বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি নিয়ে দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান হতে চলেছে। সংগঠনের বর্তমান সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব এবং সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির ইতিমধ্যেই তাদের বিদায়ী বার্তা দিয়েছেন, যা নতুন নেতৃত্বের আগমনের স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে। এখন কেবল বিএনপির চেয়ারম্যান ও দলের সাংগঠনিক অভিভাবক তারেক রহমানের চূড়ান্ত সবুজ সংকেতের অপেক্ষা। তার অনুমোদনের পরপরই যেকোনো মুহূর্তে ঘোষণা করা হতে পারে নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনে স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা ও সর্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করতে তারেক রহমান এক বিশেষ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। তিনি ইতোমধ্যে ছাত্রদলের বিদায়ী কমিটির শীর্ষ পাঁচ নেতার কাছ থেকে গোপন ব্যালটের মাধ্যমে নতুন নেতৃত্বের বিষয়ে মতামত গ্রহণ করেছেন। এই মতামতের পাশাপাশি বিভিন্ন দিক নিবিড়ভাবে যাচাই-বাছাই করে তিনি চূড়ান্ত তালিকা প্রস্তুত করছেন।
গত বৃহস্পতিবার (১৪ আগস্ট) রাতে রাজধানীর গুলশানে তারেক রহমানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে ছাত্রদলের বিদায়ী কমিটির শীর্ষ পাঁচ নেতার সঙ্গে এক জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন বিদায়ী সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব, সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির, জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি আবু আফসান মো. ইয়াহিয়া, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শ্যামল মালুম এবং সাংগঠনিক সম্পাদক আমান উল্লাহ আমান।
বৈঠকে তারেক রহমান বিদায়ী নেতাদের গত কয়েক বছরের আন্দোলন-সংগ্রামে ত্যাগ, ধৈর্য ও সাহসিকতার ভূয়সী প্রশংসা করেন। তবে সংগঠনের দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য এবং নিয়ম অনুযায়ী নতুন প্রজন্মের হাতে নেতৃত্ব হস্তান্তরের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন তিনি। তাদের উদ্দেশে বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, ‘বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনে তোমরা অসামান্য আন্দোলন ও সংগ্রাম করেছ। রাজপথের এই লড়াই বাংলাদেশের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তবে নিয়ম অনুযায়ী এখন ছাত্রদলে তোমাদের প্রয়োজনীয়তা শেষ হয়েছে। এখন সময় এসেছে নতুনদের সুযোগ করে দেওয়ার এবং তোমাদের মূল দলের রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার।’
এই বৈঠকের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক ছিল নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রে গোপন ব্যালটের ব্যবহার। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নেতা জানান, ‘চেয়ারম্যান আমাদের কাছে নতুন নেতৃত্বের পছন্দের তালিকা চেয়েছেন এবং আমরা গোপন ব্যালটের মাধ্যমে আমাদের মতামত তাকে জানিয়েছি। তিনি তা গ্রহণ করেছেন এবং এখন সবকিছু যাচাই-বাছাই করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন।’
নতুন কমিটি গঠনের এই আলোচনা শুরু হওয়ার পর থেকেই ছাত্রদলের সাধারণ নেতাকর্মীদের মাঝে এক নতুন উদ্দীপনা ও প্রত্যাশা দেখা দিয়েছে। দলীয় আলোচনা এবং মাঠপর্যায়ের হিসাব-নিকাশে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক—এই দুটি শীর্ষ পদের জন্য বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী ও মেধাবী নেতার নাম জোরালোভাবে আলোচনায় রয়েছে।
সভাপতি পদের দৌড়ে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছেন ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদের বর্তমান জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শ্যামল মালুম (২০০৭-০৮ শিক্ষাবর্ষ)। এছাড়া এই পদের জন্য খোরশেদ আলম সোহেল, মঞ্জুরুল আলম রিয়াদ, রিয়াদ রহমান, সাফি ইসলাম ও এজাজুল কবির রুয়েলের (২০০৮-০৯ শিক্ষাবর্ষ) নামও বেশ আলোচিত। পাশাপাশি বর্তমান সাংগঠনিক সম্পাদক আমান উল্লাহ আমান, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মমিনুল ইসলাম জিসান, মোস্তাফিজুর রহমান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আরিফুল ইসলাম আরিফ, প্রচার সম্পাদক শরীফ প্রধান শুভ এবং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ফারুক হোসেনের (২০০৯-১০ শিক্ষাবর্ষ) নামও শোনা যাচ্ছে। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, আমান উল্লাহ আমান শীর্ষ নেতৃত্বের অংশ হওয়া সত্ত্বেও রাজপথে তার ধারাবাহিক উপস্থিতি, আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয়তা এবং তরুণ নেতাকর্মীদের কাছে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতার কারণে সভাপতি পদের অন্যতম শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন।
অন্যদিকে, সাধারণ সম্পাদক পদের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সভাপতি গণেশ চন্দ্র রায় সাহস, কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক তারিকুল ইসলাম তারিক, সহ-সভাপতি আনিসুর রহমান খন্দকার অনিক ও মাসুম বিল্লাহর (২০১০-১১ শিক্ষাবর্ষ) নাম আলোচনায় রয়েছে। তবে বর্তমান কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সালেহ মোহাম্মদ আদনানের নাম সবচেয়ে বেশি জোরালোভাবে শোনা যাচ্ছে। দলীয় নেতাদের মতে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে আন্দোলনে মাঠপর্যায়ে অত্যন্ত সক্রিয় থাকা আদনান ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানেও রাজপথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। এছাড়া এই পদের দৌড়ে রয়েছেন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রাজু আহমেদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপন, কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাহিত্য ও প্রকাশনা সম্পাদক মিনহাজ আহমেদ প্রিন্স, শামীম আখতার শুভ, গাজী সাদ্দাম হোসেন, ইব্রাহিম খলিল ও তারেক হাসান মামুনের (২০১১-১২ শিক্ষাবর্ষ) নাম।
তবে নতুন কমিটি নিয়ে বিএনপির পক্ষ থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা আসেনি। বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী শুক্রবার (১৪ আগস্ট) বিকেলে নয়াপল্টনে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে জানান, ‘আমার কাছে এখনও এ ধরনের কোনও নির্দেশনা আসেনি। যদি নতুন কমিটি নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়ে থাকে, তবে তা অবশ্যই জানানো হবে।’
উল্লেখ্য, বিএনপি এবং তার অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর কমিটি সাধারণত রুহুল কবির রিজভীর স্বাক্ষরিত দলীয় প্যাডে প্রকাশ করা হয়। ফলে নতুন ছাত্রদল কমিটির আনুষ্ঠানিক ঘোষণার জন্য তার স্বাক্ষরিত প্রেস বিজ্ঞপ্তির অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন সংগঠনের তৃণমূল থেকে শীর্ষপর্যায় পর্যন্ত সব স্তরের নেতাকর্মীরা।










