চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের হেপাটোলজি বিভাগে প্রতি মাসে বহির্বিভাগে (আউটডোর) দুই শতাধিক রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন। তবে চিকিৎসকদের দেওয়া তথ্যে উঠে এসেছে এক উদ্বেগজনক চিত্র; চিকিৎসা নেওয়া রোগীদের মধ্যে প্রায় অর্ধেকের বয়স ২০ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে হেপাটাইটিস ‘বি’ সংক্রমণের হার আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা।

সম্প্রতি বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস উপলক্ষে চমেক হাসপাতালের হেপাটোলজি বিভাগের উদ্যোগে বিশেষ সচেতনতা ও স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। এই কর্মসূচির অংশ হিসেবে সোমবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত হেপাটোলজি ওয়ার্ডে শতাধিক রোগীর বিনামূল্যে হেপাটাইটিস স্ক্রিনিং করা হয়। এই পরীক্ষার মাধ্যমে তিনজনের শরীরে হেপাটাইটিস ‘বি’ ভাইরাস শনাক্ত করা হয়েছে এবং তাঁদের দ্রুত বিনামূল্যে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা প্রদান করা হয়েছে।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের জুলাই মাসে চমেক হাসপাতালে হেপাটোলজি বিভাগের অন্তর্বিভাগ চালু করা হয়। বর্তমানে এই বিভাগের অন্তর্বিভাগ ও বহির্বিভাগ মিলিয়ে হেপাটাইটিসসহ লিভারের বিভিন্ন জটিল রোগের চিকিৎসা প্রদান করা হচ্ছে। তবে সেবার মান ও সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে কিছু সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে। চমেক হাসপাতালের হেপাটোলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. আবদুল্লাহ আল মাহমুদ জানান, দেশে হেপাটাইটিসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ক্রমাগত বাড়লেও হাসপাতালের শয্যা সংখ্যা সেই তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল। বর্তমানে এই বিভাগে মাত্র ছয়টি শয্যার ব্যবস্থা রয়েছে, যা বিপুল সংখ্যক রোগীর চাপ সামলানোর জন্য যথেষ্ট নয়।

অধ্যাপক মাহমুদ আরও জানান, প্রতি মাসে বহির্বিভাগে গড়ে দুই শতাধিক রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। সপ্তাহে দুই দিন রোগী দেখার নির্ধারিত সময় থাকে এবং বাকি তিন দিন এন্ডোস্কোপি ও কোলোনোস্কোপিসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় ডায়াগনস্টিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। চিকিৎসকদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বহির্বিভাগে আসা রোগীদের প্রায় ৫০ শতাংশই ২০ থেকে ৪০ বছর বয়সী তরুণ ও মধ্যবয়সী মানুষ। রোগের ধরন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, রোগীদের প্রায় ৩০ শতাংশ হেপাটাইটিস ‘বি’, ২০ শতাংশ ফ্যাটি লিভার, ১০ শতাংশ লিভার সিরোসিস, ৪ শতাংশ লিভার ক্যানসার এবং ৩ শতাংশ হেপাটাইটিস ‘সি’তে আক্রান্ত।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, ২০০৩ সালে জাতীয় টিকাদান কর্মসূচিতে (ইপিআই) হেপাটাইটিস ‘বি’ টিকা অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর দেশে এই রোগের প্রকোপ ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে। ১৯৮৪ সালে দেশে হেপাটাইটিস ‘বি’ সংক্রমণের হার ছিল প্রায় ৯ দশমিক ৭ শতাংশ, যা বর্তমানে কমে ৫ দশমিক ১ শতাংশে নেমে এসেছে। তবে মোট আক্রান্তের সংখ্যা এখনো অনেক বেশি। ২০১৮ সালের এক গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রায় ৮৫ লাখ মানুষ হেপাটাইটিস ‘বি’ ভাইরাসে আক্রান্ত। এর মধ্যে পুরুষের সংখ্যা প্রায় ৫৭ লাখ এবং নারীর সংখ্যা ২৮ লাখ। এছাড়া প্রায় চার লাখ শিশু এই ভাইরাসের শিকার।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, কর্মক্ষম ১৫ থেকে ৩০ বছর বয়সী প্রায় ২৫ লাখ মানুষ এবং প্রজননক্ষম ১৮ থেকে ৪৫ বছর বয়সী প্রায় ১৮ লাখ নারী হেপাটাইটিস ‘বি’ ভাইরাস বহন করছেন, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ঝুঁকির কারণ হতে পারে। চিকিৎসকেরা সতর্ক করে জানিয়েছেন, লিভারের জন্য হেপাটাইটিস ‘সি’ ভাইরাসটিও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। লিভার সিরোসিসের প্রায় ৩০ শতাংশ এবং লিভার ক্যানসারের প্রায় ১৭ শতাংশ ক্ষেত্রে এই ভাইরাসটি দায়ী। দেশে সাধারণ জনগণের মধ্যে হেপাটাইটিস ‘সি’ সংক্রমণের হার শূন্য দশমিক ২ থেকে ১ শতাংশের মধ্যে এবং আক্রান্তদের অধিকাংশেরই বয়স ২৮ বছরের বেশি।