কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষকের নিখোঁজ ছেলের মরদেহ উদ্ধার এবং এই ঘটনায় সন্দেহভাজন এক কিশোরকে আটক করার ঘটনায় এলাকায় শোক ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। নিখোঁজ শিশুটির নাম ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতীম (১৩), তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. নাহিদা বেগমের সন্তান। শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) দুপুরে অপ্রতীমের মরদেহ উদ্ধারের পর পুলিশ সন্দেহভাজন হিসেবে তুহিন নামের এক কিশোরকে হেফাজতে নিয়েছে। তুহিনের বাড়ি সানন্দা এলাকায় এবং তার বাবার নাম নুরুল আলম। বর্তমানে কোটবাড়ী এলাকা থেকে তাকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

পুলিশ ও বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, অপ্রতীম নিখোঁজ হওয়ার পর থেকেই তাকে খুঁজে বের করতে বিভিন্ন ধরনের চেষ্টা চালানো হচ্ছিল। নিখোঁজের রহস্য উদঘাটনে কোটবাড়ী এবং বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন এলাকার বিভিন্ন সিসিটিভি ফুটেজ নিবিড়ভাবে পর্যালোচনা করা হয়। শনিবার সকালে সিসিটিভি ফুটেজ দেখার সময় একটি ভিডিওতে অপ্রতীমকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের কাছে এক কিশোরের সঙ্গে দেখা যায়। ফুটেজে দেখা গেছে, ওই কিশোরের বয়স অপ্রতীমের চেয়ে বেশি এবং তার মাথায় একটি ক্যাপ পরা ছিল।

সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনার বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম এম শরীফুল করীম বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল টিম সামনের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে স্থানীয় এক কিশোরকে অপ্রতীমের সঙ্গে ঘোরাঘুরি করতে দেখে। ওই কিশোরের গতিবিধি অত্যন্ত সন্দেহজনক মনে হয়েছে। আমরা দ্রুত বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অবহিত করেছি এবং তারা যথাযথ তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করছে।”

উপাচার্য আরও জানান, গত শুক্রবার অপ্রতীম বাসা থেকে বের হয়ে আর ফিরে আসেনি। বিষয়টি জানার পরপরই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল টিম, ডিনসহ শিক্ষক ও কর্মকর্তারা শোকসন্তপ্ত পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং পুলিশকে বিষয়টি জানান। বিশ্ববিদ্যালয়ের দুটি বিশেষ টিম শুক্রবার থেকেই তাকে খোঁজার কাজ শুরু করে। তবে শেষ পর্যন্ত তার মরদেহ উদ্ধার হয়। এই হৃদয়বিদারক ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করে তিনি বলেন, “একটি সন্তানের মরদেহ কত ভারী হয়, তা বোঝানোর ক্ষমতা আমাদের নেই।”

কুমিল্লা জেলা পুলিশের মিডিয়া কর্মকর্তা ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. লুৎফর রহমান জানান, অপ্রতীমের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় তদন্তের স্বার্থে একজনকে আটক করা হয়েছে। তাকে বর্তমানে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে এবং তার দেওয়া তথ্যের সত্যতা যাচাই-বাছাই করে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

ঘটনার সূত্র ধরে জানা যায়, শুক্রবার দুপুরে কোটবাড়ী এলাকার একটি ভাড়া বাসা থেকে বের হওয়ার পর অপ্রতীম নিখোঁজ হয়। সে কুমিল্লার বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। পরিবারের সদস্যদের মতে, বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তোলার কথা বলে সে তার মায়ের আইফোনটি নিয়ে বাসা থেকে বের হয়েছিল। শনিবার বেলা ১টার দিকে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার বিজয়পুর ইউনিয়নের সানন্দা গ্রামের লালমাই পাহাড়ের জঙ্গলে পুলিশ অপ্রতীমের মরদেহ উদ্ধার করে। মরদেহের মাথায় আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে।

পুলিশ জানিয়েছে, অপ্রতীমের সঙ্গে থাকা আইফোনটি এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। তবে ফোনটি ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে তাকে হত্যা করা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না। মরদেহটি ময়নাতদন্তের জন্য কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্য কোনো ব্যক্তি আছে কি না এবং মৃত্যুর সঠিক কারণ উদ্‌ঘাটনে পুলিশি তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।

এদিকে, অপ্রতীমের মরদেহ প্রথম দেখতে পান স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ আবদুল কাদের জিলানী। শনিবার বেলা ১১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার (ম্যাজিক প্যারাডাইস পার্কের পাশে) জঙ্গলে বাঁশ কাটতে গিয়ে তিনি ও তার সঙ্গে থাকা কয়েকজন ওই শিশুকে পড়ে থাকতে দেখেন। জিলানী সেই মুহূর্তের বর্ণনা দিয়ে বলেন, “আমরা বাঁশ কাটার কাজের জন্য ওই এলাকায় গিয়েছিলাম। যাওয়ার সময় আমার ভাতিজা হঠাৎ বলে, ‘কাকা, ওই দেখো একটা বাচ্চা পড়ে আছে।’ কাছে গিয়ে দেখি, শিশুটির মাথার দিক থেকে রক্ত বের হয়ে শরীর রঞ্জিত। আমরা প্রচণ্ড ভয় পেয়ে যাই এবং কাজ ফেলে দ্রুত সেখান থেকে চলে আসি।”

জিলানী জানান, তখন তার কাছে সময় দেখার মতো কোনো ঘড়ি বা মোবাইল ফোন ছিল না। তবে সূর্যের অবস্থান দেখে তার ধারণা, সকাল সাড়ে ১০টা থেকে বেলা সাড়ে ১১টার মধ্যে তিনি মরদেহটি দেখেছেন। জঙ্গল থেকে বেরিয়ে সড়কের কাছাকাছি পৌঁছালে তার সাথে মামুন নামের এক স্থানীয় ব্যক্তির দেখা হয়। সেই আলাপচারিতার সময় জিলানী জানতে পারেন যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষকের সন্তান নিখোঁজ। এরপর মামুন তাকে সঙ্গে নিয়ে পুনরায় ঘটনাস্থলে ফিরে আসেন এবং নিশ্চিত হন যে মৃত শিশুটিই নিখোঁজ অপ্রতীম। জিলানী বলেন, “মামুন ভাই যখন বললেন ম্যাডামের বাচ্চা হারাইছে, তখন আমি তাকে জানাই যে ওখানে একটা বাচ্চা পড়ে আছে। এরপর তিনি আমাকে নিয়ে সেখানে যান এবং আমরা দেখি এটাই সেই নিখোঁজ বাচ্চা।”