কুমিল্লার দেবীদ্বারে এক মাদ্রাসা সুপারের বিরুদ্ধে দশম শ্রেণির এক ছাত্রীকে দীর্ঘ সময় ধরে হয়রানি এবং তার আপত্তিকর ভিডিও ধারণের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়, যার ফলে অভিযুক্ত সুপারকে গণপিটুনি দিয়ে পুলিশের হাতে সোপর্দ করা হয়। গত শনিবার (১৫ আগস্ট) দুপুরে দেবীদ্বার উপজেলার জাফরগঞ্জ ইউনিয়নের হোসেনপুর ভূঁইয়া বাড়ির হোসেনপুর পশ্চিম ও উত্তরপাড়া এলাকায় অবস্থিত ‘নূরে মদিনা মাদ্রাসা ও এতিমখানা কমপ্লেক্সে’ এই চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি ঘটে।

আটক ব্যক্তির নাম হাফেজ মাওলানা মো. মিজানুর রহমান (৫০)। তিনি উক্ত মাদ্রাসার সুপার হিসেবে দায়িত্ব পালন করার পাশাপাশি স্থানীয় একটি মসজিদের ইমাম হিসেবেও কর্মরত। তার স্থায়ী নিবাস বরুড়া উপজেলার দক্ষিণ ভবানীপুর ইউনিয়নের পোমতলা গ্রামে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, এক কিশোরীর সঙ্গে মিজানুর রহমানের অনৈতিক কর্মকাণ্ডের বেশ কিছু ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর পুরো এলাকায় চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। ক্ষুব্ধ জনতা প্রথমে তাকে ধরে মারধর করে মাদ্রাসা কমপ্লেক্সের ভেতরে আটকে রাখে। তবে পরবর্তীতে কিছু লোক তাকে পালিয়ে যেতে সহায়তা করলে স্থানীয়রা তাকে ধাওয়া করে এবং চরবাকর-হোসেনপুর সীমান্ত এলাকা থেকে পুনরায় আটক করেন। এরপর তাকে গণপিটুনি দিয়ে দেবীদ্বার পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

ঘটনার বিস্তারিত জানাতে মাদ্রাসা কমপ্লেক্সের বাবুর্চি মো. ইব্রাহিম বলেন, মাদ্রাসার সুপারের ১২ বছর বয়সী ছেলে সিয়াম ওই প্রতিষ্ঠানেই পড়াশোনা করে। সিয়াম তার বাবার মোবাইল ফোনে কিছু আপত্তিকর ভিডিও দেখতে পায় এবং বিষয়টি তার মাকে জানায়। পরবর্তীতে বন্ধুদের সঙ্গে আলোচনা করে সিয়াম ওই ভিডিওগুলো ইব্রাহিমের কাছে দেয়। ইব্রাহিমের দাবি, এরপরই স্থানীয় কয়েকজনের মাধ্যমে ভিডিওগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

অন্যদিকে, অভিযোগকারী কিশোরী জানিয়েছেন, প্রায় দেড় বছর ধরে মিজানুর রহমান তাকে বিভিন্নভাবে বিরক্ত ও হয়রানি করে আসছিলেন। এই অসহনীয় পরিস্থিতির কারণে তিনি ওই সুপারের কাছে প্রাইভেট পড়া বন্ধ করে দেন। তার আরও অভিযোগ, তাকে অচেতন করে রেখে অনৈতিকভাবে ছবি ও ভিডিও ধারণ করা হয়েছে।

তবে এসব গুরুতর অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন অভিযুক্ত মিজানুর রহমান। তার দাবি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে ভিডিওগুলো ছড়িয়েছে, সেগুলো তার নয়; বরং অন্য কারো অনৈতিক কর্মকাণ্ডের ভিডিও। তিনি আরও দাবি করেন, প্রায় দেড় বছর আগে ওই ছাত্রীর মাসিক শুরু হওয়ার পর তাকে মাদ্রাসা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছিল। এছাড়া স্থানীয় একটি বিয়ের অনুষ্ঠান নিয়ে বিরোধের জেরে এক পক্ষ পরিকল্পিতভাবে তার বিরুদ্ধে এই ষড়যন্ত্র করছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন।

স্থানীয় বাসিন্দা ইমরান ভূঁইয়া জানান, মিজানুর রহমান দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন মাদ্রাসায় শিক্ষকতা ও ইমামের দায়িত্ব পালন করে আসছেন। তবে তার বিরুদ্ধে এর আগেও নারীদের সঙ্গে অনৈতিক আচরণের অভিযোগ উঠেছিল এবং গত দেড় বছরে এ নিয়ে অন্তত তিনটি সালিস অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।

এই বিষয়ে দেবীদ্বার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনিরুজ্জামান জানান, এক ছাত্রীর সঙ্গে অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে স্থানীয়রা মাদ্রাসা সুপারকে মারধর করে আটকে রেখেছে—এমন খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে তাকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসে। ওই সময় বিক্ষুব্ধ জনতা তাকে পুনরায় ঘেরাও করার চেষ্টা করে। ওসি আরও জানান, ভুক্তভোগীর বাবা মামলা করলে সেই অভিযোগের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।