ধরে প্রচলিত রয়েছে নানা ধরনের অদ্ভুত বিশ্বাস ও ধারণা। আমাদের সমাজেও তেমনই একটি প্রচলিত ধারণা হলো—জোড়া কলা খেলে যমজ সন্তান হয়। এই বিশ্বাসটি সাধারণ মানুষের মধ্যে এতটাই গভীরে প্রোথিত যে, অনেক পরিবারে অন্তঃসত্ত্বা নারীদের জোড়া কলা খেতে নিষেধ করা হয়। আবার কেউ কেউ যমজ সন্তান লাভের প্রবল আশায় পরিকল্পিতভাবে জোড়া কলা খেয়ে থাকেন। কিন্তু প্রশ্ন জাগে, জোড়া কলা খাওয়া এবং যমজ সন্তান জন্মদানের মধ্যে কি সত্যিই কোনো যোগসূত্র আছে? ইসলাম ও বিজ্ঞান এই বিষয়ে কী বলে?

ইসলামি শরিয়তে সন্তান জন্মদান সম্পূর্ণভাবে মহান আল্লাহর ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তা’য়ালা ইরশাদ করেছেন, لِلَّهِ مُلْكُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ يَخْلُقُ مَا يَشَاء يَهَبُ لِمَنْ يَشَاء إِنَاثًا وَيَهَبُ لِمَن يَشَاء الذُّكُورَ - أَوْ يُزَوِّجُهُمْ ذُكْرَانًا وَإِنَاثًا وَيَجْعَلُ مَن يَشَاء عَقِيمًا إِنَّهُ عَلِيمٌ قَدِيرٌ। এর অর্থ: “নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের রাজত্ব আল্লাহ তা’য়ালারই। তিনি যা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন; যাকে ইচ্ছা কন্যা-সন্তান এবং যাকে ইচ্ছা পুত্রসন্তান দান করেন। অথবা তাদের দান করেন পুত্র ও কন্যা উভয়ই এবং যাকে ইচ্ছা বন্ধ্যাত্ব করে দেন। নিশ্চয় তিনি সর্বজ্ঞ, ক্ষমতাশীল।” (সুরা শুরা: ৪৯-৫০)।

মহান আল্লাহর পবিত্র কালামের এই আয়াত থেকে সুস্পষ্ট প্রমাণিত হয় যে, সৃষ্টির সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ একমাত্র মহান আল্লাহর হাতে। তিনি চাইলে যা ইচ্ছা তাই করতে পারেন। যারা জীবনে কখনোই জোড়া কলা খাননি, কিন্তু আল্লাহ তাদের যমজ সন্তান দিয়েছেন, তাদের উদাহরণই প্রমাণ করে যে জোড়া কলা খাওয়ার সাথে যমজ সন্তান হওয়ার কোনো সম্পর্ক নেই। ইসলামে এই ধরনের বিশ্বাসের কোনো ভিত্তি নেই। তাই এ ধরনের কুসংস্কার থেকে নিজেকে দূরে রাখা এবং অন্যদের সচেতন করা প্রতিটি মুমিনের দায়িত্ব।

এবার দেখা যাক বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে জোড়া কলার রহস্য কী। উদ্ভিদবিজ্ঞানের ভাষায়, কোনো ফুল বা ফলের অস্বাভাবিক গঠনকে বলা হয় ‘ফ্যাসিয়েশন’ (Fasciation)। এটি মূলত উদ্ভিদের জিনগত ত্রুটি অথবা পরিবেশগত কোনো প্রভাবের কারণে ঘটে থাকে। যখন উদ্ভিদের কোষগুলো স্বাভাবিকভাবে বিভাজিত না হয়ে পাশাপাশি প্রসারিত হতে শুরু করে, তখন কান্ড, ফুল বা ফল চ্যাপ্টা হয়ে একসঙ্গে জুড়ে যায়। কলা গাছের ক্ষেত্রে যখন মোচার ভেতরে থাকা একাধিক ফুল একে অপরের সাথে মিশে যায়, তখন জোড়া কলার জন্ম হয়। এটি সম্পূর্ণ একটি অভ্যন্তরীণ জৈবিক প্রক্রিয়া। এর সাথে মানবদেহের প্রজনন প্রক্রিয়ার কোনো সম্পর্ক থাকা বৈজ্ঞানিকভাবে অসম্ভব।

চিকিৎসা বিজ্ঞানের মতে, যমজ সন্তান জন্মানোর প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত জটিল এবং এটি কোনো নির্দিষ্ট খাবার খাওয়ার সাথে সম্পর্কিত নয়। যমজ সন্তান প্রধানত দুই ধরনের হয়ে থাকে:

১. ফ্রেটারনাল টুইন (Fraternal Twins): যখন একজন নারীর ডিম্বাশয় থেকে একই সময়ে দুটি ভিন্ন ডিম্বাণু নির্গত হয় এবং দুটি আলাদা শুক্রাণু দ্বারা নিষিক্ত হয়, তখন ফ্রেটারনাল টুইনসের জন্ম হয়। যেহেতু তারা ভিন্ন ভিন্ন ডিম্বাণু ও শুক্রাণু থেকে তৈরি হয়, তাই তাদের চেহারা আলাদা হতে পারে এবং লিঙ্গ ভিন্ন হওয়া সম্ভব।

২. আইডেন্টিক্যাল টুইন (Identical Twins): যখন একটি মাত্র ডিম্বাণু একটি শুক্রাণু দ্বারা নিষিক্ত হওয়ার পর ভ্রূণটি স্বাভাবিক বিভাজনের পরিবর্তে দুটি সমান ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়, তখন আইডেন্টিক্যাল টুইনসের জন্ম হয়। যেহেতু তারা একই ভ্রূণ থেকে জন্মায়, তাই তাদের জিনগত গঠন হুবহু এক হয়, চেহারা এক হয় এবং লিঙ্গও সর্বদা একই থাকে।

এই পুরো প্রক্রিয়াটি মূলত একটি প্রাকৃতিক ও আকস্মিক ঘটনা। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান অনুযায়ী, বাইরে থেকে কোনো নির্দিষ্ট ফল বা খাবার গ্রহণের মাধ্যমে এই প্রজনন প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। পরিশেষে বলা যায়, জোড়া কলা খেলে যমজ সন্তান হয়—এই ধারণাটি নিছক একটি কুসংস্কার। ধর্ম এবং বিজ্ঞান উভয় দিক থেকেই এটি প্রমাণিত যে, এই বিশ্বাসের কোনো সত্যতা নেই। তাই অন্ধবিশ্বাসের পেছনে না ছুটে সঠিক জ্ঞান অর্জন করা এবং বিজ্ঞানসম্মত তথ্যের ওপর আস্থা রাখাই শ্রেয়।