রাজধানীর উত্তরার বিমানবন্দর এলাকায় ডিএল পেট্রোল পাম্পের ১ কোটি ২১ লাখ ২৫ হাজার টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনায় বড় ধরনের সাফল্য দাবি করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। গোয়েন্দা শাখার দীর্ঘ তদন্তের পর জানা গেছে, এই দুঃসাহসিক ছিনতাইয়ের সঙ্গে সরাসরি আটজন জড়িত ছিল। এরই ধারাবাহিকতায় নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জসহ ঢাকার বিভিন্ন এলাকা থেকে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে ডিবি পুলিশ। গ্রেপ্তারকৃতদের কাছ থেকে লুণ্ঠিত টাকার মধ্যে ১২ লাখ টাকা উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। তবে বাকি আসামিদের গ্রেপ্তার এবং অবশিষ্ট টাকা উদ্ধারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
গত শুক্রবার (১৪ আগস্ট) পরিচালিত অভিযানে গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন— মো. ইলিয়াস শিকদার (৩৬), জাফর (৩৬), মো. রবিউল ইসলাম ওরফে রুবেল (৩৪), মিন্টু রাড়ী (২৩) এবং সাগর বাড়ৈ (৪০)। গ্রেপ্তারকৃত এই চক্রের সদস্যদের কাছ থেকে পুলিশ বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও সরঞ্জাম উদ্ধার করেছে। উদ্ধারকৃত সামগ্রীর মধ্যে রয়েছে চারটি ৭.৬৫ মি.মি. পিস্তল, ছয়টি ম্যাগাজিন এবং ২১ রাউন্ড গুলি। এছাড়া অপরাধ ঢাকতে ব্যবহৃত র্যাবের ভুয়া পরিচয়পত্র, ভেস্ট, ক্যাপ, ওয়াকিটকি, হাতকড়া এবং বিভিন্ন নকল নম্বর প্লেট উদ্ধার করা হয়েছে। পাশাপাশি একটি মোটরসাইকেল জব্দ করেছে ডিবি পুলিশ।
ঘটনার সূত্রপাত গত রোববার সকালে। বিমানবন্দর সড়কের ক্রাউন প্লাজার সামনে ডিএল পেট্রোল পাম্পের বিপুল পরিমাণ নগদ টাকা ছিনতাই করা হয়। পাম্পটির মালিক তাসীন আক্তার হক, যিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বড় বোন প্রয়াত খুরশীদ জাহান হকের পুত্র এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের খালাত ভাই। ছিনতাইয়ের পর পাম্পের ম্যানেজার আব্দুল করিম বিমানবন্দর থানায় অজ্ঞাত ছয়-সাতজনের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করেন।
মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, পাম্পের সহকারী ম্যানেজার মোহাম্মদ আল আমিন, সিএনজি চালক সেলিমুজ্জামান এবং কভার্ড ভ্যানের চালক খোরশেদ টাকা ভর্তি ব্যাগ নিয়ে উত্তরা ১ নম্বর সেক্টরের পূবালী ব্যাংকে যাচ্ছিলেন। পথে তিনটি মোটরসাইকেলে আসা ছয়-সাতজন সশস্ত্র ছিনতাইকারী কভার্ড ভ্যানের গতি রোধ করে। তারা পিস্তল ঠেকিয়ে ভয় দেখায় এবং সহকারী ম্যানেজার আল আমিনকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর আহত করে। এরপর টাকার ব্যাগ ছিনিয়ে নিয়ে তারা দ্রুত গতিতে আব্দুল্লাহপুরের দিকে পালিয়ে যায়।
ঘটনার এক সপ্তাহ পর শনিবার ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম বিস্তারিত তথ্য জানান। তিনি বলেন, তদন্তের মাধ্যমে প্রথমে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ থেকে ইলিয়াস ও জাফরকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পরবর্তীতে মাতুয়াইল থেকে রুবেল এবং যাত্রাবাড়ীর কাজলারপাড় এলাকা থেকে মিন্টুকে গ্রেপ্তার করা হয়। রুবেলের ভাড়া বাসা তল্লাশি করে লুট হওয়া ৩ লাখ টাকা উদ্ধার করা হয়। এরপর পোস্তগোলা এলাকা থেকে আরও ৯ লাখ টাকাসহ পেশাদার অপরাধী সাগরকে গ্রেপ্তার করা হয়।
ডিবি প্রধান জানান, গ্রেপ্তারকৃত সাগর অত্যন্ত বিপজ্জনক এবং পেশাদার একজন অপরাধী, যার নামে মোট ১৩টি মামলা রয়েছে। সে এর আগেও একই কায়দায় বাইক এবং মাইক্রোবাস ব্যবহার করে বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে টাকা ছিনতাই করেছে। এছাড়া রুবেলের বিরুদ্ধে ৪টি, মিন্টুর বিরুদ্ধে ৩টি, জাফরের বিরুদ্ধে ২টি এবং ইলিয়াসের বিরুদ্ধে একটি মামলা রয়েছে।
পুলিশের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সিসিটিভি ফুটেজে আটজনকে শনাক্ত করা হয়েছে এবং গ্রেপ্তারকৃতরা স্বীকার করেছেন যে তাদের সঙ্গে আরও দুইজন ছিল। লুণ্ঠিত টাকা তারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিয়েছিল, যেখানে মূল পরিকল্পনাকারীরা বড় অংশ পেয়েছে এবং সহযোগী সদস্যরা আনুপাতিক হারে টাকা পেয়েছে। অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম জানান, এই চক্রের মূল হোতা এখনো পলাতক। তবে গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে তিনজন সরাসরি আক্রমণে সক্রিয় ছিল। এখন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানের ভেতর থেকে কারও জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, এই অপরাধী চক্রটিকে পুরোপুরি নির্মূল করতে পারলে ঢাকা শহরে এই ধরনের বড় ধরনের ছিনতাইয়ের ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে। পলাতক মূল হোতার নামে ২০টির বেশি মামলা থাকতে পারে বলে ধারণা করছেন পুলিশ। তবে তদন্তের গোপনীয়তা এবং বাকি আসামিদের গ্রেপ্তারের সুবিধার্থে মূল হোতার নাম এবং বিস্তারিত পরিচয় এখন প্রকাশ করা হয়নি। পুলিশ আত্মবিশ্বাসী যে, খুব শীঘ্রই বাকি সদস্যদের গ্রেপ্তার করে লুণ্ঠিত টাকার সবটুকু উদ্ধার করা সম্ভব হবে।








