যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আরও একবার দাবি করেছেন যে, বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বুধবার (১২ আগস্ট) তার নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যালে’ দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প এই দাবি জানান। পোস্টের শেষ অংশে তিনি লিখে থাকেন, ‘সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর’। আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে এই তথ্যের উল্লেখ করা হয়েছে। ট্রাম্পের মতে, হরমুজ প্রণালির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের এই নিয়ন্ত্রণ অটুট রয়েছে এবং তিনি বিশ্বাস করেন যে যুক্তরাষ্ট্র এই আধিপত্য ধরে রাখবে। এর আগে মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের সামনেও তিনি একই ধরনের দাবি ব্যক্ত করেছিলেন।
ট্রাম্প তার পোস্টে ইরানের বন্দরগুলো ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান নৌ-অবরোধের তীব্র প্রশংসা করেন। তিনি এই অবরোধকে একটি ‘স্টিলের দেয়াল’ হিসেবে অভিহিত করে বলেন, এই দুর্ভেদ্য প্রাচীরের সামনে ইরানের করার মতো কিছুই নেই। ইরানকে তীব্রভাবে কটাক্ষ করে তিনি দাবি করেন, দেশটির এখন আর কোনো কার্যকর নৌবাহিনী বা বিমানবাহিনী অবশিষ্ট নেই। এমনকি যারা সেনাসদস্য হিসেবে টিকে আছেন, তারা নিয়মিত বেতন পাচ্ছেন না। ট্রাম্পের অভিযোগ, ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) কার্যত ধ্বংসপ্রাপ্ত এবং এর সদস্যরা পালিয়ে বেড়াচ্ছে। তিনি আরও বলেন, ইরানের বর্তমান নেতৃত্ব চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে এবং তাদের কোনো কার্যকর পরিকল্পনা নেই।
ইরানের অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের কথা উল্লেখ করে ট্রাম্প লেখেন, দেশটির হাতে এখন আর কোনো অর্থ নেই এবং পুরো দেশ ধ্বংসের মুখে। তার মতে, ইরানের হাতে এখন কেবল ‘ভুয়া খবর’ এবং ৩০০ শতাংশ মূল্যস্ফীতির বোঝা রয়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরও শোচনীয় করে তুলছে। তিনি আরও বলেন, ইরান কেবল কথা বলতে জানে, কোনো বাস্তব কাজ করে না এবং মধ্যপ্রাচ্যে তাদের একচ্ছত্র দাদাগিরির দিন শেষ হয়ে গেছে। পুনরায় তিনি লেখেন, ‘সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর’।
তবে ট্রাম্পের এই উচ্চকণ্ঠ দাবির বিপরীতে বাস্তব পরিস্থিতি বেশ জটিল। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের হার নাটকীয়ভাবে সংকুচিত হয়ে পড়েছে। ইরান ক্রমাগত দাবি করে আসছে যে, এই প্রণালিতে তাদের প্রভাব এখনো অটুট। ভবিষ্যতে এই নৌপথটি কীভাবে পরিচালিত হবে, তা নিয়ে তেহরান বর্তমানে ওমানের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। ইরানের কঠোর অবস্থান হলো—যুক্তরাষ্ট্র যতক্ষণ পর্যন্ত তাদের নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার না করবে, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে না নেবে এবং ইরানের জব্দ করা সম্পদ অবমুক্ত না করবে, ততক্ষণ পর্যন্ত হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিক জাহাজ চলাচলের সুযোগ দেওয়া হবে না। যদিও প্রণালিটি পুরোপুরি বন্ধ করা হয়নি, তবে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে এখন চরম ঝুঁকি ও নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতার মোকাবিলা করতে হচ্ছে। ফলে এই নৌপথে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।
রয়টার্সের দেওয়া তথ্যানুসারে, গত মঙ্গলবার হরমুজ প্রণালি দিয়ে মাত্র ৮টি জাহাজ চলাচল করেছে। অথচ যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে প্রতিদিন গড়ে ১৩০ থেকে ১৪০টি জাহাজ এই নৌপথ ব্যবহার করত। কেপলারের উপাত্ত অনুযায়ী, মঙ্গলবারের এই সংখ্যা গত ১০ দিনের গড় (প্রায় ১২টি জাহাজ) থেকেও অনেক কম।
হরমুজ প্রণালির উত্তেজনার পাশাপাশি ইয়েমেনভিত্তিক হুতি বিদ্রোহীরাও যুদ্ধের এক নতুন ফ্রন্ট খুলেছে। তারা বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে আন্তর্জাতিক জাহাজে একের পর এক হামলা চালাচ্ছে। মঙ্গলবার একটি মিসরীয় মালিকানাধীন জাহাজে হুতিদের চালানো হামলায় ছয়জন নিহত হয়েছেন। যুদ্ধ শুরুর পর জাহাজ চলাচলে হুতিদের হামলায় এটিই প্রথম প্রাণহানির ঘটনা, যা পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে।
উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করে। পরবর্তীতে জুনে ওয়াশিংটন ও তেহরান সংঘাত নিরসনে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর করলেও জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ে সেই চুক্তিটি ভেঙে যায়। এরপর দুই পক্ষ আবারও হামলা ও পাল্টা হামলার চক্রে জড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে সংঘাতের মাত্রা কিছুটা সীমিত মনে হলেও বিশ্বের দুটি প্রধান নৌপথ—হরমুজ ও বাব আল-মান্দেবে উত্তেজনা অব্যাহত থাকায় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।











