জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) ক্যাম্পাসে ছাত্রদল, জকসু প্রতিনিধি, ইনকিলাব মঞ্চ এবং ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে ভয়াবহ সংঘর্ষ ও চরম উত্তেজনার ঘটনা ঘটে। এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে ছাত্রদলের অতর্কিত হামলায় অন্তত ছয়জন সাংবাদিক গুরুতর আহত হয়েছেন। হামলায় সবচেয়ে গুরুতরভাবে আহত হয়েছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় প্রেসক্লাবের অর্থ সম্পাদক ও 'আজকালের খবর'-এর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি কামরুজ্জামান কায়েস।
মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া এবং চরম উত্তেজনার মধ্যে পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে এই সাংবাদিকরা হামলার শিকার হন। প্রত্যক্ষদর্শী ও আহতদের অভিযোগ, সংবাদ সংগ্রহের চেষ্টা করলে তাদের সরাসরি হুমকি দেওয়া হয় এবং বাধা প্রদান করা হয়। পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে যখন হামলাকারীরা বেশ কয়েকজন সাংবাদিকের মোবাইল ফোন জোরপূর্বক কেড়ে নেয় এবং তল্লাশি চালাতে শুরু করে। ক্যাম্পাসের পরিস্থিতি এতটাই অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে যে, প্রাণ বাঁচাতে অনেক সাংবাদিক নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন।
আহত সাংবাদিকদের তালিকায় রয়েছেন 'আজকালের খবর'-এর কামরুজ্জামান কায়েস, 'আমার সংবাদ'-এর আব্দুল্লাহ আল মামুন, 'ঢাকা স্ট্রিম'-এর রজব আল ফাহিম, 'বাংলা ট্রিবিউন'-এর সোহায়েল আহমেদ, 'প্রাইম বাংলাদেশ'-এর মোহন খন্দকার এবং আরও একজন সহকর্মী।
গুরুতর আহত কামরুজ্জামান কায়েসের চিকিৎসার প্রক্রিয়াটি ছিল অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। প্রথমে তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারে নেওয়া হলেও তার শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে। এরপর তাকে ঢাকা ন্যাশনাল হাসপাতালে স্থানান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়, কিন্তু অভিযোগ উঠেছে যে সেই পথযাত্রাতেও তাকে বাধার মুখে পড়তে হয়। পরবর্তীতে ন্যাশনাল হাসপাতাল থেকে তাকে মিটফোর্ড হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং সেখানকার চিকিৎসকদের পরামর্শে উন্নত চিকিৎসার জন্য দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (ঢামেক) স্থানান্তর করা হয়। বর্তমানে তিনি সেখানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
হামলার ভয়াবহতা বর্ণনা করে গুরুতর আহত সাংবাদিক কামরুজ্জামান কায়েস বলেন, “আমি একজন পেশাদার সাংবাদিক হিসেবে নিউজ কাভার করছিলাম। রফিক ভবনের সামনে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা স্লোগান দিচ্ছিল, আমি কেবল সেটি ভিডিওতে ধারণ করতে যাচ্ছিলাম। ঠিক তখনই ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক সুমন সর্দার আমাকে টেনে নিয়ে যায়। এরপর সে আমার মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেয় এবং আমাকে নির্মমভাবে মারধর শুরু করে। আমার মাথায় প্রচণ্ড আঘাত করা হয়। আমার একমাত্র ‘অপরাধ’ ছিল আমি আমার পেশাগত দায়িত্ব পালন করে সংবাদ সংগ্রহ করছিলাম।”
অন্যদিকে, দৈনিক মানবজমিনের আহত সাংবাদিক মামুন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “ক্যাম্পাসে নিউজ কভার করতে গিয়ে আমি এই বর্বরোচিত হামলার শিকার হয়েছি। নিজেকে সাংবাদিক হিসেবে পরিচয় দেওয়ার পরও আমাকে অকথ্য ভাষায় গালাগালি করা হয়েছে। তারা আমার মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে তল্লাশি চালিয়েছে, এমনকি আমার প্রেসকার্ডটিও ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে।”
‘আমার সংবাদ’-এর সাংবাদিক আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, “আমরা সেখানে কোনো নির্দিষ্ট পক্ষের হয়ে নয়, বরং নিরপেক্ষভাবে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়েছিলাম। কিন্তু আমরাই হামলার লক্ষ্যবস্তু হলাম। পরিচয়পত্র দেখানোর পরও আমাদের মারধর করা হয়েছে এবং আমাদের ফোন তল্লাশি করা হয়েছে।”
বাংলা ট্রিবিউনের সাংবাদিক সোহায়েল আহমেদ এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, “কয়েকজন মিলে আমাদের ঘিরে ধরে এলোপাতাড়ি মারধর করে। প্রেস কার্ড দেখানোর পরও তাদের আক্রমণ থামেনি। এটি গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর এক চরম আঘাত এবং সম্পূর্ণ পরিপন্থী। আমরা এমন একটি পরিবেশ চাই, যেখানে সাংবাদিকরা অন্তত ভয়ভীতিহীনভাবে এবং স্বাধীনভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করতে পারবেন।”
ঢাকা স্ট্রিমের সাংবাদিক রজব আল ফাহিম জানান, “ছাত্রদলের পক্ষ থেকে আমার ওপর অতর্কিত হামলা চালানো হয়। তারা লাঠি দিয়ে আমার মাথায়, পিঠে এবং ঘাড়ে এলোপাতাড়ি আঘাত করে।”
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, সংঘর্ষ চলাকালে সাংবাদিকরা যখন ছবি, ভিডিও এবং প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করছিলেন, তখনই পরিকল্পিতভাবে কিছু সাংবাদিককে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়। এই হামলায় তারা শারীরিক আঘাতের পাশাপাশি তাদের মূল্যবান মোবাইল ফোন ও সংবাদ সংগ্রহের সরঞ্জামাদিরও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
আহত সাংবাদিকদের প্রথমে ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হলেও অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাদের মিটফোর্ড এবং পরবর্তীতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।
এই ন্যাক্কারজনক ঘটনায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় প্রেসক্লাবের সদস্যরা গভীর উদ্বেগ ও তীব্র নিন্দা প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, সংবাদ সংগ্রহে নিয়োজিত সাংবাদিকদের ওপর এই ধরণের হামলা কেবল নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির ওপর আঘাত নয়, বরং এটি সামগ্রিকভাবে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর এক বড় ধরনের আঘাত। প্রেস ক্লাবের সদস্যরা অবিলম্বে হামলাকারীদের শনাক্ত করে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তারা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন যেন ক্যাম্পাসে দায়িত্ব পালনরত সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয় এবং স্বাধীনভাবে সংবাদ সংগ্রহের পরিবেশ ফিরিয়ে আনা হয়।








