জুলাই গণঅভ্যুত্থানের উত্তাল সময়ে যখন রাজপথ রক্তস্নাত এবং শিক্ষার্থীদের ওপর দমন-পীড়ন চরম পর্যায়ে পৌঁছেছিল, তখন এক সাহসী ও প্রতীকী প্রতিবাদের ডাক দিয়েছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) বাংলা বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক শামীমা সুলতানা। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি আনুগত্যের শেষ চিহ্ন হিসেবে তার কার্যালয়ে ঝোলানো ছবিটিকে সরিয়ে ফেলেছিলেন তিনি। এই পদক্ষেপটি ছিল কেবল একটি ছবি অপসারণ নয়, বরং অন্যায়ের বিরুদ্ধে একজন শিক্ষকের নৈতিক অবস্থানের এক বলিষ্ঠ বহিঃপ্রকাশ।

২০২৪ সালের ১ আগস্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অধ্যাপক শামীমা সুলতানার অফিস রুমে বসা একটি ছবি দ্রুত ভাইরাল হয়। ছবিতে দেখা যায়, তার চেয়ারের পেছনের দেয়ালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পোর্ট্রেটটি নেই, যা সাধারণত সরকারি দপ্তরে থাকা বাধ্যতামূলক। এই ছবি ছড়িয়ে পড়ার পর দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থাকে (বাসস) দেওয়া এক বিস্তারিত সাক্ষাৎকারে অধ্যাপক শামীমা সেই সময়ের স্মৃতিচারণ করেন। তিনি জানান, কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে শিক্ষার্থীদের ওপর নির্বিচারে হামলা, গণগ্রেপ্তার, গুলি এবং নির্মম নির্যাতনের ঘটনায় তিনি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। তার বিবেক তাকে প্রতিনিয়ত তাড়িত করছিল। শেষ পর্যন্ত তিনি অনুভব করেন, যে সরকার তার নাগরিকদের রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে এবং উল্টো তাদের ওপর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা প্রয়োগ করে হত্যা করেছে, সেই সরকারের ছবি তার কার্যালয়ে ঝুলিয়ে রাখার কোনো নৈতিক যৌক্তিকতা নেই। তার ভাষায়, ‘এই ছবি আর আমার কার্যালয়ে ঝুলিয়ে রাখার যোগ্যতা রাখে না।’

অধ্যাপক শামীমা সুলতানা স্পষ্ট করে বলেন, এটি কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কাজ ছিল না, বরং এটি ছিল তার দীর্ঘদিনের নৈতিকতাবোধের একটি বহিঃপ্রকাশ। তিনি মনে করেন, একজন শিক্ষক হিসেবে অন্যায়ের সামনে নীরব থাকা অপরাধ। জুলাই অভ্যুত্থানে তার অংশগ্রহণ কোনো আকস্মিক সিদ্ধান্ত ছিল না, বরং এটি ছিল তার ছাত্রজীবন থেকে লালন করা মূল্যবোধেরই ধারাবাহিকতা। তিনি উল্লেখ করেন, এর আগেও তিনি ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলন, নিরাপদ সড়ক আন্দোলন এবং বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে দুর্নীতিবিরোধী বিভিন্ন কর্মসূচিতে সক্রিয় সমর্থন জুগিয়েছিলেন। অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করা তার চরিত্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

২০২৪ সালের ১৫ জুলাই রাতকে তিনি এই আন্দোলনের একটি চূড়ান্ত মোড় বা টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে চিহ্নিত করেন। ওই রাতে উপাচার্যের বাসভবনে শিক্ষার্থীদের ওপর নৃশংস হামলা চালানো হলে তিনি গভীরভাবে মর্মাহত হন। সেই মুহূর্তে তিনি উপলব্ধি করেন, আর নীরব থাকার কোনো সুযোগ নেই। এরপর তিনি অন্যান্য সহকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে প্রতীকী প্রতিবাদে যোগ দেন এবং আন্দোলন চূড়ান্তভাবে সফল না হওয়া পর্যন্ত রাজপথে শিক্ষার্থীদের পাশে অটল থাকেন।

সংকটের সেই চরম মুহূর্তে অধ্যাপক শামীমা কেবল প্রতিবাদই করেননি, বরং শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেছিলেন। তিনি তার নিজস্ব কার্যালয় এবং বিভাগের সভাপতির কক্ষটি আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন। একই সঙ্গে, আন্দোলনকারীরা যাতে দেশ ও বিদেশের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করতে পারেন এবং বিশ্ববাসীকে পরিস্থিতি জানাতে পারেন, সেজন্য তিনি তার অফিসের ওয়াই-ফাই ব্যবহারের সুযোগ করে দিয়েছিলেন। তিনি বলেন, রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদের বীরত্বপূর্ণ মৃত্যু এবং পরবর্তী সময়ে সাধারণ বেসামরিক নাগরিকদের মৃত্যুর খবরগুলো তার দৃষ্টিভঙ্গিকে পুরোপুরি বদলে দেয়।

শেখ হাসিনার ছবি নামিয়ে ফেলার বিষয়টি কোনো আবেগপ্রবণ সিদ্ধান্ত ছিল না বলে তিনি জোর দিয়ে বলেন। তার মতে, সরকার যখন তার নাগরিকদের জীবন রক্ষায় ব্যর্থ হয় এবং উল্টো তাদের ওপর দমন-পীড়ন চালায়, তখন সেই সরকার তার নৈতিক বৈধতা হারায়। এই সাহসী সিদ্ধান্তের ফলে তাকে চরম মূল্য দিতে হয়েছিল। তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, তিনি কি পরিণতির কথা ভেবে ভয় পাননি? জবাবে অধ্যাপক সুলতানা বলেন, তরুণদের জীবন বাজি রাখা এবং প্রাণ হারানোর দৃশ্য দেখার পর তার মনে ভয়ের চেয়ে দায়িত্ববোধ অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল।

পোর্ট্রেট সরিয়ে ফেলার ছবি ভাইরাল হওয়ার পর তাকে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সম্মুখীন হতে হয়। তিনি জানান, তার ফোনে গালিগালাজ করে কল আসা, হুমকি দিয়ে মেসেজ পাঠানো এবং ব্যক্তিগত আক্রমণ করার ঘটনা ঘটে। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরেও তাকে হেয় করার চেষ্টা করা হয়। ঘটনার দিনই তার বিরুদ্ধে ক্যাম্পাসে লিফলেট বিতরণ করা হয়েছিল। পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারণী ফোরাম সিন্ডিকেট তাকে কারণ দর্শানোর (শোকজ) নোটিশ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, যদিও তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে সেই নোটিশটি কখনো হাতে পাননি।

তবে এই কঠিন সময়ে তিনি এক অনন্য মানসিক প্রশান্তি পেয়েছিলেন তার সন্তানের মাধ্যমে। তিনি স্মৃতিচারণ করে বলেন, ঘটনার দিন বাড়ি ফেরার পর তার ছেলে তাকে জড়িয়ে ধরে বলেছিল, ‘মা, আমি তোমাকে নিয়ে গর্বিত।’ সন্তানের এই কথাটি তাকে আরও আত্মবিশ্বাসী করে তোলে।

অবশেষে ৫ আগস্টের পর যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনে পরিবর্তন আসে, তখন নতুন উপাচার্য তার বিরুদ্ধে নেওয়া ওই শোকজ নোটিশের সিদ্ধান্তটি বাতিল করেন। পুরো ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে অধ্যাপক শামীমা সুলতানা অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে বলেন, তিনি তার এই সিদ্ধান্তের জন্য কখনোই অনুতপ্ত নন। তিনি এটিকে কোনো ব্যক্তিগত অর্জন হিসেবে দেখেন না, বরং এটি ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের একটি প্রতীকী রূপ। তিনি বিশ্বাস করেন, একজন শিক্ষক হিসেবে তার প্রধান দায়িত্বই ছিল শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানো এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া।