প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কিশোরগঞ্জ সফরকে কেন্দ্র করে জেলাজুড়ে ব্যাপক প্রস্তুতি চলছে। এরই অংশ হিসেবে কিশোরগঞ্জ-ভৈরব আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশে দীর্ঘ প্রায় ২০ বছর ধরে জমে থাকা এক বিশাল ময়লার ভাগাড় তড়িঘড়ি করে বালুচাপা দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। কেবল মহাসড়কই নয়, জেলা শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রাস্তাঘাটের আশপাশে জমে থাকা বর্জ্য অপসারণের বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে পৌরসভা কর্তৃপক্ষ।
আগামীকাল রোববার কিশোরগঞ্জ জেলা সফর করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তার এই সফরের সূচিতে রয়েছে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি। জাতীয় মৎস্য পক্ষ উপলক্ষে জেলার পাকুন্দিয়ায় মাছের পোনা অবমুক্তকরণের মাধ্যমে তিনি তার সফর শুরু করবেন। এরপর তিনি কটিয়াদীর কার্প হ্যাচারি কমপ্লেক্স পরিদর্শন করবেন। সফরের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হবে ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানের উন্নয়ন কার্যক্রমের শুভ উদ্বোধন। সবশেষে বিকেলে জেলা শহরের পুরোনো স্টেডিয়াম মাঠে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ কার্যক্রমের উদ্বোধন করবেন বলে জানা গেছে।
তবে প্রধানমন্ত্রীর এই সফরকে কেন্দ্র করে স্থানীয়দের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে, বিশেষ করে খিলপাড়া এলাকার বাসিন্দাদের মাঝে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সদর উপজেলার খিলপাড়া এলাকায় কিশোরগঞ্জ-ভৈরব আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশে এক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে দীর্ঘ দুই দশক ধরে ময়লা-আবর্জনা ফেলা হয়ে আসছিল। কিশোরগঞ্জ শহরের বিভিন্ন বাজার, বাসাবাড়ির গৃহস্থালি বর্জ্যের পাশাপাশি বিভিন্ন হাসপাতাল ও ক্লিনিকের ঝুঁকিপূর্ণ বর্জ্য এখানে স্তূপ করা হতো। শুধু শহরের ময়লাই নয়, কটিয়াদী, পাকুন্দিয়া ও হোসেনপুর উপজেলার কিছু অংশের বর্জ্যও এখানে এনে ফেলা হতো। দীর্ঘকাল ধরে এই বর্জ্যগুলো উন্মুক্ত অবস্থায় থাকায় এলাকায় তীব্র দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছিল, যা স্থানীয় বাসিন্দা ও পথচারীদের জন্য চরম দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
উল্লেখ্য, কিশোরগঞ্জ-ভৈরব আঞ্চলিক মহাসড়কটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি যোগাযোগ পথ। প্রতিদিন ঢাকা, ময়মনসিংহ, সিলেট ও ভৈরবগামী হাজারো যানবাহন এবং পথচারী এই সড়ক দিয়ে চলাচল করেন। বৃষ্টির দিনে ময়লা পচে যখন সড়কের ওপর চলে আসত, তখন পরিস্থিতি আরও শোচনীয় হয়ে উঠত। অবাক করার বিষয় হলো, তিন থেকে চার বছর আগে এই বর্জ্য সমস্যা সমাধানে প্রায় ১০ কোটি টাকার একটি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু লোকবলসংকটের অজুহাতে সেই প্রকল্পটি এখনো চালু করা সম্ভব হয়নি। ফলে কোটি টাকার প্রকল্প কাগজে-কলমে থাকলেও বাস্তব জমিনে ময়লার স্তূপ রয়ে গেছে।
সড়কের পাশের এই অস্বাস্থ্যকর ভাগাড় অপসারণের দাবিতে স্থানীয়রা দীর্ঘদিন ধরে সোচ্চার ছিলেন। প্রথম আলোসহ বিভিন্ন জাতীয় গণমাধ্যমে এ নিয়ে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে এবং এলাকাবাসী মানববন্ধনসহ নানা প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেছেন। কিন্তু দীর্ঘদিনের এই দাবির মুখে কর্তৃপক্ষ তেমন কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। তবে প্রধানমন্ত্রীর আগমনের কথা জানাজানি হতেই দৃশ্যপট বদলে গেছে। গত এক সপ্তাহ ধরে ময়লার স্তূপের কিছু অংশ সরিয়ে দ্রুত বালুচাপা দিয়ে ঢেকে দেওয়ার কাজ চলছে। একই প্রক্রিয়ায় কটিয়াদী বাসস্ট্যান্ড এলাকার ময়লার স্তূপগুলোকেও বালু দিয়ে ঢেকে দেওয়া হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, এই পরিচ্ছন্নতা অভিযান আসলে কোনো স্থায়ী সমাধান নয়, বরং প্রধানমন্ত্রীর নজর এড়াতে করা একটি সাময়িক সাজসজ্জা। তাদের মতে, প্রধানমন্ত্রী চলে যাওয়ার পর এলাকাটি আবারও আগের মতো নোংরা হয়ে যাবে। গত বৃহস্পতিবার দুপুরে খিলপাড়া এলাকায় দেখা যায়, মহাসড়কের পাশের সেই বিশ্রী ভাগাড়টি এখন আর দৃশ্যমান নয়। ময়লার স্তূপের ওপর বালুচাপা দেওয়ায় এলাকাটি আপাতদৃষ্টিতে পরিচ্ছন্ন দেখাচ্ছে এবং দুর্গন্ধ কমে যাওয়ায় পথচারীরা স্বাচ্ছন্দ্যে চলাচল করতে পারছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা মাহমুদুল হাসান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "এখান দিয়ে যাওয়ার সময় দুর্গন্ধের কারণে দম বন্ধ হয়ে আসত। বিশেষ করে বৃষ্টির সময় দুর্ভোগের শেষ ছিল না। আমরা পৌর কর্তৃপক্ষের কাছে বারবার লিখিত ও মৌখিক আবেদন জানালেও কোনো লাভ হয়নি। এখন প্রধানমন্ত্রীর আগমনের কথা শুনে তারা তড়িঘড়ি করে বালুচাপা দিচ্ছে। আমরা জানি এটি অস্থায়ী ব্যবস্থা। আমরা চাই স্থায়ীভাবে এই ময়লার ভাগাড়টি অপসারণ করা হোক।"
এই বিষয়ে কিশোরগঞ্জ পৌরসভার প্রশাসক এবং স্থানীয় সরকার অধিদপ্তরের কিশোরগঞ্জের উপপরিচালক জেবুন নাহার শাম্মী প্রথম আলোকে জানান, প্রধানমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে পুরো শহর ও আশপাশের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এজন্য মাইকিংয়ের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে সচেতন করা হচ্ছে যেন কেউ রাস্তায় বা উন্মুক্ত স্থানে ময়লা না ফেলেন। তিনি আরও জানান, মহাসড়কের পাশের ময়লা ফেলার জায়গাটি আপাতত অস্থায়ীভাবে বালুচাপা দেওয়া হয়েছে। তবে এখানে স্থায়ীভাবে বর্জ্য নিরসনের একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে, যা খুব শীঘ্রই চালু করা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।










