অনিয়মিত অভিবাসনের দায়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রত্যাবাসন: দেশে ফিরলেন ২৩ বাংলাদেশি
যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অভিবাসন নীতির মুখে স্বপ্নভঙ্গ হয়ে দেশে ফিরলেন ২৩ জন বাংলাদেশি নাগরিক। অনিয়মিত পথে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অভিযোগে মার্কিন প্রশাসনের বিশেষ অভিযানে তাদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার দিকে ওমনি এয়ারের বিশেষ ফ্লাইট (OAE2323)-এ তারা হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেন।
বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পরপরই তাদের প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানের উদ্যোগ নেয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। প্রবাসী কল্যাণ ডেস্ক এবং এভিয়েশন সিকিউরিটি (এভসেক)-এর বিশেষ সহযোগিতায় ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম তাদের তাৎক্ষণিক সহায়তা প্রদান করে। ফেরত আসা অভিবাসীদের মানসিক প্রশান্তি নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়ার পাশাপাশি তাদের নিজ নিজ গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার জন্য পরিবহন সহায়তাও প্রদান করা হয়।
ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, প্রত্যাবাসন করা ২৩ জনের মধ্যে সর্বোচ্চ ১৩ জন নোয়াখালীর বাসিন্দা। এছাড়া তিনজন সিলেটি এবং বাকিরা কক্সবাজার, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, মুন্সীগঞ্জ, কুমিল্লা, লক্ষ্মীপুর ও ঢাকা সহ বিভিন্ন জেলার বাসিন্দা। উন্নত জীবনের আশায় তারা দূর দেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত আইনি জটিলতায় তাদের দেশে ফিরতে হয়েছে।
ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক (মাইগ্রেশন ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্ম) শরিফুল হাসান জানান, প্রাথমিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই অভিবাসীদের অধিকাংশ দক্ষিণ ও মধ্য আমেরিকার অত্যন্ত দীর্ঘ, ব্যয়বহুল এবং ঝুঁকিপূর্ণ রুট ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেছিলেন। এই বিপজ্জনক যাত্রার জন্য জনপ্রতি প্রায় ৫০ থেকে ৬৫ লাখ টাকা ব্যয় করা হয়েছে। বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগের পর অভিবাসন সংক্রান্ত আইনি জটিলতায় পড়ে তাদের এই করুণ পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়েছে।
তদন্তে জানা গেছে, ফেরত আসা ব্যক্তিদের মধ্যে ২০ জন ব্রাজিল থেকে যাত্রা শুরু করে বলিভিয়া, পেরু, ইকুয়েডর, কলম্বিয়া, পানামা, কোস্টারিকা, নিকারাগুয়া, হন্ডুরাস ও গুয়াতেমালা হয়ে মেক্সিকো সীমান্ত অতিক্রম করে অবৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেন। এই দুঃসাহসিক ও কষ্টসাধ্য যাত্রায় তাদের প্রায় ১৩ থেকে ১৫টি দেশ বাস ও পায়ে হেঁটে অতিক্রম করতে হয়েছে। এছাড়া একজন দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ব্রাজিল হয়ে একই রুট ব্যবহার করেন এবং অপর একজন নিউইয়র্ক রুটে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেছিলেন।
ফেরত আসা ব্যক্তিদের ভাষ্য অনুযায়ী, ব্রাজিল রুট ব্যবহারকারীদের অনেকেই জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি)-এর ছাড়পত্র নিয়ে বৈধভাবে ব্রাজিলে গিয়েছিলেন। তবে পরবর্তীতে দালালচক্রের প্রলোভন ও সহায়তায় তারা অনিয়মিত পথে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের চেষ্টা করেন। অনেকে আবার ট্যুরিস্ট ভিসায় ব্রাজিলে প্রবেশ করে একই পথে যাত্রা করেন। যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানকালে কেউ কেউ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করলেও বৈধ অভিবাসনের শর্ত পূরণ করতে না পারায় তারা মার্কিন অভিবাসন কর্তৃপক্ষের নজরে আসেন।
মার্কিন আইন অনুযায়ী, বৈধ কাগজপত্র ছাড়া অবস্থানকারী অভিবাসীদের আদালতের রায় বা প্রশাসনিক আদেশের মাধ্যমে নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়। সাধারণত আশ্রয়ের আবেদন প্রত্যাখ্যাত হলে মার্কিন অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগকারী সংস্থা (ICE) প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা করে। ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর অনিয়মিত অভিবাসীদের বিরুদ্ধে অভিযান আরও কঠোর করা হয়েছে। এর ফলে চার্টার্ড ও বিশেষ ফ্লাইটে বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের প্রত্যাবাসনের হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। এর ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশিসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের দফায় দফায় নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হচ্ছে।











