দেশে সারের কোনো সংকট নেই, বরং প্রতিবছর চাহিদার তুলনায় ১৫ লাখ টন অতিরিক্ত সার আমদানি করা হচ্ছে। তা সত্ত্বেও একটি অসাধু মহল পরিকল্পিতভাবে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে সারের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এই হুঁশিয়ারি দিয়েছেন কৃষি এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ। তিনি স্পষ্টভাবে জানান, সারের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে উচ্চমূল্যে বিক্রি করলে সংশ্লিষ্ট ডিলার এবং খুচরা বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

আজ শনিবার (২৯ আগস্ট) দুপুরে ফরিদপুর জেলা প্রশাসকের সম্মেলনকক্ষে কৃষি ও মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে মন্ত্রী এসব কথা বলেন। সভায় কৃষকদের স্বার্থ রক্ষায় সরকারের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে তিনি বলেন, ‘বর্তমান সরকার একটি প্রকৃত কৃষিবান্ধব সরকার। কৃষকের সামগ্রিক উন্নতির জন্য যা কিছু প্রয়োজন, সরকার তা নিশ্চিত করবে। কারণ কৃষকের উন্নতি মানেই দেশের সামগ্রিক অগ্রগতি।’

সারের কৃত্রিম সংকট প্রসঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করতে গিয়ে কৃষিমন্ত্রী বলেন, দেশের মোট চাহিদার তুলনায় প্রতি বছর ১৫ লাখ টন বেশি সার আমদানি করা হয়। ফলে দেশে সারের অভাব হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ও দুষ্কৃতকারী পরিকল্পিতভাবে বাজারে সারের সংকট তৈরি করে দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, কিছু খুচরা সার বিক্রেতা বাজারে সার নেই বলে প্রচারণা চালাচ্ছেন, অথচ অতিরিক্ত টাকা দিলেই তারা আবার সার সরবরাহ করছেন। তাহলে প্রশ্ন জাগে, সংকট আসলে কোথায়? অতি লোভী কিছু মানুষের এই কারসাজির কারণে সাধারণ কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এই ধরনের অসাধু কর্মকাণ্ড বন্ধ করতে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে তিনি সতর্ক করেন।

জেলার সার ডিলারদের প্রতি বিশেষ নির্দেশনা দিয়ে মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, কোনো ডিলার যদি তার বরাদ্দের সার সময়মতো উত্তোলন না করেন, তবে তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কৃষকদের কাছে সঠিক সময়ে এবং সরকারি নির্ধারিত দামে সার পৌঁছে দেওয়া ডিলারদের প্রধান দায়িত্ব, এবং এই ক্ষেত্রে তাদের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের নির্দেশ দেন তিনি।

কৃষিপণ্যের আমদানি-নির্ভরতা কমিয়ে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের ওপর গুরুত্বারোপ করে মন্ত্রী জানান, ভবিষ্যতে যাতে পাট ও পেঁয়াজের বীজ বিদেশ থেকে আমদানি করতে না হয়, সে লক্ষ্যে সরকার নিরলসভাবে কাজ করছে। প্রয়োজনীয় কৃষিপণ্যের আমদানি কমিয়ে দেশীয় উৎপাদনের মাধ্যমে চাহিদা পূরণ করাই সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। তিনি বলেন, ‘আগামীতে কোনো কৃষিপণ্য যেন আমদানি করতে না হয়, কৃষিতে সরকারের মূল টার্গেট সেটিই। আমরা নিজেরাই উৎপাদনের চেষ্টা করছি এবং এই লক্ষ্য অর্জনে সংশ্লিষ্ট সবাইকে কঠোর পরিশ্রম করতে হবে।’

মাটির গুণগত মান নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে মন্ত্রী বলেন, বিভিন্ন কারণে দেশের মাটির উর্বরতা আগের মতো নেই। তবে ফরিদপুরের মাটি এখনো দেশের অন্যতম সেরা ও উর্বর। ফলে সঠিক পরিকল্পনা ও প্রযুক্তির প্রয়োগ ঘটিয়ে এই জেলার কৃষিকে আরও অনেক দূর এগিয়ে নেওয়ার ব্যাপক সুযোগ রয়েছে।

মতবিনিময় সভায় ফরিদপুরের চরাঞ্চলে কৃষিপণ্য উৎপাদন বাড়ানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। ডাল, রসুন, পেঁয়াজ ও পাটবীজ উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি দেশি মাছের চাষ সম্প্রসারণ, চরাঞ্চলে শাকসবজি উৎপাদন এবং ছাগল পালন ও ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল উন্নয়ন কর্মসূচি জোরদার করার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় শেষে জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে জেলার নির্বাচিত কৃষকদের মাঝে উন্নতমানের পাটবীজ, নতুন অ্যাগ্রো-ফ্রা মেশিন এবং চেক বিতরণ করেন মন্ত্রী। পরবর্তীতে তিনি সদর উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে পেঁয়াজ ও পাটচাষিদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। বিকেল ৪টায় কৃষি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন ফরিদপুর জেলার বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্প ও কার্যক্রম পরিদর্শন করেন তিনি, যার মধ্যে সংরক্ষিত পেঁয়াজ এবং শীতকালীন পেঁয়াজের বীজ উৎপাদন খামার পরিদর্শন অন্যতম।

এই মতবিনিময় সভায় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আব্দুর রহিম, ফরিদপুর জেলা পরিষদের প্রশাসক আফজাল হোসেন খান পলাশ, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ফাতেমা ইসলাম, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সোহরব হোসেন, জেলা মৎস্য কর্মকর্তা নাসরিন জাহান, জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. এস এম আসজাদ, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ মো. শাহদুজ্জামান, সদর উপজেলা পরিষদের কর্মকর্তা মিশকাতুল জান্নাত রাবেয়াসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের প্রধান ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

এর আগে ফরিদপুর সার্কিট হাউসে মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদকে ফরিদপুরের পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা জানান ফরিদপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য চৌধুরী নায়াব ইউসুফ। ওই সময় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।