ঢাকা শহরের উত্তর কাজীপাড়া ও শেওড়াপাড়াসহ সংলগ্ন এলাকায় তীব্র গ্যাস সংকটে চরম ভোগান্তির মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছেন সাধারণ মানুষ। রান্নাবান্না থেকে শুরু করে দৈনন্দিন মৌলিক প্রয়োজন মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন বাসিন্দারা। দীর্ঘদিনের এই সংকটের ফলে অনেকের জীবনযাত্রা প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে, কেউবা বাধ্য হয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বিকল্প উপায়ে রান্নার চেষ্টা করছেন।
উত্তর কাজীপাড়ার বাসিন্দা লিমা খাতুন এই সংকটের এক করুণ চিত্র তুলে ধরে বলেন, ‘কতবার যে পাকঘরে যাই আর আসি। যদি গ্যাস আসে, সেই আশায়। ১৫ দিন ধরে এই সমস্যা।’ স্বামী এবং ছোট দুই ছেলেসহ চার সদস্যের পরিবার লিমার। গ্যাস না থাকায় তাঁদের পুরো পরিবার এখন চরম ভোগান্তির মুখে। লিমা জানান, মাঝে মাঝে খুব ভোরে চুলায় সামান্য গ্যাস পাওয়া যায়। তখন তিনি তাড়াহুড়ো করে সারা দিনের রান্না শেষ করেন। কিন্তু ভোরে রান্না করা খাবার রাতে গিয়ে নষ্ট হয়ে যায়। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘প্রতি বেলা তো রান্না করা যায় না। এক বেলা রান্না করছি। বাসি-পচা খেতে হয়—এ রকম অবস্থা।’
লিমার সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার কারণ তাঁর পাঁচ বছর বয়সী ছেলে সিফাত। ঘরে খাবার না থাকায় বাধ্য হয়ে রেস্তোরাঁর খাবার খাওয়াতে হয়, যার ফলে সিফাত অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। নিরুপায় হয়ে লিমা এখন লাকড়ির চুলায় রান্না করছেন। লিমার এই কষ্টের কথা বলতে দেখে এগিয়ে আসেন তাঁর প্রতিবেশী শিল্পী। তিনি নিজের হাতের পোড়া ক্ষত দেখিয়ে জানান, টিনের বাক্স কেটে তৈরি একটি লাকড়ির চুলা কিনেছিলেন তিনি। কিন্তু সেই চুলায় রান্না করতে গিয়ে উত্তপ্ত টিনের ছ্যাঁকায় হাত পুড়ে গেছে তাঁর। শিল্পী বলেন, ‘দুইবার ডাক্তার দেখাইছি, সেটার খরচ। আবার ৫০০ টাকার ওষুধ লাগছে। আমগো তো আসলে এই চুলায় রান্ধনের অভ্যাস নাই।’ বর্তমানে তিনি দিনে মাত্র এক বেলা রান্না করতে পারেন। তবে বাজারে লাকড়ির সহজলভ্যতা নেই এবং একবার রান্নার জন্য প্রায় ১০০ টাকার লাকড়ি প্রয়োজন হয়, যা তাঁর জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই এলাকারই আরেক বাসিন্দা পপি হালদার বাধ্য হয়ে ছাদে ইট দিয়ে চুলা বানিয়ে রান্নার ব্যবস্থা করেছেন।
একই পরিস্থিতি পশ্চিম কাজীপাড়ার ভাড়া বাসায় বসবাসকারী আবু মুসার। এক সপ্তাহ ধরে তাঁর বাসায় কোনো গ্যাস নেই। স্বামী-স্ত্রী দুজনেই ছোট চাকরি করেন। প্রথম কয়েকদিন রেস্তোরাঁ থেকে খাবার কিনে খেয়েছেন তাঁরা, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তা সম্ভব হয়নি। মুসা বলেন, ‘বাইরে খাওয়া তো এক্সট্রা (বাড়তি) একটা খরচ; কুলানো যায় না। এখন একটা রাইস কুকার কিনছি।’
তদন্ত করে জানা গেছে, দেশে নিজস্ব খনি থেকে গ্যাস উত্তোলনের পাশাপাশি বিদেশ থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি করা হয়। এই এলএনজি রূপান্তর করে সরবরাহের জন্য কক্সবাজারের মহেশখালীতে দুটি ভাসমান টার্মিনাল রয়েছে। তবে মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালটিতে একটি অগ্নিদুর্ঘটনা ঘটার কারণে তা বর্তমানে বন্ধ রয়েছে। এর ফলে দেশে দৈনিক মোট গ্যাস সরবরাহ ২১৫ কোটি ঘনফুটে নেমে এসেছে, যা আবাসিক সংযোগ এবং শিল্পকারখানায় তীব্র সংকট তৈরি করেছে। টার্মিনালটি পুনরায় চালু হলে সরবরাহ ২৭০ কোটি ঘনফুটে পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে বাস্তব চিত্রটি আরও জটিল, কারণ দেশে দৈনিক গ্যাসের মোট চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট।
পশ্চিম শেওড়াপাড়ার তিন নম্বর গলিতে বসবাসকারী মোহাম্মদ ফোরকান একাই থাকেন। তাঁর অভিজ্ঞতায় গ্যাস সংকট আরও করুণ। তিনি বলেন, ‘ভোর চারটায় উঠে তাড়াতাড়ি করে চাল বসাই। অর্ধেক হইতেই গ্যাস নাই। সারা দিনে তো আর গ্যাসের খবর পাওয়া যায় না। আধা ফোটা চাল ফালাই (ফেলে) দিই।’ অনেক সময় তাঁকে চিড়া-কলা খেয়ে দিন কাটাতে হয়। ফোরকান আক্ষেপ করে বলেন, ‘দুপুরের খাবারটা মানুষ তৃপ্তি মতন খায়। সেই রান্নাটাই করতে পারি না। ডিমটা পর্যন্ত ভাজা যায় না।’
এই এলাকারই গৃহকর্মী পারভীন আখতার চারটি বাড়িতে রান্নার কাজ করেন। তিনি জানান, কোনো বাড়িতেই এখন গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। সময়ের স্বল্পতার কারণে অনেক গৃহস্থ এখন ইনডাকশন বা বৈদ্যুতিক চুলা ব্যবহার শুরু করেছেন। অন্যদিকে, সাইফুল-মালা দম্পতি গত দুই মাস ধরে গ্যাস সংকটে ভুগছেন। তাঁরা বাড়ির সামনে স্থায়ীভাবে লাকড়ির চুলা বসিয়েছেন। সাইফুল ইসলাম জানান, বর্তমানে মণ লাকড়ির দাম ৪০০-৫০০ টাকা, যা দিয়ে সাত দিনও রান্না করা সম্ভব হয় না।
পূর্ব শেওড়াপাড়ার শরীফা আক্তার তাঁর ছেলেকে নিয়ে বোতল হাতে খাওয়ার পানি সংগ্রহ করতে যাচ্ছিলেন। তিনি জানান, প্রায় ২০ দিন ধরে গ্যাস নেই। আগে চুলায় পানি ফুটিয়ে খেতেন, এখন তা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বাধ্য হয়ে তিনি দূর থেকে পানি সংগ্রহ করে আনেন এবং রান্নার জন্য গ্যাস সিলিন্ডার কিনেছেন। শরীফা বলেন, ‘এক বেলা রান্না করি। গরমও করতে পারি না, তরকারি নষ্ট হয়ে যায়। পানি ফুটাইতে পারি না, আইনা খাওয়া লাগে। বাচ্চারা সারা দিন এটা-ওটা খাইতে চায়, তাই সিলিন্ডার নিলাম; উপায় তো নাই।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এই এলাকার আরেক বাসিন্দা জানান, বাড়ির মালিক বাসায় লাকড়ির চুলায় রান্না করতে নিষেধ করেছেন। ফলে তাঁকে বাসার নিচ থেকে রান্না করে নিতে হয়। কখনো কখনো রাত তিনটার দিকে গ্যাসের দেখা মেলে, তখন তিনি রান্না শুরু করেন। তিনি বলেন, ‘গ্যাসের জন্য ঘুমেরও সমস্যা। মাঝরাতে রান্না করতে উঠি। তখন তো আর ঘুমানো যায় না।’
গ্যাস সংকটের সুযোগে বাজারে এলপিজি সিলিন্ডারের চাহিদা ব্যাপক বেড়েছে। পূর্ব কাজীপাড়ার দোকানি মো. হাবিব জানান, আগে দিনে ১০টি সিলিন্ডার বিক্রি হলে এখন তা বেড়ে ১৫টিতে দাঁড়িয়েছে। তবে পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় তিনি সরকারি দামে সিলিন্ডার দিতে পারছেন না। বর্তমানে ১২ কেজির সিলিন্ডার তিনি ১ হাজার ৬৫০ টাকায় বিক্রি করছেন।








