রাজধানীর শাহবাগে এক উত্তাল পরিবেশের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত হলো এক বিশাল বিক্ষোভ সমাবেশ, যেখানে পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল জনগোষ্ঠীর সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিতকরণ, মেধাভিত্তিক নিয়োগ ব্যবস্থা চালু এবং পাহাড়ের অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারসহ সন্ত্রাস দমনের জোরালো দাবি জানানো হয়। সার্বভৌমত্ব সুরক্ষা পরিষদের উদ্যোগে মঙ্গলবার সকাল ১০টা ৩০ মিনিটে শাহবাগের শহীদ হাদী চত্বরে এই সমাবেশটি অনুষ্ঠিত হয়। পার্বত্য অঞ্চলের বর্তমান পরিস্থিতি এবং সেখানে বসবাসরত বাঙালিদের অধিকার বঞ্চিত হওয়ার বিষয়টি কেন্দ্র করে এই কর্মসূচির ডাক দেওয়া হয়েছিল।

বিক্ষোভ সমাবেশের সভাপতিত্ব করেন সার্বভৌমত্ব সুরক্ষা পরিষদের প্রধান সমন্বয়ক মোঃ মোস্তফা আল ইহযায। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ইসলামি আন্দোলন বাংলাদেশের প্রেসিডিয়াম সদস্য অধ্যাপক আশরাফ আলী আকন। বিশেষ অতিথিদের তালিকায় ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা কর্নেল (অবঃ) খন্দকার ফরিদুল আকবর, পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদ লিগ্যাল এইড’র সভাপতি এডভোকেট পারভেজ তালুকদার, শ্রমিক নেতা বজলুর রহমান বাবলু, ছাত্রনেতা মিজানুর রহমান, স্টুডেন্ট ফর সভারেন্টির আহ্বায়ক জিয়া উল হক, সাহিদুল ইসলাম, কৃষিবিদ রফিকুল ইসলাম, প্রভাষক নারগিস জুই, যুব নেতা সেলিম রেজা বাচ্চু, শাহপরান সাইম, রোজিনা আক্তার, তারেক রহমান শাওনসহ আরও অনেকে।

সমাবেশের অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয় ছিল পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলায় স্থায়ীভাবে বসবাসরত বাঙালি জনগোষ্ঠীর জন্য আয়কর অব্যাহতির সুযোগ নিশ্চিত করা। এ বিষয়ে সার্বভৌমত্ব সুরক্ষা পরিষদের প্রধান সমন্বয়ক মোঃ মোস্তফা আল ইহযায বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ওই অঞ্চলে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জন্য আয়কর অব্যাহতি সুবিধা চালু থাকলেও একই ভৌগোলিক এলাকায় বসবাসকারী বাঙালিরা এই সুযোগ থেকে বঞ্চিত। এটি একটি চরম বৈষম্য সৃষ্টি করেছে। তিনি উল্লেখ করেন, ১৯৮৪ সালের আয়কর অধ্যাদেশের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের লক্ষ্যে তাদের বিভিন্ন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে অর্জিত আয় করমুক্ত রাখার বিধান করা হয়েছিল। পরবর্তীতে আয়কর আইন, ২০২৩-এও সেই বিশেষ সুবিধা বহাল রাখা হয়। এমনকি ২০২৬ সালের ১০ জুন জাতীয় সংসদে উত্থাপিত অর্থবিলে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর বেতন ও আর্থিক সম্পদ থেকে অর্জিত আয় করযোগ্য করার প্রস্তাব করা হলেও ব্যবসা, কৃষি ও অন্যান্য আয়ের ক্ষেত্রে করমুক্ত সুবিধা বহাল রাখার প্রস্তাব দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ২৯ জুন জাতীয় সংসদে পার্বত্য অঞ্চলের সংসদ সদস্যদের অনুরোধের প্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর বেতন আয়কেও করমুক্ত রাখার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

মোস্তফা আল ইহযায ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, একই পরিবেশে এবং একই ভৌগোলিক এলাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস করেও বাঙালিরা আয়কর অব্যাহতির সুযোগ পাচ্ছে না, যার ফলে অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা এবং সামগ্রিক উন্নয়নে তারা পিছিয়ে পড়ছে। তিনি আরও দাবি করেন যে, পার্বত্য চট্টগ্রামের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫০.০৬ শতাংশ স্থানীয় বাঙালি হওয়া সত্ত্বেও তারা চাকরি, উচ্চশিক্ষা, বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প এবং অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত অংশীদারিত্ব থেকে বঞ্চিত। ১৯৯৭ সালের বিতর্কিত ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি’র পর ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিক্ষা, চাকরি এবং রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেলেও স্থানীয় বাঙালিদের সাংবিধানিক অধিকারগুলো উপেক্ষিত হচ্ছে।

আয়কর অব্যাহতির ফলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক বৈষম্যের একটি পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের এই সুবিধার কারণে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর একটি অংশ অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। উপজেলা ভিত্তিক পর্যালোচনায় দেখা গেছে, অন্তত ১০ থেকে ১৫ জন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ব্যক্তির বার্ষিক আয় এক কোটি টাকার বেশি। এছাড়া ৩০ থেকে ৪০ জনের আয় ৫০ থেকে ৯৯ লাখ টাকা, ৭০ থেকে ৮০ জনের আয় ২০ থেকে ৪৯ লাখ টাকা, প্রায় ১২০ থেকে ১৫০ জনের আয় ১১ থেকে ২০ লাখ টাকা, প্রায় ১৫০ থেকে ১৬০ জনের আয় ৫ থেকে ১০ লাখ টাকা এবং ২০০ জনের অধিক ব্যক্তির আয় ৩ থেকে ৪ লাখ টাকার মধ্যে। এই সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে এবং তারা আয়কর মওকুফের সুবিধা ভোগ করছেন। অন্যদিকে, একজন বাঙালি ঠিকাদারকে তার কাজের ধরন অনুযায়ী ৩.৫ শতাংশ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত আয়কর দিতে হয়, যা তাকে দরপত্রের ব্যয়ের সাথে যুক্ত করতে হয়। এর বিপরীতে আয়কর অব্যাহতির সুবিধাপ্রাপ্ত ঠিকাদারেরা অনেক কম দর দিতে পারেন, যা প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে একটি অসম পরিবেশ তৈরি করে।

অন্যদিকে, এডভোকেট পারভেজ তালুকদার তার বক্তব্যে পার্বত্য চট্টগ্রামের জেলা পরিষদে হস্তান্তরিত বিভাগসমূহের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির (১১-২০তম গ্রেড) চাকরিতে শতভাগ স্বচ্ছতা, দুর্নীতিমুক্ত পরিবেশ এবং মেধাভিত্তিক নিয়োগ নিশ্চিত করার দাবি জানান। একইসাথে তিনি পার্বত্য বাঙালি শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার জন্য পৃথক কোটা চালুর আহ্বান জানান।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে অধ্যাপক আশরাফ আলী আকন পার্বত্য অঞ্চলের কতিপয় উপজাতির ‘আদিবাসী’ দাবি করার পেছনে গভীর ভূ-রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ১৯৭২ সালে মিস্টার লারমা যে বিতর্ক তৈরি করে সশস্ত্র গেরিলা যুদ্ধের মাধ্যমে বিদ্রোহ করেছিলেন, তা দীর্ঘ আলোচনা প্রক্রিয়ার পর ১৯৯৭ সালে ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি’ স্বাক্ষরের মাধ্যমে অবসান ঘটে। তিনি স্পষ্টভাবে জানান, ওই চুক্তির ৭২টি ধারার মধ্যে নিজেদের পরিচয় হিসেবে অন্তত ৫০ বার ‘উপজাতি’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। তাই এখন এসে ‘আদিবাসী’ দাবি করা চরম স্ববিরোধিতা। ২০০৭ সালে জাতিসংঘের সনদ (UNDRIP) ঘোষণার পর থেকে ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায় এই নতুন বিতর্ককে পুনরায় চাঙ্গা করেছেন বলে তিনি দাবি করেন। অধ্যাপক আকন সতর্ক করে বলেন, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী ‘আদিবাসী’ স্বীকৃতি পেলে বিচ্ছিন্ন হওয়ার আইনি ভিত্তি তৈরির সুযোগ থাকে। তাই ‘আদিবাসী’ শব্দের আড়ালে সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় নিরাপত্তা বিনষ্টের কোনো অপচেষ্টা বরদাশত করা হবে না। দেশের অখণ্ডতা সুরক্ষায় সবাইকে ঐক্যবদ্ধ ও সচেতন থাকার আহ্বান জানান তিনি।

সমাবেশ শেষে উপস্থিত বিক্ষোভকারীরা শাহবাগের শহীদ হাদী চত্বর থেকে রাজু ভাস্কর্য পর্যন্ত একটি বিশাল বিক্ষোভ মিছিল করেন এবং তাদের দাবিগুলো সরকারের কাছে পৌঁছে দেওয়ার আহ্বান জানান।