মাসুদ রেজা ফিরোজী

মাদারীপুরে পাঁচ দিনের ব্যবধানে একই এলাকার দুই নারীকে ঘিরে সহিংস ঘটনায় এলাকায় এখন আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। প্রথম ঘটনাটি আইভী আক্তার (১৮) নামে এক তরুণীকে ঘরে ঢুকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এর পাঁচ দিন পর একই এলাকায় তানিয়া নামে আরেক নারীকে ঘরে ঢুকে গলায় ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে তাকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিল। পরপর দুটি ঘটনায় উদ্বেগ বাড়লেও আইভী হত্যার রহস্য এবং তানিয়া হত্যা চেষ্টার ঘটনায় এখনো রহস্যটি উদঘাটন করতে পারেনি পুলিশ। এসব ঘটনায় এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি।

গত ৮ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় মাদারীপুর সদর উপজেলার কালিকাপুর ইউনিয়নের সাবেক কালিকাপুর গ্রামের চাচার বাড়িতে খুন হন আইভী আক্তার। ওই সময় তিনি বাড়িতে একাই ছিলেন।

স্বজনদের ভাষ্য, দুর্বৃত্তরা ঘরে ঢুকে তাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করে। পরে রক্তাক্ত অবস্থায় মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখা যায় তাকে।

পরিবারের দাবি, হত্যার পর আইভীর ব্যবহৃত আইফোন, স্বর্ণালংকার ও নগদ টাকা পাওয়া যায়নি।

আইভীর চাচা কালাম শরীফ বলেন, নামাজ পড়তে মসজিদে গিয়েছিলেন তিনি। নামাজ শেষে বাড়িতে ফিরে আইভীকে রক্তাক্ত অবস্থায় মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখেন। পরে স্থানীয়দের সহায়তায় পুলিশকে খবর দেওয়া হয়।

আইভীর চাচি ছায়া বেগম বলেন, মাত্র ১০ দিন বয়স থেকে আইভীকে তিনি নিজের সন্তানের মতো করে বড় করেছেন। তার পড়াশোনা থেকে শুরু করে বিয়ে—সবকিছুর দায়িত্ব পালন করেছেন।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আইভী শুধু আমার মেয়ে ছিল না, সে ছিল আমার মায়ের মতো। যারা তাকে এভাবে হত্যা করেছে, তাদের খুঁজে বের করে শাস্তি দিতে হবে।’

নিহত আইভীর মা আখলিমা বেগম বলেন, ‘এখনো যারা তোরে মেরেছে, পুলিশ তাদের ধরতে পারেনি। আল্লাহ তাদের বিচার করবে। পুলিশের কাছে আমার দাবি, তাড়াতাড়ি তাদের ধরে শাস্তির ব্যবস্থা করা হোক।’

আইভীর ভাই আসিফ বলেন, পুলিশ কেন আসামি ধরতে পারতেছে না, আমরা বুঝতে পারতেছি না। পুলিশ বলে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। আমরা চাই প্রশাসন দ্রুত আমার বোনের হত্যাকারীকে ধরে কঠিন শাস্তির ব্যবস্থা করুক।

আইভীর বাবা আসলাম শরীফ বলেন, আমার মেয়েকে যেভাবে হত্যা করা হয়েছে, তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। যারা আমার মেয়েকে হত্যা করেছে, তাদের দ্রুত গ্রেপ্তার করতে হবে। আমরা সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার চাই।

এ ঘটনায় আইভীর বাবা আসলাম শরীফ ১১ সেপ্টেম্বর মাদারীপুর সদর থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। তবে ঘটনার কয়েক দিন পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত পুলিশ কোনো আসামি গ্রেপ্তার হয়নি। এরই মধ্যে আইভী হত্যার পাঁচ দিন পর গত ১১ সেপ্টেম্বর বিকেলে একই কালিকাপুর ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডে তানিয়া নামে আরেক নারী হামলার শিকার হয়েছে।

পরিবারের ভাষ্য, তানিয়া ওই সময় নিজ ঘরে ঘুমিয়ে ছিলেন। মুখোশধারী দুই ব্যক্তি ঘরে ঢুকে পেছন থেকে তার গলায় ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে পালিয়ে যায়। গুরুতর আহত তানিয়াকে প্রথমে মাদারীপুর সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।

পরিবারের দাবি, তানিয়ার কাছে থাকা একটি চিরকুটে দুই মুখোশধারী ব্যক্তি ঘরে ঢুকে পেছন থেকে তাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করার কথা লেখা রয়েছে। পরপর পাঁচ দিনের ব্যবধানে একই এলাকায় একজন নারী খুন এবং আরেক নারীকে গলা কেটে হত্যার চেষ্টার ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে এখন আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। সন্ধ্যার পর অনেকেই প্রয়োজন ছাড়া বাড়ির বাইরে বের হচ্ছেন না। বিশেষ করে নারীরা নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন।

কালিকাপুর এলাকার স্থানীয় নারী শেফালী বেগম বলেন, আমাদের এলাকায় পরপর দুটি ঘটনা ঘটেছে। এখন দিনের বেলাও ভয় লাগে। কখন কি হয়ে যায়? পুলিশ কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি। বুঝতে পারছি না কেন এমন ঘটনা ঘটছে।

শাহেদা বেগম নামে আরেক নারী বলেন, পরপর দুটি ঘটনা ঘটলো অথচ পুলিশ কাউকেই গ্রেফতার করতে পারেনি। আমরা চাই পুলিশ দ্রুত আসামি গ্রেফতার করে কারণ খুঁজে বের করুক।

তবে দুটি ঘটনার মধ্যে কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। পুলিশও এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছায়নি।

স্থানীয়দের প্রশ্ন, প্রথম ঘটনার রহস্যই যখন এখনো উদঘাটন হয়নি এবং হত্যাকাণ্ডে জড়িত কাউকে গ্রেপ্তার করা যায়নি, তখন মাত্র পাঁচ দিনের ব্যবধানে একই এলাকায় দ্বিতীয় নারী আক্রান্ত হওয়ার ঘটনায় নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।

মাদারীপুর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল কালাম আজাদ বলেন, নিহত আইভীর শরীরের বিভিন্ন স্থানে ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। চুরির উদ্দেশ্যে, নাকি অন্য কোনো কারণে হত্যাকাণ্ডটি ঘটেছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। দুটি ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে তদন্তের পাশাপাশি অভিযান চলছে।