কলম্বিয়ার পশ্চিমাঞ্চলে আঘাত হানা এক বিধ্বংসী ভূমিকম্পে অন্তত ২০০ জনের বেশি মানুষের প্রাণহানির পর দেশটিতে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয়েছে। বুধবার (১২ আগস্ট) দেশটির কর্তৃপক্ষ এই ঘোষণা প্রদান করে। নিহতদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাতে সরকারি সকল ভবন এবং বিশ্বজুড়ে অবস্থিত কলম্বিয়ান দূতাবাসগুলোতে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হবে বলে জানানো হয়েছে।
গত সোমবার (১০ আগস্ট) স্থানীয় সময়ে কলম্বিয়ার পশ্চিমাঞ্চলে ৭.৪ মাত্রার এক শক্তিশালী ভূমিকম্প অনুভূত হয়। সরকারি তথ্যানুসারে, গত এক শতাব্দীর মধ্যে দেশটিতে আঘাত হানা সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প এটি। এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে পশ্চিম কলম্বিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকায় অসংখ্য বহুতল ভবন ধসে পড়েছে এবং সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
এই ভয়াবহ দুর্যোগটি নবনিযুক্ত প্রেসিডেন্ট আবেলিয়ার্দো দে লা এস্প্রিয়েলার জন্য এক কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র তিন দিনের মাথায় তাকে এই জাতীয় সংকটের মোকাবিলা করতে হচ্ছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই ভূমিকম্পে আহত হয়েছেন ২,৫৯৫ জন এবং আনুষ্ঠানিকভাবে নিখোঁজ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে ১৯৫ জনকে। তবে বেসরকারি বিভিন্ন সূত্র ও স্থানীয় তথ্যের ভিত্তিতে ধারণা করা হচ্ছে, নিখোঁজ বা যাদের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না, এমন মানুষের সংখ্যা ৪,০০০-এর কাছাকাছি হতে পারে।
উদ্ধারকারী সংস্থাগুলো সতর্ক করে জানিয়েছে যে, ধসে পড়া ভবনের নিচে চাপা পড়া মানুষদের জীবিত উদ্ধারের ক্ষেত্রে প্রথম ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়। তবে পর্যাপ্ত খাবার ও পানির সংস্থান থাকলে মানুষ এর চেয়েও বেশি সময় বেঁচে থাকতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত শহর কালি, পেরেইরা, মানিজালেস এবং কুইবদোর মতো এলাকাগুলোতে উদ্ধারকর্মীরা ক্লান্তিহীনভাবে দিনরাত কাজ করে যাচ্ছেন। বিশেষ করে পেরেইরা ও কালিতে উদ্ধারকারীরা আধুনিক ক্রেন, তল্লাশি চালানোর জন্য প্রশিক্ষিত কুকুর এবং বিভিন্ন ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করছেন। পাশাপাশি হাজার হাজার স্বেচ্ছাসেবক মানুষের সারি বা ‘হিউম্যান চেইন’ তৈরি করে হাত দিয়ে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে চাপা পড়া মানুষদের উদ্ধারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
বিপর্যয়ের এই মুহূর্তে কলম্বিয়ার সাধারণ মানুষ অসামান্য সংহতি প্রদর্শন করেছেন। হাজার হাজার মানুষ স্বতস্ফুর্তভাবে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে খাবার, বিশুদ্ধ পানি এবং অন্যান্য জরুরি প্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছে দিয়েছেন। এছাড়া আহতদের চিকিৎসার জন্য রক্তদান কেন্দ্রগুলোর সামনে সাধারণ মানুষের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে।
প্রেসিডেন্ট দে লা এসপ্রিয়েলা দ্রুততম সময়ে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন এবং যেসব পরিবার এই দুর্যোগে তাদের মাথা গোঁজার ঠাঁই বা ঘরবাড়ি হারিয়েছে, তাদের জন্য বিশেষ বাড়িভাড়া সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
এদিকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় থেকেও কলম্বিয়ার প্রতি সহমর্মিতা ও সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ১৫.৫ মিলিয়ন ডলারের জরুরি আর্থিক সহায়তা ঘোষণা করেছে। বুধবার মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর থেকে জানানো হয়েছে যে, প্রেসিডেন্ট দে লা এসপ্রিয়েলার সরকারের অনুরোধে তারা ভার্জিনিয়ার ফেয়ারফ্যাক্স কাউন্টি এবং ক্যালিফোর্নিয়ার লস এঞ্জেলেস কাউন্টি থেকে বিশেষ ‘আরবান সার্চ-অ্যান্ড-রেসকিউ’ (শহরাঞ্চলে অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী) কারিগরি দল পাঠাচ্ছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নও এই সংকটে ২.৩ মিলিয়ন ডলার সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। পাশাপাশি মেক্সিকো সরকার শত শত দক্ষ অনুসন্ধানকারী ও স্বাস্থ্যকর্মী পাঠানোর প্রস্তাব জানিয়েছে এবং এল সালভাদর ঘোষণা করেছে যে, তারা ১০০ টন ত্রাণসামগ্রী নিয়ে দুটি বিশেষ বিমান কলম্বিয়ায় পাঠাবে।
সূত্র: আলজাজিরা।











