যশোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য এবং যশোর জেলা জামায়াতের আমির গোলাম রসুলের বাসভবনে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির অভিযোগ, বিএনপির নেতা-কর্মীদের প্রত্যক্ষ মদদে এবং সুপরিকল্পিতভাবে একদল সন্ত্রাসী এই ন্যক্কারজনক হামলা চালিয়েছে। মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) গণমাধ্যমে পাঠানো এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার এই অভিযোগ উত্থাপন করেন।

বিবৃতিতে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘বিএনপির নেতাকর্মীদের প্ররোচনা ও মদদে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে একদল সন্ত্রাসী যশোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য গোলাম রসুলের বাসায় হামলা চালিয়েছে। আমি এই কাপুরুষোচিত ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি। একজন নির্বাচিত সংসদ সদস্যের বাসভবনে এ ধরনের হামলা দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে আরও অবনতির দিকে নিয়ে যাবে।’ তিনি ঘটনার সঙ্গে জড়িত সকল অপরাধী এবং উসকানিদাতাদের অবিলম্বে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার জন্য প্রশাসনের প্রতি জোর দাবি জানান।

বিবৃতিতে গোলাম রসুলের পরিবারের একটি ব্যক্তিগত ও সংবেদনশীল বিষয় উল্লেখ করেন জামায়াত সেক্রেটারি। তিনি জানান, সংসদ সদস্যের এক মেয়ে মানসিকভাবে অসুস্থ এবং তিনি ভারতসহ বিভিন্ন দেশে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। জামায়াতের দাবি, ওই মেয়ের একটি আচরণকে কেন্দ্র করে স্থানীয়ভাবে যে ভুল বোঝাবুঝি বা ঘটনা তৈরি হয়েছিল, তা ইতোমধ্যে উভয় পক্ষের সম্মতিতে মীমাংসিত হয়েছে। তবে তা সত্ত্বেও বিষয়টি পুনরায় সামনে এনে পরিকল্পিতভাবে হামলা চালানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। একই সঙ্গে সংসদ সদস্য ঘটনার যথাযথ ব্যাখ্যা দেওয়ার পরও উত্তেজিত জনতাকে বা ‘মব’কে উসকে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।

জামায়াতে ইসলামী যে তারা আইনশৃঙ্খলার প্রতি শ্রদ্ধাশীল, তা পুনর্ব্যক্ত করে মিয়া গোলাম পরওয়ার আরও বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে ‘মব’ তৈরির মাধ্যমে জামায়াতকে বিতর্কিত করার উদ্দেশ্যে টার্গেটেড অপপ্রচার চালানো হচ্ছে, যা অত্যন্ত অপ্রত্যাশিত ও অনভিপ্রেত। আমরা সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি যেন তারা ঘটনার প্রকৃত সত্য তুলে ধরে সংবাদ প্রকাশ করেন এবং জনসাধারণকে বিভ্রান্ত না করেন। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের এই পরিস্থিতিতে আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানাচ্ছি।’

এর আগে, মঙ্গলবার সকালে যশোর শহরের নীলগঞ্জ এলাকায় গোলাম রসুলের বাসভবন ঘেরাও করে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন স্থানীয় শত শত মানুষ। প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, এমপির বাড়ির সামনে অবস্থিত আল মাদ্রাসাতুশ শারইয়াহ ও মসজিদকে কেন্দ্র করে স্থানীয়দের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছিল। নীলগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা আব্দুস সালাম গণমাধ্যমকে জানান, গত সোমবার সকালে এমপির মেয়ে এবং মেডিকেল শিক্ষার্থী মেহজাবিন অনন্যার বিরুদ্ধে মাদ্রাসার এক শিশু শিক্ষার্থী আয়ান এবং রেক্সনা নামের এক নারীকে মারধরের অভিযোগ ওঠে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সোমবার রাতে দুই পক্ষের মধ্যে একটি সমঝোতা হলেও মঙ্গলবার সকালে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। অভিযোগ ওঠে যে, মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষকে প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই খবর ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয় বাসিন্দারা ক্ষুব্ধ হয়ে এমপির বাড়ির সামনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। বিক্ষোভকারী রবিউল দাবি করেন, মাদ্রাসাটি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছে। তিনি আরও অভিযোগ করেন, আজ সকালে বিক্ষোভকারীরা এমপির বাড়ির সামনে জড়ো হলে বাড়ির দ্বিতীয় তলা থেকে তাদের ওপর গরম পানি ছুড়ে মারা হয়, যার ফলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সকাল সাড়ে ১১টার দিকে এমপির স্বজন আবদুল্লাহ বিরোধ মীমাংসার চেষ্টা করতে সামনে এলে উত্তেজিত জনতা তাকে মারধর করেন। এরপর বিক্ষোভকারীরা যশোর-নড়াইল মহাসড়ক অবরোধ করে ফেলেন এবং এমপি গোলাম রসুল ও তার মেয়ের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান। খবর পেয়ে কোতোয়ালি থানার পরিদর্শক (অপারেশনস) দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে উভয় পক্ষের সঙ্গে কথা বলে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেন।

তবে এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন এমপি গোলাম রসুলের স্ত্রী শারমীন দীনা। তিনি বলেন, ‘আমার মেয়ে অনন্যা মানসিক স্বাস্থ্যজনিত গুরুতর সমস্যায় ভুগছেন।’ তার দাবি, মাদ্রাসা বন্ধ থাকার সময়েও কিছু শিশু সেখানে এসে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছিল। এ বিষয়ে প্রতিবাদ করায় তাদের বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মিথ্যা অভিযোগ আনা হয়েছে এবং পরিকল্পিতভাবে বাড়িতে হামলা চালানো হয়েছে।

অন্যদিকে, মাদ্রাসার মুহতামিম (প্রতিষ্ঠানপ্রধান) কবির হোসেন বলেন, ‘এমপি গোলাম রসুলের মেয়ে অনন্যা মাদ্রাসায় শিশুদের যাতায়াত ও অবস্থান পছন্দ করতেন না। তিনি প্রায়ই সেখানে গিয়ে শিক্ষার্থীদের বকাঝকা করতেন এবং মাদ্রাসাটি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিতেন।’

যশোর কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাসুম খান জানান, পুলিশ উভয় পক্ষকে শান্ত থাকার আহ্বান জানানোর পর দুপুর ১টার দিকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, পুরো ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে এবং তদন্ত শেষে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।