সৌদি আরবে কর্মরত বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য এক যুগান্তকারী সুখবর নিয়ে এসেছে দেশটির সরকার। এখন থেকে কোনো কারণে মূল নিয়োগকর্তা বা কফিল যদি কোনো কর্মীর আকামা নবায়ন না করেন, তবে ওই কর্মী দ্রুত অন্য কোনো নিয়োগকর্তার অধীনে আকামা নবায়ন করে কাজ চালিয়ে যেতে পারবেন। এই প্রক্রিয়ায় আইনগত কোনো বাধা থাকবে না, যা কর্মীদের চাকরির নিরাপত্তা ও আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করবে।

মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) ঢাকায় প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীর সঙ্গে এক সৌজন্য সাক্ষাতে এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানান সৌদি আরবের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রকৌশলী ওয়ালিদ আব্দুল করিম আল-খুরেইজি। উচ্চপর্যায়ের এই বৈঠকে বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও জোরদার করার পাশাপাশি কর্মী নিয়োগ ও তাদের কল্যাণ নিশ্চিত করার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

বৈঠকে বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের মধ্যে কর্মী নিয়োগসংক্রান্ত বিদ্যমান তিনটি চুক্তির কথা উঠে আসে। এর মধ্যে বিশেষ করে ডোমেস্টিক ওয়ার্কার এবং এসভিপি-সংক্রান্ত দুটি চুক্তির দ্রুত নবায়নের জন্য সৌদি সরকারের প্রতি অনুরোধ জানানো হয়। একই সঙ্গে সম্প্রতি বাংলাদেশ কর্তৃক অনুমোদিত নতুন কর্মী নিয়োগ চুক্তিটি যাতে দ্রুত সৌদি সরকার অনুমোদন করে, সেই আহ্বানও জানানো হয়।

দুই দেশের মধ্যে কর্মী নিয়োগ, যথাযথ প্রশিক্ষণ এবং সামগ্রিক কল্যাণসংক্রান্ত বিষয়গুলো আরও কার্যকরভাবে এগিয়ে নিতে একটি যৌথ টেকনিক্যাল কমিশন গঠনের প্রস্তাব দেয় বাংলাদেশ। এছাড়া কর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধি, আরবি ভাষা শিক্ষা, সৌদি আরবের আইন ও সংস্কৃতি সম্পর্কে গভীর ধারণা প্রদান এবং প্রি-ডিপার্চার ওরিয়েন্টেশন কার্যক্রম নিশ্চিত করতে বাংলাদেশে যৌথভাবে একটি ‘সৌদি–বাংলাদেশ কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র’ প্রতিষ্ঠার জোরালো প্রস্তাব দেওয়া হয়।

স্বাস্থ্যসেবা, নির্মাণ শিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি (আইটি) এবং হসপিটালিটি খাতের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও চাহিদাসম্পন্ন পেশায় দক্ষ ও পেশাদার বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়া আরও সহজ ও গতিশীল করতে কারিগরি, ভোকেশনাল এবং পেশাগত যোগ্যতার পারস্পরিক স্বীকৃতির একটি সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর কাঠামো তৈরির প্রস্তাব করা হয়। বৈঠকে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য সময়মতো ওয়ার্ক পারমিট ও আকামা ইস্যু এবং তা যথাযথভাবে নবায়ন নিশ্চিত করার বিষয়ে বিশেষ অনুরোধ জানানো হয়। পাশাপাশি কিছু অসাধু নিয়োগকর্তা ওয়ার্ক পারমিটের বাড়তি ফি দেখিয়ে যে বিলম্ব করছেন, তা দূর করতে এবং কর্মীদের হয়রানি বন্ধ করতে সৌদি সরকারের সক্রিয় সহযোগিতা কামনা করা হয়।

প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী তাঁর বক্তব্যে বিশেষভাবে উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের মধ্যে দীর্ঘদিনের অত্যন্ত বন্ধুত্বপূর্ণ ও হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক বিদ্যমান, যা সময়ের সাথে সাথে আরও গভীর হয়েছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশি কর্মীরা তাদের কঠোর পরিশ্রম, সততা ও নিষ্ঠার মাধ্যমে সৌদি আরবের সামগ্রিক অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন, পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ রেমিট্যান্স পাঠিয়ে বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনীতিকেও শক্তিশালী করছেন। তিনি আরও বলেন, কওমি মাদ্রাসার অনেক শিক্ষার্থী জন্মগতভাবেই আরবি ভাষায় অত্যন্ত দক্ষ। যথাযথ কারিগরি ও পেশাগত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এই শিক্ষার্থীদের জন্য সৌদি আরবে কর্মসংস্থানের নতুন ও সম্ভাবনাময় সুযোগ সৃষ্টি করা সম্ভব, যা দুই দেশের জন্যই লাভজনক হবে।

প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক ২০৩৪ সালের ফুটবল বিশ্বকাপ আয়োজনের প্রস্তুতি উপলক্ষে সৌদি আরবে শ্রমবাজারের যে বিপুল চাহিদা তৈরি হচ্ছে, তা পূরণে বাংলাদেশ থেকে আরও অধিকসংখ্যক উচ্চ দক্ষ কর্মী নেওয়ার আহ্বান জানান। সেই সঙ্গে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বাংলাদেশি নারী গৃহকর্মীদের অধিকার রক্ষা এবং তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ জোর দেন।

মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মোখতার আহমেদ রমজান ও ঈদ উপলক্ষে সৌদি আরবের বিভিন্ন কারাগারে আটক বাংলাদেশি নাগরিকদের সাধারণ ক্ষমার আওতায় এনে মুক্তি দেওয়ার অনুরোধ জানান।

বাংলাদেশের এসব গঠনমূলক প্রস্তাবের জবাবে সৌদি আরবের মানবসম্পদবিষয়ক উপমন্ত্রী মুহান্নাদ বিন আহমেদ আল-ঈসা জানান, স্বাস্থ্যসেবা, নির্মাণ, আইটি এবং হসপিটালিটি খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ থেকে দক্ষ ও পেশাদার কর্মী নিয়োগে সৌদি আরব অত্যন্ত আগ্রহী। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, কর্মীদের অধিকার সুরক্ষায় দেশটিতে ইতোমধ্যে ‘ওয়েজ প্রটেকশন সিস্টেম’ এবং উন্নত বীমা ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে, যা কর্মীদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। এছাড়া সৌদির কারাগারে থাকা বাংলাদেশি কর্মীদের বিস্তারিত তথ্য কূটনৈতিক মাধ্যমে পাঠানো হলে তাদের সাধারণ ক্ষমার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে বলে তিনি আশ্বস্ত করেন।