বিএনপি নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারের প্রথম ছয় মাস পূর্ণ হওয়া এবং আসন্ন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে মন্ত্রিসভায় বড় ধরনের রদবদলের আলোচনা এখন রাজনৈতিক অঙ্গনের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। দলীয় ও সরকারি উচ্চপর্যায় থেকে পাওয়া বিভিন্ন তথ্যের ভিত্তিতে জানা গেছে, সম্ভাব্য এই পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় বর্তমান মন্ত্রিসভার বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পরিবর্তন হতে পারে। নতুন মুখ হিসেবে বিএনপির সিনিয়র নেতা, মিত্র দলের প্রতিনিধি এবং টেকনোক্র্যাট কোটার বিশেষজ্ঞদের নাম নিয়ে আলোচনা চলছে। তবে এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত সরকারের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি; চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটি সম্পূর্ণভাবে প্রধানমন্ত্রীর বিবেচনার ওপর রাখা হয়েছে।

সরকারি ও দলীয় সূত্রগুলোর দাবি, গত ছয় মাসের কার্যকাল পর্যালোচনায় দেখা গেছে, কয়েকজন মন্ত্রীর প্রশাসনিক দক্ষতা এবং মন্ত্রণালয়ের কাজের গতি প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। সরকারের ভেতরেই এখন এই বিষয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে যে, কিছু মন্ত্রীর পারফরম্যান্স সন্তোষজনক নয়। এর পাশাপাশি, কিছু মন্ত্রীর বিতর্কিত ও অপরিপক্ক বক্তব্যের কারণে সরকারের সামগ্রিক ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে, কয়েকজন মন্ত্রীর ব্যক্তিগত কর্মকাণ্ড এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁদের ভূমিকা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র সমালোচনা ও ট্রল শুরু হওয়ায় বিষয়টি সরকারের উচ্চপর্যায়ে অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, এই নেতিবাচক প্রভাব কাটিয়ে উঠতে এবং জনআকাঙ্ক্ষা পূরণে প্রধানমন্ত্রী সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের বিষয়ে কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। ফলে মন্ত্রিসভার ওই সদস্যরা বর্তমানে নিজেদের অবস্থান নিয়ে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন এবং পরিস্থিতি সামাল দিতে নিজস্ব তৎপরতা চালাচ্ছেন বলে জানা গেছে।

অন্যদিকে, মন্ত্রিসভায় নতুন করে জায়গা পাওয়ার প্রবল আকাঙ্ক্ষায় বিএনপি এবং শরিক দলের অনেক নেতা বর্তমানে সিনিয়র মন্ত্রী ও শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়ে দিয়েছেন। কে মন্ত্রিসভায় আসতে পারেন কিংবা কোন কোন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পরিবর্তন হতে পারে—তা জানার জন্য রাজনৈতিক মহলে চলছে প্রবল চেষ্টা। আগ্রহী নেতারা সাম্প্রতিক ছাত্র-জনতার আন্দোলন এবং রাজনৈতিক সংগ্রামে নিজেদের ভূমিকা, দলীয় ত্যাগ-তিতিক্ষা এবং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অবস্থান সামনে আনছেন। এমনকি কেউ কেউ বর্তমানে মন্ত্রিসভায় থাকা সদস্যদের অতীত ভূমিকার সীমাবদ্ধতাকে সামনে এনে নিজেদের যোগ্যতার দাবি জানাচ্ছেন। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, এই তৎপরতাগুলো এখন পর্যন্ত বিএনপির অভ্যন্তরীণ আলোচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার একক ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর হাতেই রয়েছে এবং তিনি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে এই প্রক্রিয়াটি পরিচালনা করছেন।

দলীয় সূত্রে আরও জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ও দলীয় ইস্যুতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সিনিয়র নেতাদের মতামতকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন। উদাহরণস্বরূপ, রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে মনোনয়ন দেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে তিনি বিএনপির স্থায়ী কমিটির অধিকাংশ নেতার সঙ্গে পৃথকভাবে আলোচনা করেছেন। এছাড়া সংসদের সব হুইপ এবং দলের কয়েকজন যুগ্ম মহাসচিবের সঙ্গেও তিনি বিস্তারিত পরামর্শ করেন। নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, দু-একজন সদস্য ছাড়া প্রায় সবাই মির্জা ফখরুলের মনোনয়নের পক্ষে মত দিয়েছেন। এই প্রক্রিয়ার পর অনেকের ধারণা, মন্ত্রিসভা পুনর্গঠনের ক্ষেত্রেও প্রধানমন্ত্রী একইভাবে জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেবেন।

রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মনোনয়ন নিশ্চিত হওয়ার ফলে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের পূর্ণমন্ত্রীর পদটি কার্যত শূন্য হয়ে গেছে। এই গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব এখন কার হাতে যাবে, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে তীব্র চর্চা চলছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে গুঞ্জন রয়েছে যে, বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে। যদি এমনটি হয়, তবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতো সংবেদনশীল পদের দায়িত্ব কাকে দেওয়া হবে, তা নিয়ে কৌতূহল আরও বেড়েছে। এই আলোচনায় পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানির নাম উঠে আসছে। তবে এসব গুঞ্জন প্রসঙ্গে শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি জানিয়েছেন, মন্ত্রিসভার রদবদল এবং তাঁকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কিছু গণমাধ্যমে যে ধরনের খবর প্রচার হচ্ছে, তাতে তিনি যথেষ্ট বিব্রত বোধ করছেন।

সরকারি ও দলীয় নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলোর দাবি, মিত্র দলের সংসদ সদস্য এবং বিজেপির চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ এবং টেকনোক্র্যাট কোটায় বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ড. আসাদুজ্জামান রিপনের নাম নতুন সদস্য হিসেবে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে। পাশাপাশি মিত্র দল নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমানকেও টেকনোক্র্যাট কোটায় মন্ত্রী করা হতে পারে—এমন আলোচনা শোনা যাচ্ছে রাজনৈতিক অঙ্গনে। মন্ত্রিসভায় থাকা একজন প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, রদবদল সরকারের একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। তবে বর্তমানে যে তিনটি মন্ত্রণালয় নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে, সেগুলোতে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে পরিবর্তন আসতে পারে বলে তিনি মনে করেন। তাঁর মতে, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের সঙ্গে এ বিষয়ে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকেও কথা হয়েছে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক সদস্যের মতে, বর্তমান মন্ত্রিসভার কয়েকজন মন্ত্রী একই সঙ্গে একাধিক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব সামলাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন, যার ফলে প্রশাসনিক কাজে স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। তাঁর ভাষায়, এই পরিস্থিতিতে কিছু প্রতিমন্ত্রীর কাজের দক্ষতা তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি কার্যকর দেখা যাচ্ছে। মন্ত্রিসভা পুনর্গঠন হলে তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ পূর্ণ মন্ত্রীর পদ পেতে পারেন। একই সঙ্গে সংসদ সদস্যদের মধ্য থেকে এবং বিএনপি ও সমমনা দলের দু-একজন যোগ্য নেতাকে টেকনোক্র্যাট কোটায় নতুন করে অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে। এই তালিকায় সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর এবং ড. আসাদুজ্জামান রিপনের নাম সম্ভাব্য তালিকায় রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। এছাড়া সংসদের হুইপ প্যানেল থেকেও দু-একজনকে মন্ত্রী করার সম্ভাবনা রয়েছে।

মন্ত্রিসভা পুনর্গঠন নিয়ে বিএনপির ভেতরে একটি ‘বঞ্চিত’ অংশও এখন আশাবাদী হয়ে তাকিয়ে আছে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যারা ব্যাপক হামলা, মামলা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন কিন্তু এখনো যথাযথ মূল্যায়ন পাননি, তাঁদের নাম নতুন করে সামনে আসছে। এই তালিকায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান, ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল এবং যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেলের নাম সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে।

রাজনৈতিক সূত্রগুলো আরও ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, ঢাকার একজন মন্ত্রী এবং উত্তরাঞ্চলের দুজন প্রতিমন্ত্রীকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নেতিবাচক আলোচনা ও সমালোচনা বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে পুনর্গঠনের পর তাঁদের অবস্থান কী হবে, তা নিয়ে দলের তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যেও প্রবল কৌতূহল বিরাজ করছে। সামগ্রিকভাবে, রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মনোনয়ন এবং সরকারের প্রথম ছয় মাস পূর্তির এই সন্ধিক্ষণে মন্ত্রিসভায় রদবদলের আলোচনা নতুন গতি পেয়েছে। একদিকে কিছু মন্ত্রীর কর্মদক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন, অন্যদিকে শূন্য পদের পূরণ এবং প্রশাসনিক দায়িত্ব পুনর্বিন্যাসের প্রয়োজনীয়তা—এই দুই কারণেই পুনর্গঠনের সম্ভাবনা প্রবল। তবে এখন পর্যন্ত সবকিছু অনানুষ্ঠানিক পর্যায়ে থাকলেও, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কবে ঘোষণা করা হবে, সে বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক ইঙ্গিত দেওয়া হয়নি।