নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন ব্যাপক আলোচনা ও তৎপরতা চলছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) অভ্যন্তরে এই আলোচনা এখন তুঙ্গে। দলীয় একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, আগামী রাষ্ট্রপতির মনোনয়ন নিয়ে দলের তিন জ্যেষ্ঠ নেতার নাম সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে। যাদের নামের কথা সবচেয়ে বেশি শোনা যাচ্ছে তারা হলেন—বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও বর্তমান ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমেদ, স্থায়ী কমিটির সদস্য অধ্যাপক ড. আবদুল মঈন খান এবং দলের মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

দলীয় সূত্রগুলোর দাবি অনুযায়ী, আগামী শনিবার (১ আগস্ট) দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরামের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, ওই বৈঠকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বিষয়টি গুরুত্বের সাথে উত্থাপিত হতে পারে। যদিও বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে আলোচ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত নাও থাকতে পারে, তবে অনানুষ্ঠানিকভাবে এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে অতীতের মতো এবারও দলের শীর্ষ নেতৃত্বের ওপর দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়ার প্রস্তাব আসতে পারে। বিশেষ করে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ওপর চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দায়িত্ব অর্পণের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রে দলটি কেবল রাজনৈতিক আনুগত্য নয়, বরং আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি বিবেচনা করছে। দলীয় আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, সাংবিধানিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা, কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখা, আন্তর্জাতিক মহলে গ্রহণযোগ্যতা এবং ব্যক্তিগত ভাবমূর্তির মতো বিষয়গুলোকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। দলের লক্ষ্য হলো এমন একজন ব্যক্তিত্বকে মনোনয়ন দেওয়া, যিনি অভিজ্ঞ, সর্বজনস্বীকৃত এবং সম্পূর্ণ বিতর্কমুক্ত।

এই প্রেক্ষাপটে অধ্যাপক ড. আবদুল মঈন খানের নাম বিশেষভাবে আলোচনায় উঠে এসেছে। পদার্থবিজ্ঞানে উচ্চশিক্ষা, নিউক্লিয়ার পদার্থবিজ্ঞানে গভীর গবেষণা এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দীর্ঘ কাজের অভিজ্ঞতা তাকে অন্যদের চেয়ে আলাদা করে তুলেছে। এছাড়া বিজ্ঞান, পরিকল্পনা ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে তার দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতাকে বর্তমান সময়ের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক হিসেবে দেখছে দলীয় নেতৃত্ব।

অন্যদিকে, হাফিজ উদ্দিন আহমেদের দীর্ঘদিনের সাংবিধানিক ও সংসদীয় অভিজ্ঞতা এবং বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনের বিষয়টি তাকে এই পদের জন্য একজন শক্তিশালী প্রার্থী হিসেবে উপস্থাপন করছে। একইভাবে, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের ক্ষেত্রে তার দীর্ঘ রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা, তৃণমূল পর্যায় থেকে জাতীয় নেতৃত্বে উঠে আসা এবং সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রিপরিষদের দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতাকে বিবেচনায় রাখা হচ্ছে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা নজরুল ইসলাম খান এ বিষয়ে বলেন, "বর্তমানে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য রয়েছে। এমতাবস্থায় ভবিষ্যতে কে এই গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হতে পারেন, তা নিয়ে রাজনৈতিক আলোচনা হওয়াটা অত্যন্ত স্বাভাবিক একটি প্রক্রিয়া।"

রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন খান এই বিষয়ে তার অভিমত ব্যক্ত করে বলেন, রাষ্ট্রপতি হিসেবে এমন একজনকে বেছে নেওয়া উচিত, যার বিরুদ্ধে কোনো গ্রহণযোগ্য নেতিবাচক রেকর্ড বা দুর্নীতির অভিযোগ নেই এবং যিনি রাষ্ট্রের প্রতি নিঃস্বার্থভাবে দায়বদ্ধ ও দৃঢ় ব্যক্তিত্বের অধিকারী। তার মতে, যদি অবসরপ্রাপ্ত কোনো জ্যেষ্ঠ বিচারপতির মতো অভিজ্ঞ ও ব্যক্তিত্বসম্পন্ন কাউকে এই পদে বিবেচনা করা হয়, তবে রাষ্ট্র ও সরকার উভয়ই দীর্ঘমেয়াদে উপকৃত হতে পারে। তিনি আরও যোগ করেন যে, দলীয়ভাবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলেও এমন একজন জ্যেষ্ঠ নেতাকে বেছে নেওয়া প্রয়োজন, যার স্বচ্ছ ভাবমূর্তি রয়েছে এবং যিনি নৈতিকভাবে প্রশ্নাতীত।