ইতালির রাজধানী রোমে এক বর্বরোচিত ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন একই পরিবারের তিন বাংলাদেশি। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর অবশেষে তাদের মরদেহ স্বদেশে পৌঁছেছে, যা পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নামিয়ে এনেছে। স্বজনদের বুকফাটা আর্তনাদ আর শোকাচ্ছন্ন পরিবেশে মরদেহগুলো নিজ গ্রামে নিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

নিহতদের পরিচয় পাওয়া গেছে—নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার চরকাঁকড়া ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা কামাল উদ্দিন বাবুল (৩৯), তার স্ত্রী (৩৮) এবং তাদের পাঁচ বছর বয়সী শিশুকন্যা আরোয়া ইসলাম আরিশা। শুক্রবার (১৪ আগস্ট) সকাল ৮টার দিকে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে মরদেহবাহী বিমানটি অবতরণ করে। বিমানবন্দরে উপস্থিত স্বজনরা যখন মরদেহগুলো গ্রহণ করেন, তখন চারদিকে কান্নার রোল পড়ে যায়। এরপর মরদেহগুলো দ্রুত নোয়াখালীর উদ্দেশ্যে রওনা হয়।

পরিবার সূত্রে জানা গেছে, আজ বাদ মাগরিব কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার চরকাঁকড়া ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের শিশু নিকেতন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে তিনজনের জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। জানাজা শেষে তাদের পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হবে। এই মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডে গুরুতর আহত হয়ে ইতালিতে চিকিৎসাধীন থাকা পরিবারের একমাত্র ছেলে অয়নও শুক্রবার বিকেলে গ্রামে পৌঁছাবেন। মা, বাবা ও ছোট বোনের শেষ বিদায়ের মুহূর্তে অয়ন সেখানে উপস্থিত থাকবেন এবং জানাজা ও দাফনে অংশ নেবেন।

ঘটনার বিবরণ অনুযায়ী, গত ২৬ জুন রাতে ইতালির রোমের পার্শ্ববর্তী ক্যাসালোত্তি এলাকার ভিয়া মন্তিলিওর একটি অ্যাপার্টমেন্টে প্রবেশ করে দুর্বৃত্তরা এই নারকীয় কাজ করে। তারা ছুরিকাঘাতে কামাল উদ্দিন বাবুল, তার স্ত্রী ও শিশুকন্যাকে নির্মমভাবে হত্যা করে। খবর পেয়ে স্থানীয় পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায় এবং তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করে। গুরুতর আহত অবস্থায় অয়নকে উদ্ধার করে স্থানীয় জেমেলি পলিক্লিনিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

ইতালিতে দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া ও প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে গত ১১ আগস্ট স্থানীয় সময় সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় রোমের ক্যাসালোত্তি এলাকার পিয়াজ্জা ওর্মেয়ায় নিহতদের প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর প্রবাসী বাংলাদেশিদের সহায়তায় মরদেহ দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়।

নিহত কামাল উদ্দিন বাবুল দেশে থাকাকালীন অত্যন্ত সামাজিক এবং পরোপকারী মানুষ ছিলেন। সবার সঙ্গে তার ব্যবহার ছিল অত্যন্ত আন্তরিক, যা তার পরিচিতদের মাঝে প্রশংসিত ছিল। তার চাচাতো ভাই অ্যাডভোকেট ইউনুস এই নির্মম হত্যাকাণ্ডে গভীর বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, ‘এ ঘটনায় অভিযুক্ত শাহাদাতকে এখনো আইনের আওতায় আনা হয়নি, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং হতাশাজনক।’

ছেলের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে নিহত বাবুলের বাবা সিরাজুল ইসলাম কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি আর্তনাদ করে বলেন, ‘আমার ছেলে কিছুদিন আগেই দেশে ছুটিতে এসে পারিবারিক কবরস্থানে মাটি ফেলেছিল। আজ ভাবতে পারছি না যে, সেখানেই তাকে স্ত্রী ও সন্তানসহ দাফন করতে হচ্ছে। আমার বুকটা ফেটে যাচ্ছে। আমি এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই।’