জয়পুরহাটের কালাই উপজেলায় সরকারি খালের পুনঃখনন প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। অনুমোদিত নকশা উপেক্ষা করে দায়সারা কাজ, শ্রমিকের পরিবর্তে খনন যন্ত্রের ব্যবহার এবং সরকারি অনুমতি ছাড়াই মূল্যবান গাছ কাটার মতো গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে। স্থানীয়দের দাবি, কানমনা-হারাবতী খাল পুনঃখনন প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ছিল সেচ সুবিধা বৃদ্ধি, জলাবদ্ধতা নিরসন এবং দরিদ্র মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। কিন্তু বাস্তবে এসব উদ্দেশ্য অর্জনের পরিবর্তে নিম্নমানের কাজের মাধ্যমে সরকারি অর্থের অপচয় ও আত্মসাতের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হচ্ছে।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে রোয়াইর স্লুইসগেট থেকে বানদীঘি পর্যন্ত প্রায় ১০ কিলোমিটার খালের পুনঃখনন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। ‘টেকসই ক্ষুদ্রাকার পানি সম্পদ উন্নয়ন প্রকল্প’-এর আওতায় এই কাজে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল এক কোটি ১১ লাখ টাকা। প্রকল্পটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয় ২০২৪ সালের ৩১ মার্চ। পরবর্তীতে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে একই খালের আরও ৫ দশমিক ৯০৫ কিলোমিটার অংশ পুনঃখননের জন্য কানমনা-হারাবতী পানি ব্যবস্থাপনা সমবায় সমিতির মাধ্যমে আরও ৭১ লাখ ১৫ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়।

দ্বিতীয় দফার এই বরাদ্দের বিস্তারিত বিবরণ অনুযায়ী, কানমনা খালের সাঁতাহার গ্রামের হারাবতী খালের সংযোগ থেকে ইন্দাহার গ্রাম পর্যন্ত চার হাজার ৬৮০ মিটার অংশের প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫৩ লাখ ৩৪ হাজার ১৫০ টাকা। অন্যদিকে, হারাবতী খালের বানদীঘি সেতু থেকে গোবিন্দগঞ্জ সীমান্ত পর্যন্ত এক হাজার ২২৫ মিটার অংশের প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল ১৭ লাখ ৮০ হাজার ৯২০ টাকা। চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে এই দ্বিতীয় দফার কাজ শুরু হয় এবং নির্ধারিত মেয়াদ ছিল ৩১ মে পর্যন্ত। এভাবে একই খালের পুনঃখনন কাজে দুই দফায় মোট সরকারি বরাদ্দের পরিমাণ দাঁড়ায় এক কোটি ৮২ লাখ ১৫ হাজার টাকা।

কার্যাদেশ অনুযায়ী, খালের উপরিভাগের প্রস্থ ২২ থেকে ৩২ ফুট (কিছু স্থানে ৩৫ ফুট), তলদেশের প্রস্থ ১০ থেকে ১২ ফুট এবং মোট গভীরতা ৮ দশমিক ৫ থেকে ১১ ফুট রাখার কথা ছিল। এছাড়া কাজের নির্ভুল পরিমাপ নিশ্চিত করতে ১৩টি রেফারেন্স বেড ব্লক (আরবিবি) এবং ২৬টি টেম্পোরারি বেঞ্চ মার্ক (টিবিএম) নির্মাণ করা বাধ্যতামূলক ছিল। তবে সরেজমিনে দেখা যায়, বাস্তব চিত্র কার্যাদেশের সম্পূর্ণ বিপরীত। অধিকাংশ স্থানে খালের গভীরতা মাত্র ছয় ফুট, উপরিভাগের প্রস্থ ১৬ থেকে ১৮ ফুট এবং তলদেশের প্রস্থ প্রায় আট ফুট। অনেক জায়গায় কেবল ওপরের পলি তুলে দায়সারাভাবে কাজ সম্পন্ন করে দেখানো হয়েছে। খনন করা মাটি যথাযথভাবে ড্রেসিং না করায় বৃষ্টির পানিতে মাটি পুনরায় খালের ভেতর ধসে পড়ছে, ফলে প্রকল্পের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এছাড়া প্রকল্প এলাকায় ব্যয়, বাস্তবায়নকারী সংস্থা এবং সময়সীমা উল্লেখ করে কোনো সাইনবোর্ড লাগানো হয়নি এবং কার্যাদেশে উল্লিখিত আরবিবি ও টিবিএম-এর কোনো চিহ্নও পাওয়া যায়নি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কানমনা-হারাবতী পানি ব্যবস্থাপনা সমবায় সমিতির এক সদস্য এবং এলজিইডির একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছেন, ব্যাংক থেকে অর্থ উত্তোলনের সুবিধার্থে ১৮০ জন নারী-পুরুষ শ্রমিকের একটি তালিকা প্রস্তুত করে নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয়ে জমা দেওয়া হয়েছিল। অথচ বাস্তবে মাঠে কোনো শ্রমিককে কাজ করতে দেখা যায়নি। স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি কোনো অনুমতি বা নিলাম প্রক্রিয়া ছাড়াই খালের দুই পাড়ের অসংখ্য মূল্যবান গাছ কেটে বিক্রি করা হয়েছে। এই গাছ বিক্রির অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা হয়েছে কি না, তা নিয়ে চরম ধোঁয়াশা বিরাজ করছে।

মুন্নাপাড়া গ্রামের বাসিন্দা রুহুল আমিন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, কেবল কিছু জায়গায় মাটি তুলে এবং ঘাস পরিষ্কার করে কোটি টাকার কাজ শেষ বলে দাবি করা হয়েছে। পাড়ের বড় বড় গাছ কেটে নেওয়া হলেও প্রকৃত খনন কাজ তেমন হয়নি। একই গ্রামের মোনোয়ার হোসেন বলেন, কোটি টাকার এই প্রকল্পে ছয়টি ভেকু মেশিন চালিয়ে দরিদ্র মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ কেড়ে নেওয়া হয়েছে। এভাবে কাজ করলে কয়েক মাসের মধ্যেই খালটি পুনরায় ভরাট হয়ে যাবে।

প্রকল্পের তদারকি কর্মকর্তা ও এলজিইডির সহকারী প্রকৌশলী আবু জাফর স্বীকার করেছেন যে, এই কাজে শ্রমিক ব্যবহার করা হয়নি এবং ছয়টি ভেকু মেশিনের মাধ্যমে কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। তিনি জানান, ইতোমধ্যে ৫৫ শতাংশ বিল পরিশোধ করা হয়েছে। তবে আরবিবি ও টিবিএম নির্মাণ না হওয়া এবং শ্রমিক নিয়োগ না করার বিষয়ে তিনি কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।

অন্যদিকে, কানমনা-হারাবতী পানি ব্যবস্থাপনা সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক মফিদুল ইসলাম দাবি করেন, সরকারি নকশা অনুযায়ীই কাজ করা হয়েছে এবং স্থানীয় বাস্তবতার কথা চিন্তা করে কিছু জায়গায় সামান্য সমন্বয় করা হয়েছে। তার মতে, তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো সঠিক নয়।

কালাই উপজেলা প্রকৌশলী সুমন কুমার দেবনাথ বলেন, খালের পুনঃখনন কাজে কোনো অনিয়ম হয়নি এবং ইতোমধ্যে ৫৫ শতাংশ বিল পরিশোধ করা হয়েছে। কাজ শেষে ‘পোস্ট ওয়ার্ক’ যাচাই করা হবে এবং কার্যাদেশের সাথে কোনো অমিল পাওয়া গেলে বিল কেটে নিয়ে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হবে। শ্রমিকের তালিকার বিষয়ে তিনি জানান, তালিকাটি নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে, তাদের কার্যালয়ে সেটি সংরক্ষিত নেই।