১৩৪ কোটির প্রকল্পে উটপাখির করুণ দশা: গবেষণার নামে জবাই ১৫টি পাখি
দেশের পশুপাখির বৈচিত্র্য বৃদ্ধি এবং গরু-খাসির বিকল্প হিসেবে মাংসের নতুন উৎস খোঁজার লক্ষ্যে এক বিশাল অংকের গবেষণা প্রকল্প হাতে নিয়েছিল বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএলআরআই)। প্রায় ১৩৪ কোটি টাকার এই ব্যয়বহুল প্রকল্পের আওতায় আফ্রিকা থেকে আনা ২২টি উটপাখির বর্তমান অবস্থা এখন চরম হতাশাজনক। অভিযোগ উঠেছে, গবেষণার নামে এই ২২টি পাখির মধ্যে ১৫টিকেই জবাই করা হয়েছে এবং আরও তিনটি মারা গেছে। বর্তমানে প্রকল্পের অধীনে মাত্র চারটি উটপাখি অবশিষ্ট রয়েছে, যদিও সংরক্ষিত শেডে নিয়মিত পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে সংখ্যাটি আরও কম, মাত্র দুটি।
ঘটনার সূত্রপাত ২০১৯-২০ অর্থবছরে, যখন বিএলআরআই ‘পোলট্রি গবেষণা ও উন্নয়ন জোরদারকরণ প্রকল্প’ শুরু করে। এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ছিল দেশীয় পোলট্রি প্রজাতির গুণগত মান উন্নয়ন, নতুন প্রযুক্তির উদ্ভাবন এবং সেই প্রযুক্তি খামারিদের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া। তবে প্রকল্পের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ ছিল গরু ও খাসির মাংসের বিকল্প হিসেবে উটপাখিকে পরিচিত করা। আফ্রিকার পরিবেশ থেকে উটপাখি এনে বাংলাদেশের আবহাওয়ায় তাদের মানিয়ে নেওয়া এবং ভবিষ্যতে বাণিজ্যিকভাবে খামার সম্প্রসারণের একটি দীর্ঘমেয়াদি পথ তৈরি করার পরিকল্পনা ছিল এতে। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে দুই দফায় মোট ২২টি উটপাখি আমদানি করা হয়। প্রথম দফায় ২০২০ সালে আনা হয় সাতটি পাখি, এবং পরবর্তীতে অধিকতর গবেষণার প্রয়োজনে আরও ১৫টি অপ্রাপ্তবয়স্ক উটপাখি দেশে আনা হয়।
এই পুরো গবেষণা প্রকল্পের পরিচালনার দায়িত্ব ছিল প্রতিষ্ঠানটির প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. সাজেদুল করিম সরকারের ওপর। প্রকল্পের শুরুর দিকে তিনি অত্যন্ত আশাবাদী ছিলেন এবং দাবি করেছিলেন যে, আফ্রিকার এই প্রাণীগুলো বাংলাদেশের আবহাওয়ার সাথে খুব সহজেই খাপ খাইয়ে নিতে পারবে। তিনি জানান, একটি প্রাপ্তবয়স্ক উটপাখির ওজন ১০০ থেকে ১৫০ কেজির মতো হতে পারে এবং এরা আড়াই বছর বয়সে ডিম দেওয়া শুরু করে। বছরে গড়ে ২০ থেকে ২৫টি ডিম দেয় এই পাখি। তার হিসাব অনুযায়ী, একটি উটপাখি দিয়ে অন্তত দুটি দেশীয় গরুর সমান মাংসের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব। শুধু তাই নয়, খুব দ্রুত বাণিজ্যিকভাবে এই মাংস বাজারজাত করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলেন তিনি।
কিন্তু ছয় বছর পর সেই প্রতিশ্রুতির সাথে বাস্তবতার কোনো মিল পাওয়া যাচ্ছে না। বিএলআরআই-এর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আমদানিকৃত ২২টি উটপাখির মধ্যে ১৫টিকেই জবাই করা হয়েছে। কর্তৃপক্ষ বলছে, মাংসের গুণগত মান এবং স্বাদ পরীক্ষার জন্য (সেন্সরি ইভ্যালুয়েশন) এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। আর তিনটি পাখি অসুস্থ হয়ে মারা গেছে। এখন প্রশ্ন উঠেছে, যে গবেষণার মূল উদ্দেশ্য ছিল একটি নতুন প্রাণীকে বাংলাদেশের পরিবেশে অভিযোজিত করা এবং দীর্ঘমেয়াদি খামার গড়ে তোলা, সেখানে অধিকাংশ প্রাণীকে গবেষণার মাঝপথেই জবাই করে ফেললে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণার ভিত্তি কোথায় থাকে? বিশেষজ্ঞগণ এই সিদ্ধান্তের নৈতিকতা এবং যৌক্তিকতা নিয়ে গভীর সংশয় প্রকাশ করেছেন।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও বন্যপ্রাণী গবেষক ড. কামরুল হাসান এই বিষয়ে বলেন, ‘দেশের আবহাওয়ায় উটপাখি পালন এবং নতুন জাত উদ্ভাবনের চিন্তাটি ছিল অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী এবং ইতিবাচক। তবে মনে রাখতে হবে, উটপাখি আমাদের দেশের সহজাত প্রাণী নয়। ফলে এদের ডিম থেকে বাচ্চা ফুটানো বা মাংসের চাহিদা মেটানো বেশ কষ্টসাধ্য কাজ। গবেষণার প্রয়োজনে কিছু প্রাণী জবাই করার প্রয়োজন হতে পারে, কিন্তু মোট ২২টির মধ্যে ১৫টি জবাই করার সিদ্ধান্ত কতটা যৌক্তিক ছিল, তা নিয়ে বড় প্রশ্ন রয়েছে।’
অন্যদিকে, ড. সাজেদুল করিম সরকারের অধীনে উটপাখি নিয়ে পিএইচডি সম্পন্ন করা হাজী দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী খন্দকার তৌহিদুল ইসলাম ভিন্ন মত পোষণ করেন। তিনি বলেন, ‘গবেষণা মানেই যে সব সময় সফল হবে, তা নয়। এখানে ব্যর্থতার সম্ভাবনাও থাকে। যেহেতু উটপাখি আমাদের দেশের প্রাণী নয়, তাই এখানে সফল হতে হলে অনেক ধাপে কাজ করতে হবে। একবারের প্রচেষ্টায় সফলতা আসা কঠিন।’ ১৫টি পাখি জবাইয়ের বিষয়ে তিনি জানান, মাংসের স্বাদ পরীক্ষার জন্য এটি করা হয়েছে এবং বিস্তারিত তথ্যের জন্য ড. সাজেদুল করিম সরকারের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ করেন।
এই বিতর্কিত বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলতে একাধিকবার ড. সাজেদুল করিম সরকারের অফিসে যাওয়া হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। এমনকি তার মুঠোফোন বা হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও কোনো সাড়া মেলেনি। তবে বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাময়িক দায়িত্বপ্রাপ্ত মহাপরিচালক ড. শাকিলা ফারুক বিষয়গুলো স্বীকার করেছেন। তিনি জানান, উটপাখিদের খাদ্য অভ্যাস, পরিবেশগত মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা এবং মাংসের স্বাদ যাচাই করার জন্য কিছু পাখি জবাই করা হয়েছে। যেহেতু এটি দেশীয় পাখি নয়, তাই সুফল পেতে আরও সময়ের প্রয়োজন বলে তিনি দাবি করেন।
উল্লেখ্য, বিএলআরআই-এর এই বিতর্ক কেবল উটপাখির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ২০২৩ সালে গবেষণাধীন ৩৮টি মোরগ জবাই করে খেয়ে ফেলার অভিযোগও সামনে এসেছে। যদিও তৎকালীন সময়ে কর্তৃপক্ষ দাবি করেছিল যে, মোরগগুলো চুরি হয়ে গেছে। এই ঘটনায় তদন্ত হলেও সেই প্রতিবেদনের কোনো প্রকাশ ঘটেনি। এসব অনিয়মের বিষয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকুর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। তিনি জানান, বিএলআরআই-তে যেসব অনিয়ম সামনে এসেছে, তা নিয়ে ইতিমধ্যে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং উটপাখির এই ঘটনাটিও তদন্ত করে রিপোর্ট প্রকাশ করা হবে।











