মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণে এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়ে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান একটি নতুন সামরিক জোট গঠন করেছে। পবিত্র শহর মক্কায় স্বাক্ষরিত এই চুক্তির মূল লক্ষ্য হলো ইরানকে নিবৃত্ত করা, যুক্তরাষ্ট্রের ওপর দীর্ঘদিনের নির্ভরতা কমিয়ে আনা এবং ইসরায়েলের প্রতি একটি স্পষ্ট বার্তা পৌঁছে দেওয়া। ন্যাটোর আদলে গড়ে ওঠা এই প্রতিরক্ষা চুক্তিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, জোটের যেকোনো একটি সদস্য রাষ্ট্রের ওপর হামলা হলে তা সামগ্রিকভাবে সব সদস্য রাষ্ট্রের ওপর হামলা হিসেবে গণ্য করা হবে এবং সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে।
গত ছয় মাস ধরে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে। তেহরানকে পরাস্ত করতে ওয়াশিংটন কার্যত ব্যর্থ হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। উল্টো ইরান ও তাদের মিত্র হুতি বিদ্রোহীরা হরমুজ প্রণালি এবং লোহিত সাগরে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটাচ্ছে। এই অঞ্চলে মার্কিন সামরিক ঘাঁটির ব্যাপক উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও ইরান ও তার মিত্রদের ছোড়া মিসাইল প্রতিরোধ করতে যুক্তরাষ্ট্র হিমশিম খাচ্ছে। এই রূঢ় বাস্তবতা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতার মুখে এখন আঞ্চলিক শক্তিগুলোর মাধ্যমেই নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে, যার ফলে রিয়াদ তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরদার করেছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক আন্দ্রেয়াস ক্রিগের মতে, এই তিন দেশের সামরিক ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে। সৌদি আরবের বিপুল আর্থিক সম্পদ থাকলেও তাদের নিজস্ব সামরিক সক্ষমতা তুলনামূলক কম। অন্যদিকে, তুরস্কের উন্নত সামরিক প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম থাকলেও তাদের প্রয়োজন বড় বাজার এবং বিনিয়োগের সুযোগ। আবার পাকিস্তানের বিশাল সামরিক জনবল এবং পারমাণবিক সক্ষমতা থাকলেও দেশটি বর্তমানে তীব্র অর্থসংকটে ভুগছে। ফলে এই চুক্তির মাধ্যমে তারা মূলত একে অপরের ঘাটতি পূরণ করে একটি শক্তিশালী প্রতিরক্ষা বলয় তৈরি করতে চায়।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, ইরান যদি সৌদি আরবে আক্রমণ করে, তবে তুরস্ক বা পাকিস্তান সরাসরি পাল্টা সামরিক পদক্ষেপ নেবে—এমন সম্ভাবনা বেশ কম। এই দেশগুলো নিজেদের মূলত 'স্থিতিশীলতা রক্ষাকারী' হিসেবে উপস্থাপন করতে চায়। তাদের মূল লক্ষ্য সরাসরি যুদ্ধে জড়ানো নয়, বরং ইরান ও ইসরায়েল উভয়ের জন্যই এটি একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক ও প্রতীকী বার্তা।
যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘকাল ধরে 'আব্রাহাম অ্যাকর্ডস'-এর মাধ্যমে ইসরায়েলকে যুক্ত করে এই অঞ্চলে একটি নিরাপত্তা বলয় তৈরির চেষ্টা করে আসছে। কিন্তু নতুন এই প্রতিরক্ষা জোট সেই মার্কিন পরিকল্পনাকে পাশ কাটিয়ে ইসরায়েলি আধিপত্যকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। পাকিস্তান ও তুরস্ক শুরু থেকেই ইসরায়েলের কঠোর সমালোচক। অন্যদিকে, একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠন না হওয়া পর্যন্ত সৌদি আরবও ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বিষয়ে অটল রয়েছে। সব মিলিয়ে, এই নতুন জোট মূলত ইরানি আধিপত্য এবং ইসরায়েলি শ্রেষ্ঠত্বের প্রকল্পের সামনে একটি বড় বাধা হিসেবে আবির্ভূত হবে।











