দৈনন্দিন জীবনে অনেকেরই হঠাৎ এমন অনুভূতি হয় যে চারপাশের সবকিছু যেন ঘুরছে। এর পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকতে কষ্ট হওয়া, কান বন্ধ হয়ে আসা কিংবা কানে ভোঁ ভোঁ শব্দ হওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দেয়। সাধারণত আমরা এই পরিস্থিতিগুলোকে ক্লান্তি, শারীরিক দুর্বলতা, পানিশূন্যতা কিংবা দীর্ঘক্ষণ না খেয়ে থাকার ফল বলে ধরে নিই এবং বিষয়টিকে গুরুত্ব না দিয়ে এড়িয়ে যাই। তবে চিকিৎসকদের মতে, মাথা ঘোরার সঙ্গে যদি কানে চাপ অনুভূত হওয়া, কান বন্ধ হয়ে যাওয়া, অস্বাভাবিক শব্দ শোনা কিংবা হঠাৎ শ্রবণশক্তি কমে যাওয়ার মতো লক্ষণগুলো যোগ হয়, তবে তা মোটেও সাধারণ বিষয় নয়। বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখা প্রয়োজন।
টাইমস অব ইন্ডিয়ার এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে যে, শরীরের ভারসাম্য রক্ষা এবং শ্রবণশক্তির সঙ্গে আমাদের কানের ভেতরের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। কানের এই অভ্যন্তরীণ অংশে কোনো ধরনের সমস্যা দেখা দিলে একই সঙ্গে মাথা ঘোরা এবং কানের বিভিন্ন উপসর্গ প্রকট হতে পারে। এই বিষয়ে বিশেষজ্ঞ কনসালট্যান্ট ডা. অনন্ত চিন্তাপল্লির মতে, মাথা ঘোরার সমস্যাকে কখনোই হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়। তবে মনে রাখতে হবে, সব ধরনের মাথা ঘোরাই 'ভার্টিগো' নয়। সাধারণ দুর্বলতা বা রক্তচাপ কমে গেলে অনেকের মনে হতে পারে মাথা হালকা হয়ে যাচ্ছে অথবা তারা পড়ে যাবেন। অন্যদিকে, ভার্টিগোর ক্ষেত্রে সাধারণত রোগী অনুভব করেন যে তিনি নিজে অথবা তার চারপাশের ঘর, দেয়ালসহ সবকিছু বনবন করে ঘুরছে।
কানের ভেতরের ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণকারী অংশটি আমাদের শরীরের নড়াচড়া ও অবস্থান সম্পর্কে মস্তিষ্ককে নিরন্তর তথ্য পাঠায়। ঠিক এই কানের ভেতরেই রয়েছে 'ককলিয়া', যা শ্রবণশক্তির জন্য অপরিহার্য। এই বিশেষ গঠনগত অবস্থানের কারণেই কানের ভেতরে কোনো সমস্যা দেখা দিলে ভারসাম্য এবং শ্রবণশক্তি—উভয় ক্ষেত্রেই জটিলতা তৈরি হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অন ডেফনেস অ্যান্ড আদার কমিউনিকেশন ডিজঅর্ডারের তথ্য অনুযায়ী, ভারসাম্যজনিত সমস্যার কারণে ভার্টিগোর পাশাপাশি বমি বমি ভাব, দৃষ্টিতে ঝাপসা ভাব এবং স্বাভাবিক কাজকর্মে চরম অসুবিধার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, ভার্টিগোর সঙ্গে কানে অস্বস্তি বা শ্রবণশক্তির পরিবর্তন হলে তা গভীর উদ্বেগের কারণ হতে পারে। কানে চাপ অনুভব করা, কান বন্ধ বন্ধ লাগা, ভোঁ ভোঁ শব্দ বা 'টিনিটাস', শব্দ অস্পষ্ট শোনা কিংবা শ্রবণশক্তির ওঠানামা কানের ভেতরের বিভিন্ন জটিল সমস্যার সংকেত হতে পারে। এর একটি অন্যতম সম্ভাব্য কারণ হলো 'মেনিয়ার রোগ'। এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা বারবার ভার্টিগোর আক্রমণের শিকার হন এবং এর পাশাপাশি কানে শব্দ হওয়া, শ্রবণশক্তি কমে যাওয়া ও কানে প্রচণ্ড চাপের অনুভূতি অনুভব করেন। ডা. অনন্ত চিন্তাপল্লির মতে, বারবার মাথা ঘোরার সঙ্গে কানে ভারি লাগা এবং শ্রবণশক্তির অস্থিরতা থাকলে মেনিয়ার ডিজিজের সম্ভাবনা থাকে, যদিও কেবল এই লক্ষণগুলো থাকলেই যে রোগটি নিশ্চিত, তা নয়।
মাথা ঘোরার পেছনে আরও অনেক কারণ থাকতে পারে। যেমন, কানের ভেতরে প্রদাহ হলে 'ল্যাবিরিন্থাইটিস' নামের সমস্যা দেখা দিতে পারে, যার ফলে মাথা ঘোরা এবং শরীরের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার মতো উপসর্গ তৈরি হয়। এছাড়া 'ভেস্টিবুলার মাইগ্রেন' থেকেও ভার্টিগো হতে পারে। কানের ভেতরের কিছু বিশেষ সমস্যাতেও চাপ বা বন্ধভাব অনুভূত হতে পারে। তাই কেবল মাথা ঘোরার ওষুধ খেয়ে সমস্যার সমাধান করতে চাওয়া ভুল; বরং কেন মাথা ঘুরছে, তার মূল কারণ খুঁজে বের করা জরুরি।
সবচেয়ে বড় সতর্কসংকেত হলো হঠাৎ শ্রবণশক্তি কমে যাওয়া, বিশেষ করে যদি এটি কেবল এক কানে ঘটে। কয়েক ঘণ্টা থেকে কয়েক দিনের মধ্যে হঠাৎ এমনটি হতে পারে। এর সঙ্গে মাথা ঘোরা, কানে ভোঁ ভোঁ শব্দ কিংবা কান বন্ধ লাগার অনুভূতি থাকতে পারে। অনেক সময় মানুষ একে কানের ময়লা জমা, ঠাণ্ডা লাগা বা সাধারণ সমস্যা মনে করে অবহেলা করেন। কিন্তু হঠাৎ শ্রবণশক্তি হ্রাস পাওয়া একটি জরুরি অবস্থা, যার জন্য দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এক কানে হঠাৎ কম শুনলে তা কখনোই ফেলে রাখা উচিত নয়। মাথা ঘোরার পাশাপাশি কান বন্ধ হলে দেরি না করে একজন নাক-কান-গলা (ENT) বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হতে হবে। প্রয়োজনীয় পরীক্ষার মাধ্যমে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সঠিক রোগ নির্ণয় করে যথাযথ চিকিৎসা প্রদান করবেন। সব সমস্যাকে সাধারণ ভেবে বসে থাকলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের বিপদ হতে পারে, তাই সময়মতো সঠিক চিকিৎসা গ্রহণ করাই বুদ্ধিমানের কাজ।
















