মহিউদ্দিন

কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার কালাকচুয়া এলাকায় পুরাতন লোহালক্কড় ও ভাঙারি ব্যবসার আড়ালে চোরাই মালামাল কেনাবেচার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে চুরি হওয়া মোটর, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, লোহার সামগ্রীসহ লাখ লাখ টাকার পণ্য নিয়মিত এসব দোকানে কেনাবেচা হচ্ছে। চুরি করা অর্থের বড় একটি অংশ মাদক সেবনে ব্যয় হওয়ায় এলাকায় সামাজিক অপরাধও বাড়ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

তবে এত অভিযোগের পরও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দৃশ্যমান তৎপরতা নেই বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের কেউ কেউ দাবি করছেন, ভাঙারি ব্যবসার সঙ্গে জড়িত কিছু দোকান থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অসাধু সদস্যদের নিয়মিত মাসোয়ারা দেওয়ার কারণে এসব কর্মকাণ্ড বন্ধ হচ্ছে না।

সরেজমিনে কালাকচুয়া এলাকায় গিয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এলাকায় অন্তত ১৫ থেকে ১৬টি ভাঙারি দোকান রয়েছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে হওয়ায় এলাকাটির যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত। ফলে আশপাশের বিভিন্ন এলাকা ছাড়াও দূর-দূরান্ত থেকে চুরি করা মালামাল সহজেই এখানে আনা সম্ভব বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।

স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি, এসব দোকানে দুই দফায় মালামাল হাতবদল হয়। প্রথমে টোকাইরা বিভিন্ন স্থান থেকে সংগ্রহ করা পরিত্যক্ত লোহা ও অন্যান্য সামগ্রী এনে বিক্রি করে। পাশাপাশি চুরি করা মালামালও এসব দোকানে বিক্রি করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, সোহেল মিয়া, ইসলাম মিয়া, মফিজ উদ্দিন, আবুল হাশেম, বাবুল মিয়া, নুরু, ইউসুফ, রুবেল, হানিফ ও জয়নালসহ কয়েকজন নিয়মিত পুরাতন মালামাল কেনাবেচার সঙ্গে যুক্ত। তাদের মধ্যে বাবুল মিয়া ও আবুল হাশেম স্থানীয় প্রভাব খাটিয়ে পছন্দের মালামাল কম দামে কিনে নেওয়ার চেষ্টা করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। বিক্রি করতে অনিচ্ছুকদের ভয়ভীতি দেখানো এমনকি মারধরের অভিযোগও করেছেন কেউ কেউ।

দায়িত্বশীল একটি সূত্রের দাবি, ময়নামতি ইউনিয়নের হরিণধরা, দেবপুর, শরীফপুর ও রামপুর এলাকার কয়েকটি পরিত্যক্ত স্টিল মিল থেকে দেয়াল কেটে মোটর ও লোহার সামগ্রী চুরির একটি চক্র সক্রিয় রয়েছে। চুরি করা এসব মালামালের একটি অংশ কালাকচুয়ার ভাঙারি দোকানগুলোতে বিক্রি করা হয় বলে অভিযোগ।

সূত্রটি আরও জানায়, টোকাই ও বিভিন্ন উৎস থেকে সংগ্রহ করা মালামাল সপ্তাহ বা মাস শেষে অন্তত ১৫ থেকে ২০টি ট্রাকে করে দেশের বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। সম্প্রতি আশপাশের কয়েকটি চুরির ঘটনার পর খোঁজ নিয়ে এসব ভাঙারি দোকানে চুরি হওয়া মালামাল বিক্রির তথ্য পাওয়া গেছে বলে স্থানীয়রা দাবি করেছেন।

এর মধ্যে মাধাইয়া জলা এলাকার প্রয়াত আলী আশরাফ কন্ট্রাক্টরের ডিপ মেশিনের দুটি ট্রান্সফরমার চুরি, প্রবাসী সোলাইমানের পানির পাম্প, সবেদার শাহজাহানের লোহার কল, মধ্যম শাহদৌলতপুর মসজিদের লোহার কল এবং ময়নামতির শেষেশপুর, ঝুমুর ও রামমাল এলাকার বাসাবাড়ি থেকে বৈদ্যুতিক মোটর ও বিভিন্ন যন্ত্রপাতি চুরির ঘটনা উল্লেখ করেন স্থানীয়রা।

এদিকে কুমিল্লা-সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়কের ময়নামতির দেবপুর এলাকায় একটি বেসরকারি ব্যাংকের কাছে দায়বদ্ধ ‘মাবিয়া স্টিল মিলস’ নামের একটি কারখানার মালামাল নিয়েও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় একটি সূত্রের দাবি, রাতের আঁধারে কারখানার প্রাচীর কেটে ভেতরে প্রবেশ করে মূল্যবান মোটর ও যন্ত্রাংশ সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। পরে ভেঙে ফেলা দেয়াল আবার ইট-সিমেন্ট দিয়ে সংস্কার করে দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

সূত্রটির দাবি, কারখানাটি ব্যাংকের কাছে দায়বদ্ধ থাকলেও সেখানে থাকা সম্পদ রক্ষায় সংশ্লিষ্টদের কার্যকর তৎপরতা চোখে পড়ছে না। কারখানার প্রধান ফটকে ব্যাংকের কাছে দায়বদ্ধতার একটি সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে রাখার মধ্যেই দায়িত্ব সীমাবদ্ধ রয়েছে বলে অভিযোগ।

চোরাই মালামাল কেনাবেচার বিষয়ে জানতে ভাঙারি ব্যবসায়ী বাবুল মিয়ার সঙ্গে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।

স্থানীয়দের অভিযোগ, চোরাই মালামাল কেনাবেচা বন্ধে নিয়মিত অভিযান, ভাঙারি দোকানগুলোর মালামালের উৎস যাচাই এবং চুরি হওয়া পণ্য শনাক্তে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। তাদের মতে, এসব কর্মকাণ্ড বন্ধ করা না গেলে চুরি ও মাদকসহ সংশ্লিষ্ট সামাজিক অপরাধ আরও বাড়ছে।