মাফিকুল ইসলাম

আজ ২৬ আগস্ট। ফুলবাড়ী ট্র্যাজেডির দুই দশক পূর্ণ হচ্ছে। ২০০৬ সালের এই দিনে দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে এশিয়া এনার্জির বিরুদ্ধে আন্দোলনকে কেন্দ্র করে রক্তাক্ত হয়ে ওঠে ফুলবাড়ীর জনপদ। দেশের সম্পদ রক্ষার দাবিতে গড়ে ওঠা ওই আন্দোলনে তৎকালীন বিডিআরের গুলিতে নিহত হন তিন তরুণ—তরিকুল, আমিন ও সালেকিন। আহত হন তিন শতাধিক আন্দোলনকারী।

প্রতিবছর ২৬ আগস্ট ‘ফুলবাড়ী ট্র্যাজেডি দিবস’ হিসেবে বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে পালিত হয়ে আসছে। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, ২০০৬ সালের ৩০ আগস্ট সরকারের সঙ্গে আলোচনার পর ছয় দফা দাবি মেনে নেওয়া হলেও দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও এর পূর্ণ বাস্তবায়ন হয়নি।

বাংলাদেশে এ পর্যন্ত এই অঞ্চলে সাতটি কয়লা ও খনিজ সম্পদের সন্ধান পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। এগুলো হলো দিনাজপুরের পার্বতীপুরের বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি, মধ্যপাড়া কঠিন শিলা খনি, ফুলবাড়ী কয়লাখনি, নবাবগঞ্জের দীঘিপাড়া কয়লাখনি, হিলির লৌহখনি, জয়পুরহাটের জামালগঞ্জ কয়লাখনি এবং রংপুরের পীরগঞ্জের খালাশপীর কয়লাখনি। ফলে পার্বতীপুর থেকে জয়পুরহাট পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকাকে একটি সম্ভাবনাময় খনিজ অঞ্চল হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

২০০৫ সাল থেকে বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি থেকে ভূগর্ভস্থ পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এ পদ্ধতিতে বিপুল পরিমাণ কয়লা ভূগর্ভে থেকে যায়। তাদের তথ্য অনুযায়ী, জামালগঞ্জে প্রায় এক বিলিয়ন টন এবং ফুলবাড়ী কয়লাখনিতে প্রায় ৫৭০ মিলিয়ন টন কয়লা মজুদ রয়েছে।

ফুলবাড়ী কয়লাখনি নিয়ে বিরোধের সূত্রপাত আরও আগে। ১৯৯৪ সালে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য অস্ট্রেলীয় কোম্পানি বিএইচপির সঙ্গে তৎকালীন সরকারের চুক্তি হয়। পরবর্তী সময়ে এশিয়া এনার্জির সঙ্গে সরকার ৩০ বছর মেয়াদি একটি চুক্তি করে।

আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, প্রস্তাবিত চুক্তি অনুযায়ী উত্তোলিত কয়লার মাত্র ৬ শতাংশ বাংলাদেশ পাবে এবং ৯৪ শতাংশ পাবে এশিয়া এনার্জি। এর একটি বড় অংশ বিদেশে রপ্তানির পরিকল্পনা ছিল বলেও তারা দাবি করেন।

প্রস্তাবিত উন্মুক্ত পদ্ধতির কয়লাখনি হলে ফুলবাড়ী শহরসহ আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়া, কৃষিজমি নষ্ট হওয়া, পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব এবং বিপুলসংখ্যক মানুষকে স্থানান্তরের আশঙ্কায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে গড়ে ওঠে ‘ফুলবাড়ী রক্ষা কমিটি’। শুরু হয় আন্দোলন।

আন্দোলনকারীদের প্রধান দাবি ছিল—ফুলবাড়ীতে এশিয়া এনার্জির সব কার্যক্রম বন্ধ করতে হবে এবং সরকারকে নিশ্চয়তা দিতে হবে যে ফুলবাড়ীতে কোনো উন্মুক্ত পদ্ধতির কয়লাখনি করা হবে না। পরবর্তী সময়ে জাতীয় তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির নেতারা আন্দোলনে যুক্ত হন।

২০০৬ সালের ২৬ আগস্ট বিকেলে ঢাকা থেকে জাতীয় তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির নেতারা ফুলবাড়ী শহরের নিমতলা এলাকায় একটি সমাবেশে যোগ দেন। ওই সমাবেশে হাজার হাজার মানুষ অংশ নেন।

সমাবেশ শেষে এশিয়া এনার্জির কার্যালয় ঘেরাওয়ের উদ্দেশ্যে মিছিল নিয়ে ঢাকা মোড়ের দিকে এগিয়ে গেলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে গুলিতে তিন তরুণ নিহত এবং তিন শতাধিক মানুষ আহত হন।

এরপর ফুলবাড়ীসহ দিনাজপুরের বিভিন্ন এলাকায় আন্দোলন আরও তীব্র হয়ে ওঠে। ৩০ আগস্ট তৎকালীন সরকারের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের বৈঠক হয়। ওই বৈঠকে আন্দোলনকারীদের ছয় দফা দাবি মেনে নেওয়া হয়েছিল বলে আন্দোলনের নেতারা দাবি করেন।

দাবিগুলোর মধ্যে এশিয়া এনার্জিকে দেশ থেকে বহিষ্কার এবং দেশের কোথাও উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন না করার বিষয়টি অন্যতম ছিল।

স্থানীয় আন্দোলনকারীরা জানান, তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনাও সে সময় ফুলবাড়ীবাসীর দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়েছিলেন। তবে পরবর্তী সময়ে দীর্ঘ সময় সরকারে থাকলেও ছয় দফা দাবির পূর্ণ বাস্তবায়ন হয়নি বলে তাদের অভিযোগ।

তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি, ফুলবাড়ী শাখার আহ্বায়ক সৈয়দ সাইফুল ইসলাম জুয়েল বলেন, ‘দাবি বাস্তবায়ন না হলে এশিয়া এনার্জিকে বিতাড়িত করতে ফুলবাড়ীবাসী আবারও ঐক্যবদ্ধ হবে। তিন ফসলি জমি আমাদের স্থায়ী সম্পদ। অস্থায়ী সম্পদের জন্য এটি নষ্ট করা যাবে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘বড়পুকুরিয়া কয়লাখনিতে শ্যাফট বা টানেল পদ্ধতিতে কয়লা তোলা হলেও সেখানেও অনেকে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। অনেক মানুষকে স্থানান্তরিত করা হয়েছে। প্রায় ৬৪৬ একর আবাদি জমি নষ্ট হয়েছে।’

এদিকে ফুলবাড়ী আন্দোলনের সময় স্থানীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা হয়রানিমূলক মামলা এখনো প্রত্যাহার হয়নি বলেও দাবি করেছেন আন্দোলনের নেতারা।

ফুলবাড়ী ট্র্যাজেডি দিবস উপলক্ষে তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটিসহ স্থানীয় বিভিন্ন সংগঠন আলোচনা সভা, স্মরণসভা, শোকর‌্যালি ও মানববন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে।