নোয়াখালীর জিলা স্কুল মাঠে আয়োজিত এক বিশাল মহাসমাবেশে জঙ্গি সংগঠন ‘হেযবুত তওহীদ’কে সরকারিভাবে নিষিদ্ধ করার জোরালো দাবি জানানো হয়েছে। শনিবার বিকেলে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের তত্ত্বাবধানে ‘জমইয়্যাতুল মাদারিসিল কওমিয়া নোয়াখালী-লক্ষ্মীপুর ও ইসলামবিরোধী কার্যকলাপ প্রতিরোধ কমিটি’র উদ্যোগে এই মহাসমাবেশের আয়োজন করা হয়।
সমাবেশের প্রধান বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী। তার বক্তব্যে তিনি ‘হেযবুত তওহীদ’র কার্যক্রমের তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, “ঈমান বিধ্বংসী এই জঙ্গি সংগঠনটি সেবার আড়ালে অত্যন্ত সুকৌশলে হাজার হাজার সাধারণ মুসলমানকে ঈমানহারা করার ষড়যন্ত্র করছে। এর ফলে এদেশের হক্কানি ওলামায়ে কেরাম এবং তওহীদি জনতার চেতনা মারাত্মকভাবে ক্ষত-বিক্ষত হচ্ছে। এই সংগঠনের কার্যক্রম দেশের দীর্ঘদিনের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করার পাশাপাশি সামগ্রিক স্থিতিশীলতাকে বিঘ্নিত করছে।” তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, “সর্বস্তরের তওহীদি জনতা বর্তমানে অত্যন্ত বিক্ষুব্ধ। এই সংগঠনের ভিনদেশী এজেন্ডা বাস্তবায়নের গোপন পরিকল্পনার কারণে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব চরম হুমকির মুখে পড়েছে।” এই প্রেক্ষাপটে তিনি অবিলম্বে ‘হেযবুত তওহীদ’কে সরকারিভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণার দাবি জানান।
মহাসমাবেশের দুই অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন জমাইয়াতুল মাদারিসিল কওমিয়া নোয়াখালী-লক্ষ্মীপুরের সভাপতি মাওলানা সিদ্দিকুর রহমান এবং হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ নোয়াখালী জেলার আমির মাওলানা নিজাম উদ্দিন। অনুষ্ঠানের সঞ্চালনার দায়িত্ব পালন করেন মুফতি মুঈনুদ্দিন তৈয়বপুরী ও মাওলানা মহিউদ্দিন।
সমাবেশটিতে বিশিষ্ট ইসলামি চিন্তাবিদ ও ওলামায়ে কেরামগণ বক্তব্য প্রদান করেন। তাদের মধ্যে ছিলেন জামিয়া আহলিয়া দারুল উলুম হাটহাজারীর মহাপরিচালক খলিল আহমদ কুরাইশী, খতমে নবুওত সংরক্ষণ কমিটির আমির আব্দুল হামিদ মধুপুরী, ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার বসুন্ধরার মহাপরিচালক মুফতি আরশাদ রহমানী, জামেয়া ওবায়দিয়া নানুপুরের মুহতামিম সালাউদ্দিন নানুপুরী, ইসলামী মহাসমাবেশ বাস্তবায়ন কমিটির আহ্বায়ক মুফতি মুস্তাকুন্নবী কাসেমী, হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব শায়খ সাজিদুর রহমান, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সিনিয়র নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ মো. ফয়জুল করিম, মাওলানা আজিজুল্লাহ নবাব, মাওলানা সিদ্দিক আহমদ নোমান এবং মাওলানা নুরুল ইসলাম।
ধর্মীয় নেতাদের পাশাপাশি এই সমাবেশে সংহতি প্রকাশ করেন স্থানীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃবৃন্দ। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন নোয়াখালী-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো. শাহজাহান, নোয়াখালী জেলা পরিষদের প্রশাসক মো. হারুনুর রশিদ আজাদ এবং নোয়াখালী সুপার মার্কেটের সভাপতি মো. ইকরাম উল্লাহ।
বক্তারা সরকারের প্রতি তাদের দাবি পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও ধর্মীয় সংহতির স্বার্থে অনতিবিলম্বে ‘হেযবুত তওহীদ’কে নিষিদ্ধ করতে হবে। একইসঙ্গে এই সংগঠনের প্রচারণায় ব্যবহৃত সকল বইপত্র ও পত্রপত্রিকা নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি তাদের পরিচালিত ওয়েবসাইটগুলো স্থায়ীভাবে বন্ধ করার দাবি জানানো হয়। বক্তারা আরও দাবি করেন, একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটির মাধ্যমে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে পরিচালিত তাদের আর্থিক লেনদেনের খোঁজ নিতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংক অ্যাকাউন্টগুলো অবিলম্বে জব্দ করতে হবে। পাশাপাশি, সারাদেশে ‘হেযবুত তওহীদ’ কর্তৃক বিভিন্ন নিরীহ মুসলমানের বিরুদ্ধে দায়ের করা সকল মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করার আহ্বান জানানো হয়।
মহাসমাবেশের শেষে ভবিষ্যৎ কর্মসূচির কথা ঘোষণা করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে দেশব্যাপী ওলামায়ে কেরাম ও তওহীদি জনতার সমন্বয়ে এক বিশাল গণস্বাক্ষর কর্মসূচি পালন। এছাড়া দেশের প্রতিটি জেলা ও উপজেলার জেলা প্রশাসক (ডিসি) এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে স্মারকলিপি প্রদান করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আগামী ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ‘হেযবুত তওহীদের’ স্বরূপ উন্মোচনের লক্ষ্যে পর্যায়ক্রমে সেমিনার, মাহফিল ও মতবিনিময় অনুষ্ঠানসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দিয়ে সমাবেশটি শেষ হয়।










