বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে এটি অন্য যেকোনো সাধারণ সরকারি নিরাপত্তা স্থাপনার মতোই একটি ভবন। কিন্তু একের পর এক নিরাপত্তা গেট পেরিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলেই বদলে যায় পুরো দৃশ্যপট। সেখানে স্বাগত জানায় ঘুটঘুটে অন্ধকার সরু করিডর আর ছোট ছোট কিছু কক্ষ। ভেন্টিলেশনের কথা তো দূরে থাক, আলো-বাতাসের জন্য সেখানে নেই কোনো ছিদ্র। প্রতিটি কক্ষের সামনেই ছিল ভারী লোহার দরজা, যা বর্তমানে খুলে ফেলা হয়েছে। চারপাশের পরিবেশ একেবারেই নিস্তব্ধ এবং আতঙ্কজনক। বিশেষ করে ৩ ফুট বাই ৪ ফুটের ছোট ছোট ‘যম সেল’গুলোর ভেতরে টয়লেটের জন্য রাখা হয়েছিল মাত্র ৮ ইঞ্চির সামান্য কিছু জায়গা। গতকাল সরেজমিন পরিদর্শনে ‘আয়নাঘর’ নামে পরিচিত র‍্যাবের টিএফআই (টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন) সেলের গোপন বন্দিশালার ভেতরে এমনই এক বিভীষিকাময় চিত্র ফুটে উঠেছে।

বেলা ১১টার পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদার এবং অপর দুই সদস্য বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীকে নিয়ে টিএফআই সেল পরিদর্শনে প্রবেশ করেন চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। এই পরিদর্শনের সময় তারা টিএফআই সেলের মোট ২৯টি গোপন কক্ষ ঘুরে দেখেন। বিচারপতিদের এই আনুষ্ঠানিক পরিদর্শন শেষ হওয়ার পর গণমাধ্যমকর্মীদের জন্যও স্থাপনাটি উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। তখন চিফ প্রসিকিউটর ও অন্যান্য প্রসিকিউটররা সাংবাদিকদের সঙ্গে নিয়ে স্থাপনার বিভিন্ন অংশ ঘুরিয়ে দেখান। তারা সেলগুলোর সুনির্দিষ্ট অবস্থান, জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষ, অবকাঠামো এবং সরকারি তথ্যপত্রে উল্লিখিত বিভিন্ন স্থাপনার বিষয়ে বিস্তারিত অবহিত করেন। এই গুরুত্বপূর্ণ পরিদর্শনে উপস্থিত ছিলেন প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম, গাজী এম এইচ তামিম, ফারুক আহাম্মদ, শাইখ মাহদী, বি এম সুলতান মাহমুদ, তারেক আব্দুল্লাহ, সহিদুল ইসলাম সরদার; আসামিপক্ষের আইনজীবী তবারক হোসেন, এ বি এম হামিদুল মেসবাহ, মো. আমির হোসেন এবং গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্বজনদের সংগঠন ‘মায়ের ডাক’-এর সমন্বয়ক ও সংসদ সদস্য সানজিদা ইসলাম তুলি ও মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন।

সরেজমিনে দেখা গেছে, রাজধানীর উত্তরা-২ নম্বর সেক্টরে অবস্থিত র‍্যাব-১ এর প্রধান কার্যালয়ে মূল ফটক দিয়ে প্রবেশ করে অনেকটা পেছন দিকে গেলে দেখা মেলে টিএফআই সেলের সেই কুখ্যাত বন্দিশালার। দ্বিতল ভবনটিতে মোট ২৯টি সেল রয়েছে, যার কোনোটিতেই আলো-বাতাস প্রবেশের কোনো ব্যবস্থা নেই। ঘুটঘুটে অন্ধকার এই বন্দিশালায় প্রবেশের সময় টর্চ লাইট ব্যবহার করতে হয়েছে। স্থাপনার প্রবেশমুখের সিঁড়ির পাশে একটি অত্যন্ত সরু পথ দিয়ে ভেতরে ঢুকতেই দেখা যায় আয়তনে অত্যন্ত ছোট সাতটি রুম। প্রতিটি রুমের আয়তন মাত্র ৩ ফিট বাই ৪ ফিট। এর মধ্যে একটি কক্ষ ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ; মাত্র ৪২ ইঞ্চি উচ্চতার সেই কক্ষে বন্দির পক্ষে সোজা হয়ে দাঁড়ানোও সম্ভব ছিল না। এই রুমগুলো দেখিয়ে প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদ জানান, এই কক্ষগুলোকেই বলা হতো ‘ডেথ সেল’ বা ‘যম সেল’। প্রতিটি রুমের শেষ অংশে মাত্র ৮ ইঞ্চি পরিমাণ ড্রেনেজ লাইন ছিল। এই ড্রেনেজের এক মাথায় একটি তিন ইঞ্চি পরিমাণ ছিদ্র এবং অন্য মাথায় পানির ট্যাপ লাগানোর লাইন দেখা যায়। প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানান, এই ক্ষুদ্র ড্রেনেজটিই ছিল এই সেলগুলোর একমাত্র টয়লেট।

সিঁড়ি দিয়ে প্রথম তলায় উঠলে দেখা যায় কিছুটা বড় আয়তনের ১০টি সেল। এই সেলগুলোর গড় আয়তন ৫ ফিট বাই ৮ ফিট। এখানেও ড্রেনেজ লাইনের মতো ৮ থেকে ১০ ইঞ্চি জায়গা দেখিয়ে প্রসিকিউটররা জানান, বন্দিদের এই অংশটিকেই টয়লেট হিসেবে ব্যবহার করতে বাধ্য করা হতো। একই তলায় র‍্যাব সদস্যদের থাকার জন্য ব্যারাকসদৃশ একটি অংশও রয়েছে। দ্বিতীয় তলায় উঠে দেখা যায় আরও ১০টি সেল, যেগুলোর গড় আয়তন প্রায় ১৪ ফুট বাই সাড়ে ৪ ফুট। এছাড়া দুটি তুলনামূলক বড় কক্ষ রয়েছে, যেগুলোকে ট্রাইব্যুনালে দেওয়া বিভিন্ন সাক্ষীর জবানবন্দির ভিত্তিতে ‘ভিআইপি সেল’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একটি কক্ষের আয়তন প্রায় ১৪ ফুট বাই ১০ ফুট এবং অন্যটির আয়তন প্রায় ১০ ফুট বাই ১০ ফুট। এই বড় কক্ষগুলোর সঙ্গে ছোট টয়লেট সংযুক্ত ছিল। একই তলায় টিএফআই সেল ও র‍্যাবের গোয়েন্দা শাখার কর্মকর্তাদের কয়েকটি অফিস কক্ষও দেখা যায়, যা বর্তমানে পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। সেলগুলোর অনেক জায়গায় ভাঙচুর দেখা গেছে এবং দরজাগুলো সরিয়ে ফেলা হয়েছে। চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম পরিদর্শনের সময় জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর এই বন্দিশালার আলামত ধ্বংস করার চেষ্টা করা হয়েছে। কোথাও দেয়াল ভাঙা হয়েছে, আবার কোথাও দেয়াল তুলে আটকে দেওয়া হয়েছে। তবে পরবর্তীতে তদন্ত সংস্থা ও প্রসিকিউশন সবকিছু উদ্ধার করতে সক্ষম হয়।

চিফ প্রসিকিউটর আরও জানান, ভারতে পাচারের আগে বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকেও এই টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন সেলে (টিএফআই সেল) রাখা হয়েছিল, যা তদন্তে বেরিয়ে এসেছে। গতকাল পরিদর্শন শেষে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, নির্মম নির্যাতনের এই সেলগুলো সরাসরি বিচারপতিদের দেখানো হয়েছে, যা মেমোরেন্ডাম হিসেবে আদালতের বিচারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হবে। যারা আয়নাঘরকে আড়াল করতে আলামত নষ্ট করেছেন, তাদের কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। তিনি বর্ণনা করেন, এখানে অত্যন্ত ভয়াবহ পরিবেশ ছিল। ছোট-বড় মিলিয়ে ২৯টি কামরায় ভুক্তভোগীদের মানবেতর অবস্থায় রাখা হতো। যাদের ধরে আনা হতো, তাদের দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, এমনকি কাউকে কাউকে বছরের পর বছর এখানে আটকে রাখা হতো। কক্ষগুলো এতটাই ছোট ছিল যে, সেখানে শুয়ে থাকার কোনো সুযোগ ছিল না; ফলে ভুক্তভোগীদের বসেই দীর্ঘ সময় কাটাতে হতো এবং এভাবেই তাদের ওপর অকথ্য নির্যাতন চালানো হতো। অনেক সময় দীর্ঘদিন আটকে রাখার পর কাউকে কাউকে মিথ্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে ছেড়ে দেওয়া হতো। প্রসিকিউশনের কাছে দেওয়া ভুক্তভোগীদের বর্ণনার সঙ্গে এই বাস্তব তথ্যের মিল পাওয়া গেছে বলে জানান তিনি। আমিনুল ইসলাম আরও উল্লেখ করেন, এই সেলে বিএনপির নেতা ইলিয়াস আলী এবং বর্তমান সংসদ সদস্য মীর আহমাদ বিন কাসেমকেও (আরমান) রাখা হয়েছিল। এছাড়া গুম হওয়া প্রায় ২৫০ ব্যক্তির এখনো কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।

তবে এই স্থাপনাটিই কথিত ‘আয়নাঘর’ কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন আসামি পক্ষ। আসামি পক্ষের আইনজীবী মো. তাবারক হোসেন ভূইয়া সাংবাদিকদের বলেন, আইন অনুযায়ীই এই পরিদর্শন হয়েছে, তবে তারা টিএফআই সেল দেখতে আসেননি। তার মতে, টিএফআই একটি ধারণা মাত্র, এটি কোনো সুনির্দিষ্ট স্থান নয়। তিনি আরও বলেন, গুম কমিশনের সদস্যরা পরিদর্শনের সময় জানিয়েছিলেন যে, সেখানে নির্দিষ্ট সময় পরপর বিমান বা ট্রেনের শব্দ শোনার কথা থাকলেও তারা তা শুনতে পাননি। তাই এটিই সেই কথিত ‘আয়নাঘর’ কি না, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে; এটি একটি পরিত্যক্ত ভবনও হতে পারে। আসামি পক্ষের আরেক আইনজীবী এ বি এম হামিদুল মেসবাহ বলেন, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কাউকে আদালতে সোপর্দ করতে ব্যর্থ হলে সেটি বিভাগীয় ব্যবস্থার বিষয় হতে পারে, কিন্তু কোনোভাবেই তা মানবতাবিরোধী অপরাধ নয়। তিনি জোর দিয়ে বলেন, বিচার অবশ্যই হতে হবে, তবে তা হতে হবে ন্যায়বিচার। প্রকৃত অপরাধীকে শনাক্ত করে শাস্তি দিতে হবে এবং কোনো নির্দোষ ব্যক্তি যেন সাজাপ্রাপ্ত না হন, সেটিই হওয়া উচিত ন্যায়বিচারের মূলনীতি।