পেটে তীব্র যন্ত্রণার সাধারণ লক্ষণগুলোর আড়ালে লুকিয়ে থাকতে পারে প্যানক্রিয়াটাইটিসের মতো অত্যন্ত জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ রোগ। অনেক সময় আমরা পেটে ব্যথাকে সাধারণ গ্যাস্ট্রিক বা বদহজমের সমস্যা মনে করে এড়িয়ে যাই, কিন্তু সচেতনতা ও সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় না হলে এই সমস্যা জীবনহানিকর হয়ে উঠতে পারে। তাই শরীরের এই সংকেতগুলো বুঝতে পারা এবং সঠিক চিকিৎসা নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

প্যানক্রিয়াটাইটিস আসলে কী?
প্যানক্রিয়াস শব্দটি গ্রিক শব্দ থেকে এসেছে, যার আক্ষরিক অর্থ হলো ‘অল ফ্লেশ’ বা সম্পূর্ণ মাংসল। মানবদেহের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অঙ্গ হলো প্যানক্রিয়াস, যাকে বাংলায় আমরা অগ্ন্যাশয় বলে থাকি। অগ্ন্যাশয়ের প্রধানত দুটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ রয়েছে। প্রথমত, এটি পাচক রস বা এনজ়াইম তৈরি করে, যা আমাদের গ্রহণ করা খাবার হজম করতে সরাসরি সাহায্য করে। বিশেষ করে শর্করা, আমিষ এবং স্নেহজাতীয়—এই তিন ধরনের খাবার হজম করার জন্য প্রয়োজনীয় উৎসেচক অগ্ন্যাশয়েই তৈরি হয়। এই প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত অংশটিকে বলা হয় এক্সোক্রিন প্যানক্রিয়াস। প্যানক্রিয়াস কিছু বিশেষ ডাক্টের বা নালীর মাধ্যমে অন্ত্রের (ইনটেস্টাইন) সঙ্গে সংযুক্ত থাকে, যার মাধ্যমে তৈরি হওয়া পাচক রস অন্ত্রে পৌঁছায় এবং হজম প্রক্রিয়া শুরু হয়।

অগ্ন্যাশয়ের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো ইনসুলিন তৈরি করা, যা রক্তে শর্করার মাত্রা বা ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রণ করে। এই হরমোন নিঃসরণকারী অংশটিকে বলা হয় এন্ডোাক্রিন প্যানক্রিয়াস। স্বাভাবিক অবস্থায় পাচক রস বা এনজ়াইমগুলো অগ্ন্যাশয়ে নিষ্ক্রিয় অবস্থায় থাকে এবং অন্ত্রে পৌঁছানোর পর সক্রিয় হয়ে খাবার হজম করে। কিন্তু কোনো বিশেষ কারণে যদি এই এনজ়াইমগুলো অগ্ন্যাশয়ে থাকা অবস্থাতেই সক্রিয় হয়ে ওঠে, তবে তা অত্যন্ত বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়ায়। কারণ সক্রিয় এনজ়াইমগুলো তখন বাইরের খাবার হজম করার বদলে স্বয়ং অগ্ন্যাশয় গ্রন্থিকেই হজম করতে শুরু করে। এই প্রক্রিয়ার ফলে শরীরে ইনফ্ল্যামেটরি মিডিয়েটর নিঃসৃত হয়, যা তীব্র প্রদাহ সৃষ্টি করে। অগ্ন্যাশয়ের এই অস্বাভাবিক প্রদাহকেই চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় প্যানক্রিয়াটাইটিস বলা হয়।

প্যানক্রিয়াটাইটিসের ধরন ও কারণসমূহ
প্যানক্রিয়াটাইটিস প্রধানত দুই ধরনের হয়ে থাকে। একটি হলো অ্যাকিউট প্যানক্রিয়াটাইটিস, যা হঠাৎ করে তীব্রভাবে দেখা দেয়। আর অন্যটি হলো ক্রনিক প্যানক্রিয়াটাইটিস, যা দীর্ঘমেয়াদী এবং ধীরগতিতে অগ্রসর হয়।

অ্যাকিউট প্যানক্রিয়াটাইটিসের পেছনে বেশ কিছু কারণ থাকতে পারে। চিকিৎসকদের মতে, এর প্রধান কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো পিত্তনালিতে পাথরের উপস্থিতি এবং অতিরিক্ত মদ্যপান। সাধারণত দেখা যায়, পিত্তনালির পাথরের কারণে নারীদের মধ্যে এই রোগের ঝুঁকি বেশি থাকে, অন্যদিকে পুরুষদের ক্ষেত্রে মদ্যপানের প্রভাব বেশি দেখা যায়। এছাড়া রক্তে লিপিড বা ক্যালসিয়ামের মাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে অথবা অগ্ন্যাশয়ে কোনো ধরনের বাহ্যিক আঘাত লাগলে এই রোগ হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, ভাইরাল ইনফেকশন কিংবা বিশেষ কিছু অস্ত্রোপচারের পরবর্তী জটিলতা হিসেবেও এই প্রদাহ দেখা দেয়। এছাড়া জিনগত কারণ বা অজানা কোনো কারণেও অ্যাকিউট প্যানক্রিয়াটাইটিস হতে পারে।

অন্যদিকে, ক্রনিক প্যানক্রিয়াটাইটিসের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের মদ্যপান সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়। এছাড়া যদি কোনো কারণে প্যানক্রিয়াসের ডাক্ট বা নালীগুলো ব্লক হয়ে যায়, তবে পাচক রস অন্ত্রে পৌঁছাতে পারে না, যা ধীরে ধীরে ক্রনিক প্যানক্রিয়াটাইটিসে রূপ নেয়।

লক্ষণসমূহ
অ্যাকিউট প্যানক্রিয়াটাইটিসের প্রধান লক্ষণ হলো পেটে তীব্র ও অসহ্য যন্ত্রণা। এই ব্যথা সাধারণত পেটের উপরের অংশ থেকে শুরু হয়ে ক্রমশ পুরো পেট এবং পিঠের শিরদাঁড়া পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে এই ব্যথা বুকের দিকেও অনুভূত হতে পারে এবং তীব্র ব্যথার সাথে সাথে রোগীর বমি বমি ভাব বা বমি হতে পারে। গ্যাস্ট্রোএন্ট্রোলজিস্টদের মতে, প্যানক্রিয়াটাইটিসের ব্যথা এতটাই তীব্র হয় যে খুব কম অসুখেই এমন অনুভূতি হয়। কেবল অন্ত্রে রক্ত সরবরাহ বন্ধ হয়ে অন্ত্র মৃত হয়ে পড়লে (বোয়েল ইসকেমিয়া) এই ধরনের মারাত্মক যন্ত্রণা দেখা দিতে পারে।

ক্রনিক প্যানক্রিয়াটাইটিসের লক্ষণগুলো কিছুটা ভিন্ন। এতে ঘন ঘন পেটে ব্যথা হয়, খাবার হজম হতে সমস্যা হয় এবং ধীরে ধীরে শরীরের ওজন কমতে থাকে। যেহেতু অগ্ন্যাশয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাই রোগীর ডায়াবিটিস হয়ে যাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা থাকে। অন্ত্রে পর্যাপ্ত পাচক রস না পৌঁছানোর ফলে প্রোটিন বা ফ্যাটজাতীয় খাবার খাওয়ার পর পেটের সমস্যা শুরু হয় এবং বারবার পাতলা পায়খানা বা স্টুল হতে থাকে।

জটিলতা ও ঝুঁকি
প্যানক্রিয়াটাইটিস থেকে শরীরের মারাত্মক সব জটিলতা তৈরি হতে পারে। অগ্ন্যাশয় ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেখানে পাচক রস জমে সমস্যা তৈরি করে। সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো ‘সিস্টেম অফ ইনফ্ল্যামেটরি রেসপন্স সিনড্রোম’ বা এসআইআরএস (SIRS)। এই অবস্থায় শরীরের রক্তনালীগুলো রক্ত বা ফ্লুয়িড ধরে রাখার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে এবং লিক করতে শুরু করে। এই ফ্লুয়িড টিসুতে জমে গেলে রোগীর শরীরে ‘শক’ তৈরি হয়, যা প্রাথমিক পর্যায়েই প্রাণহানির কারণ হতে পারে।

অ্যাকিউট প্যানক্রিয়াটাইটিসকে তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়—মাইল্ড, মডারেট এবং সিভিয়র। প্রায় ৯০ শতাংশ রোগী মাইল্ড বা মডারেট পর্যায়ে থাকেন। তবে ১০ শতাংশ রোগীর ক্ষেত্রে সিভিয়র প্যানক্রিয়াটাইটিস হয়, যেখানে মৃত্যুর ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। রক্তনালী থেকে ফ্লুয়িড বেরিয়ে যাওয়ায় রক্ত সঞ্চালনে ঘাটতি দেখা দেয় এবং এসআইআরএস-এর প্রভাবে হৃৎপিণ্ড, ফুসফুস, কিডনি, লিভার এবং ব্রেনের মতো প্রধান পাঁচটি অঙ্গ ধীরে ধীরে বিকল হতে পারে। এছাড়া পিত্তনালী সরু হয়ে জন্ডিস হওয়া এবং দীর্ঘমেয়াদী ক্রনিক প্যানক্রিয়াটাইটিসের ক্ষেত্রে অগ্ন্যাশয়ে ক্যানসার হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও রোগ নির্ণয়
এই রোগ শনাক্ত করতে রক্তে অ্যামাইলেজ় এবং লাইপেজ় এনজ়াইমের মাত্রা পরীক্ষা করা হয়। এছাড়া মূত্রে অ্যামাইলেজ়ের পরিমাণ যাচাই করা হয়। রোগীর সামগ্রিক অবস্থা বুঝতে রক্তের সার্বিক পরীক্ষা (CBC), ব্লাড সুগার, ক্যালসিয়াম, ক্রিয়েটিনিন এবং লিভার এনজাইমের (ALT, AST) মাত্রা দেখা হয়। অগ্ন্যাশয়ের গাঠনিক অবস্থা এবং প্রদাহের extent বোঝার জন্য আল্ট্রাসনোগ্রাম এবং সিটি স্ক্যান করা হয়।

চিকিৎসা পদ্ধতি
অগ্ন্যাশয়ের হঠাৎ প্রদাহ বা অ্যাকিউট প্যানক্রিয়াটাইটিস একটি মেডিকেল ইমার্জেন্সি। তাই রোগীকে যত দ্রুত সম্ভব হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা শুরু করতে হবে। চিকিৎসকদের পরামর্শ হলো, এমন হাসপাতালে ভর্তি হওয়া যেখানে আইসিইউ (ICU) বা সিসিইউ (CCU) সুবিধা রয়েছে। কারণ এই সময়ে হঠাৎ অঙ্গ বিকল হওয়া বা তীব্র শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যা দেখা দিতে পারে, যার জন্য বিশেষ পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন হয়। যদি পিত্তনালির পাথরের কারণে এই রোগ হয়ে থাকে, তবে অস্ত্রোপচার বাধ্যতামূলক। তবে মনে রাখতে হবে, প্রথমে প্যানক্রিয়াটাইটিসের প্রদাহ কমিয়ে রোগীকে স্থিতিশীল করতে হবে এবং এরপর বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নিতে হবে।