সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদসহ বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে দেশ থেকে পালিয়ে থাকা সকল পলাতক আসামিকে দেশে ফিরিয়ে এনে কঠোরতম আইনি প্রক্রিয়ার আওতায় আনতে সরকার কোনো ধরনের প্রকারের শিথিলতা বা গাফিলতি প্রদর্শন করবে না। মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনার প্রেক্ষিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এই দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
জাতীয় সংসদে ১৪৭ বিধির আওতায় ঢাকা-১৪ আসনের বিরোধী দলভুক্ত সংসদ সদস্য (জামায়াতে ইসলামী) মীর আহমদ বিন কাসেম কর্তৃক সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদকে দেশে প্রত্যর্পণের বিষয়ে উত্থাপিত একটি প্রস্তাবের ওপর আলোচনার জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এই বক্তব্য প্রদান করেন। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম। উভয় পক্ষের বিস্তারিত ও প্রাণবন্ত আলোচনার পর প্রস্তাবটি সংসদে গৃহীত হয়। এরপর স্পিকার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে এ বিষয়ে দ্রুততম সময়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ এবং সেই কার্যক্রম সম্পর্কে অবিলম্বে সংসদকে অবহিত করার জন্য নির্দেশ প্রদান করেন।
পলাতক আসামিদের শনাক্তকরণ ও গ্রেপ্তারের বিষয়ে বিস্তারিত আলোকপাত করতে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, সরকার বর্তমানে একটি সমন্বিত ও বহুমুখী কৌশল গ্রহণ করেছে। তিনি বলেন, পলাতক সব আসামিকে শনাক্ত, গ্রেপ্তার এবং দেশে ফিরিয়ে আনতে ইন্টারপোল, সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশের সকল মিশনগুলোর সঙ্গে অত্যন্ত নিবিড়ভাবে ও সক্রিয়ভাবে সমন্বয় করে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে সরকার।
সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনার বিশেষ প্রক্রিয়ার বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, তার বর্তমান অবস্থান নিখুঁতভাবে শনাক্ত করা, প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করা, তার একাধিক পাসপোর্ট ব্যবহারের অভিযোগ যাচাই করা এবং দেশে ও বিদেশে থাকা তার সকল অবৈধ সম্পদ শনাক্ত ও জব্দ করার লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট সকল কর্তৃপক্ষ সমন্বিতভাবে কাজ করছে। তিনি আরও যোগ করেন, ‘সরকার আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, যথাযথ বিচারিক প্রক্রিয়া অনুসরণ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রতি পূর্ণ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সাবেক আইজিপির প্রত্যর্পণের লক্ষ্যে সম্ভাব্য সব ধরনের আইনি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ অব্যাহত রয়েছে।’
সাবেক আইজিপির প্রত্যর্পণে সরকারের গৃহীত বিশেষ উদ্যোগগুলো তুলে ধরে সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে এই জটিল আইনি বিষয়গুলো অত্যন্ত দক্ষতার সাথে পরিচালনার জন্য গত ৩০ জুলাই সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক অন্যতম শীর্ষস্থানীয় আন্তর্জাতিক আইন প্রতিষ্ঠান ‘হামদান আল কাবি অ্যাডভোকেটস অ্যান্ড লিগ্যাল কনসালটেন্সি’-কে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে সেন্ট লুসিয়ায় সাবেক আইজিপির বর্তমান অবস্থান নিয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনের বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, উপযুক্ত ও নির্ভরযোগ্য সূত্রের মাধ্যমে বিষয়টি এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
বিগত শাসনামলে সংঘটিত বিভিন্ন মানবাধিকার লঙ্ঘনের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত চলা সময়ে বিভিন্ন মানবতাবিরোধী অপরাধের পরিসংখ্যান প্রদান করতে গিয়ে তিনি বলেন, এ দীর্ঘ সময়ে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও গুমসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের ফলে মোট মামলার সংখ্যা ৭ থেকে ৮ হাজারেরও বেশি। তিনি আরও উল্লেখ করেন, হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে ১ হাজার ৪৮টি এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে নির্যাতনের ফলে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে ১৩৩টি। গুমের বিষয়ে তিনি জানান, সরকারি নথিতে নিবন্ধিত গুমের সংখ্যা ৬৮৪টি। তবে ‘মায়ের ডাক’ ও ‘অধিকার’-সহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নিবন্ধিত গুমের সংখ্যা প্রায় ৭০৯টি।
গুম সংক্রান্ত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে দাখিলকৃত তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত বিভিন্ন গোয়েন্দা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার মাধ্যমে প্রায় ১ হাজার ৮৫০ জনকে জোরপূর্বক গুম করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া ওই সময়ে রাজনৈতিক সহিংসতায় প্রাণহানির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৬৩০টিতে এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা ২ হাজার ৬৯৩টি। তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি অনুযায়ী, বিচারবহির্ভূত মৃত্যুর প্রকৃত সংখ্যা ৩ হাজারের বেশি হতে পারে, যার সবকটিই নথিভুক্ত করা সম্ভব হয়নি।
জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তরের (ওএইচসিএইচআর) একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই মাসে সংঘটিত গণঅভ্যুত্থানে বাংলাদেশে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হয়েছেন। তবে বেসরকারি সংস্থাগুলোর হিসাব অনুযায়ী, এই সংখ্যা ২ হাজারের বেশি। তিনি আরও জানান, নিহতদের অধিকাংশই সামরিক রাইফেল ও শটগান থেকে ছোড়া প্রাণঘাতী গুলিতে প্রাণ হারিয়েছেন, যা সাধারণত দেশের নিরাপত্তা বাহিনী ব্যবহার করে থাকে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিরোধী দলীয় সদস্যদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, সরকারের সমালোচনা না করে বরং পলাতক আসামিদের প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া সহজতর করতে সরকারকে পূর্ণ সহযোগিতা প্রদান করা উচিত। আইজিপি বেনজীর আহমেদ এবং মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানকে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন ফ্যাসিবাদী সরকারের প্রধান সহযোগী হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, নির্যাতন ও গুমসহ যাবতীয় অপকর্মের সঙ্গে জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে।
উল্লেখ্য, ইতোমধ্যে মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা দায়ের করা হয়েছে। সাবেক ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারের (এনটিএমসি) মহাপরিচালক ও বরখাস্ত মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে গুম এবং শতাধিক হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ অভিযোগ গঠন করেছে।
সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদকে গত ১২ জুন দুবাইয়ে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ গ্রেপ্তার করে। পরবর্তীতে সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকার ই-মেইলের মাধ্যমে বাংলাদেশকে তার গ্রেপ্তারের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়। সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা একটি মামলার পরিপ্রেক্ষিতে ইন্টারপোলের সহায়তায় তাকে আটক করা হয়। গত ১৪ জুন সংসদে ৩০০ বিধিতে দেওয়া বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ তথ্যটি নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনতে চাইলে গ্রেপ্তারের ৩০ দিনের মধ্যে বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ জানাতে হবে। গত ২০ জুন মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সাবেক আইজিপিকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া অত্যন্ত দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে। ইন্টারপোলের রেড নোটিশের ভিত্তিতে সংযুক্ত আরব আমিরাত পুলিশ তাকে গ্রেপ্তারের পর পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ সম্পন্ন করার জন্য বাংলাদেশকে ৩০ দিন সময় দিয়েছিল। তবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অত্যন্ত তৎপরতার সাথে প্রয়োজনীয় ১৪৪ পৃষ্ঠার নথিপত্র প্রস্তুত ও অনুবাদ করে মাত্র তিন দিনের মধ্যেই কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকারের কাছে পাঠায়।
এ অধিবেশনে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রাখতে এবং আলোচনায় অংশ নিতে উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির, নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী রাজীব আহসান, কুমিল্লা-১১ আসনের সদস্য ও বিরোধীদলীয় উপনেতা আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের, সংরক্ষিত নারী আসন-৪৫ এর রোকেয়া বেগম, ফরিদপুর-৪ আসনের এম শাহিদুল ইসলাম, সংরক্ষিত নারী আসন-৩৮ এর মারজিয়া বেগম, পটুয়াখালী-৪ আসনের এ বি এম মোশাররফ হোসেন, সংরক্ষিত নারী আসন-৪৭ এর তাসমিয়া প্রধান এবং রংপুর-৪ আসনের আখতার হোসেন।



















