বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। আজ শুক্রবার সন্ধ্যায় তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে রাষ্ট্রপতির শপথ গ্রহণ করবেন। এই বিশেষ মুহূর্তে নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিত্ব, তার জীবনদর্শন এবং চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে এক আবেগঘন ও বিশ্লেষণাত্মক লেখা লিখেছেন তার জামাতা ফাহাম আব্দুস সালাম।
ফাহাম আব্দুস সালামের বর্ণনায় মির্জা ফখরুল কেবল একজন রাজনৈতিক নেতা নন, বরং একজন অত্যন্ত দায়িত্বশীল ও নিঃস্বার্থ মানুষ। দীর্ঘ ২২ বছর খুব কাছ থেকে তাকে পর্যবেক্ষণ করার অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে ফাহাম লিখেছেন, মির্জা আলমগীরের মতো দায়িত্ববোধ সম্পন্ন মানুষ তিনি তার জীবনে খুব কম দেখেছেন। তিনি তাকে তুলনা করেছেন তার ক্যাডেট কলেজের শিক্ষক ছাদিক স্যারের সাথে, যার ব্যক্তিত্ব ও আদর্শের উচ্চতা কেবল তারাই বুঝবেন যারা তাকে ব্যক্তিগতভাবে চিনতেন।
মির্জা ফখরুলের জীবনের মূল চালিকাশক্তি হলো তার ‘বড় ভাইয়ের’ ভূমিকা। ফাহামের মতে, তার পুরো জীবনটিই যেন এই একটি বিশেষ চরিত্রের চারপাশে আবর্তিত। তিনি এমন একজন বড় ভাই, যিনি সাত ভাইবোনের জন্য ছয়টি চকলেট পেলে নিজেই একটিও না নিয়ে বাকি ছয়জনকে দিয়ে অত্যন্ত তৃপ্ত থাকেন। অন্যের জন্য সঠিক কাজ দ্রুত সম্পন্ন করার মধ্যেই তিনি প্রকৃত সন্তুষ্টি খুঁজে পান। এই সহজাত দায়িত্ববোধ তাকে সবসময় তাড়িত করে।
পাশ্চাত্য বিশ্বে, বিশেষ করে আমেরিকা ও খ্রিস্টান সংস্কৃতিতে ‘মেক ইয়োরসেলফ ইউজফুল’ বা নিজেকে প্রয়োজনীয় করে তোলার যে মূল্যবোধ রয়েছে, তা মির্জা ফখরুলের চরিত্রের গভীরে প্রোথিত। তিনি কখনোই অলসভাবে বসে থাকতে পারেন না; যেকোনো পরিস্থিতিতে নিজেকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করেন। ফাহাম একটি উদাহরণ দিয়ে জানান, ক্যানবেরায় ছুটিতে থাকাকালীনও তিনি বসে না থেকে ঘরের ঝাড়ু দেওয়ার মতো সাধারণ কাজ শুরু করে দিয়েছিলেন। তার এই কর্মতৎপরতা এবং অমায়িক ভদ্র আচরণই তার সাফল্যের মূল চাবিকাঠি বলে মনে করেন তার জামাতা।
রাজনীতির কঠিন সময়েও তার ব্যক্তিগত সংকল্প ছিল অটুট। ৫ই আগস্টের পরবর্তী সময়ে সিঙ্গাপুরে অবস্থানকালে মির্জা ফখরুল একান্তভাবে ফাহামকে জানিয়েছিলেন যে, তার জীবনের অন্যতম বড় লক্ষ্য ছিল ‘ম্যাডামকে’ (বেগম খালেদা জিয়া) মুক্ত করে ফিরিয়ে আনা। তার বিশ্বাস ছিল, নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে দেশ পুনরায় গণতন্ত্রের পথে ফিরে আসবে এবং তিনি এই লক্ষ্য অর্জনে আত্মতৃপ্ত ছিলেন। ম্যাডামকে মুক্ত করতে না পারার বিষয়টিকে তিনি ব্যক্তিগত ব্যর্থতা হিসেবে দেখতেন এবং অত্যন্ত আক্ষেপ করতেন।
ফাহাম আব্দুস সালামের দৃষ্টিতে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে মির্জা ফখরুলের মতো অনুগত এবং একনিষ্ঠ ‘সাহাবী’ পাওয়া অত্যন্ত কঠিন। তিনি নিজের ভালো বা মন্দ—সব পরিস্থিতিতেই নেত্রীর কথা আগে চিন্তা করেন এবং তার জন্য যেকোনো ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত থাকেন। এই নিঃস্বার্থ আনুগত্যের কথা উল্লেখ করে তিনি আক্ষেপ করে বলেন, বর্তমান সময়ে শিক্ষিত শ্রেণির মধ্যে স্বার্থপরতা বৃদ্ধি পাওয়ায় তারেক রহমানের জন্য এমন একজন অনুগত সহযোগী পাওয়া কঠিন হতে পারে।
বিএনপির অনেক তরুণ নেতাকর্মী মির্জা ফখরুলকে কেবল দলের মহাসচিব হিসেবে নয়, বরং ‘বাংলাদেশের মহাসচিব’ হিসেবে গণ্য করেন। এই আখ্যাটির পেছনে একটি গভীর সত্য রয়েছে। তিনি দলের স্বার্থের চেয়ে দেশের স্বার্থকে সবসময় ঊর্ধ্বে স্থান দিয়েছেন। তার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি সবার পছন্দ নাও হতে পারে, কিন্তু তিনি যা বিশ্বাস করেন, তা স্পষ্টভাবে বলেন এবং বাস্তবে তা চর্চা করার চেষ্টা করেন। বাংলাদেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটে শতভাগ গণতন্ত্র চর্চা কঠিন হলেও, তিনি সারাজীবন সেই লক্ষ্যেই কাজ করে গেছেন। গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রায় তিনি সবসময় সম্মুখ সারিতে দাঁড়িয়ে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
মির্জা ফখরুলের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়াকে ফাহাম একই সাথে আনন্দ এবং হতাশার সংমিশ্রণ হিসেবে দেখছেন। আনন্দ এই কারণে যে, জাতি এমন একজন মানুষকে অভিভাবক হিসেবে পেয়েছে যাকে সবাই শ্রদ্ধা করে। অন্যদিকে হতাশা এই কারণে যে, বিএনপির মতো দলের জন্য মির্জা ফখরুলের মতো একজন নিঃস্বার্থ নেতার অভাব অনুভূত হবে, যার রিপ্লেসমেন্ট খুঁজে পাওয়া প্রায় অসম্ভব। এছাড়া বঙ্গভবনের কঠোর নিয়মতান্ত্রিক জীবনের সীমাবদ্ধতা তাকে কষ্ট দিতে পারে বলে মনে করেন ফাহাম।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, মির্জা ফখরুলের এই জয় কেবল বিএনপির সমর্থকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। আওয়ামী লীগের সমর্থকসহ বহু মানুষ তাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। ফাহামের মতে, তার জীবদ্দশায় কোনো রাজনৈতিক নেতা এমন ব্যাপক এবং প্রকৃত দ্বিপক্ষীয় সমর্থন পান বলে মনে হয় না। তিনি কোনো মারদাঙ্গা রাজনীতিবিদ নন, খুব বেশি ধন-সম্পদের অধিকারী নন এবং দলের ভেতরে তার কোনো নিজস্ব গ্রুপ নেই।
পরিশেষে, যারা মনে করেন রাজনীতিতে সৎ ও ভালো মানুষের কোনো স্থান নেই, তাদের উদ্দেশ্যে শাকিব খানের স্টাইলে একটি কথা বলেছেন ফাহাম— ‘ইউ আর রং, টোটালি রং’। তিনি বিশ্বাস করেন, রাজনীতিতে সৎ মানুষের জায়গা অবশ্যই আছে, তবে তার জন্য প্রয়োজন ধৈর্য এবং দৃঢ় মনোবল।















